Published : 11 Sep 2026, 12:35 AM
চীনের প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে মার্কিন কোম্পানিগুলো থেকে তথ্য চুরি করে টেলিকমিউনিকেশন সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের অ্যাটর্নি টেলর স্টাউট।
রয়টার্স লিখেছে, ব্রুকলিন ফেডারেল আদালতে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর দিন বুধবার তিনি এ দাবি করেন। হুয়াওয়েকে ‘অপরাধী প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে বর্ণনা করে চুরি, মিথ্যাচার ও তথ্য গোপন করার অভিযোগ তোলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের পক্ষে অ্যাটর্নি টেলর স্টাউট বলেন, “২০০১ সাল থেকে ২০ বছর ধরে হুয়াওয়ে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতারণা করেছে; যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছে। এসবের উদ্দেশ্যই ছিল সারা বিশ্বের টেলিযোগাযোগ শিল্পে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করা।”
জুরির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নিজেদের ব্যবসা বাড়াতে অসাধু উপায়ে হুয়াওয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি কোম্পানির গোপন বাণিজ্যিক তথ্য চুরির চক্রান্ত করেছিল। এর মধ্যে সিসকো সিস্টেমসের ইন্টারনেট রাউটারের অপারেটিং সিস্টেম সোর্স কোড ও টি-মোবাইলের (ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক অপারেটর) মাধ্যমে ফোন পরীক্ষার জন্য তৈরি একটি রোবোটিক হাতও চুরি হয়েছিল।
আদালতে সাক্ষীদের বিষয়ে স্টাউট বলেন, “আমরা এমন ব্যক্তিদের কথা শুনব, যারা আমেরিকান প্রযুক্তি চুরি করার সময় হুয়াওয়েকে হাতেনাতে ধরেছিলেন। হুয়াওয়ের এক কর্মচারীর রোবোটিক হাত চুরি করার ভিডিও রয়েছে।”
রাষ্ট্রপক্ষে এমন বক্তব্য তুলে ধরলেও মার্কিন আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা হুয়াওয়ে এবং সাফল্যের ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন।
হুয়াওয়ের আইনজীবী দলের অন্যতম সদস্য ব্রায়ান হেবারলিগ বলেন, হুয়াওয়ের সাফল্য প্রতিযোগিতার বিষয়, কোনো চক্রান্তের নয়। হুয়াওয়ে যা করেছে তা উদ্ভাবন, কোনো চুরি নয়। এটি সাধারণ ব্যবসায়িক লেনদেন, কোনো অপরাধমূলক আচরণ নয়।
“হুয়াওয়ে তার নিজ যোগ্যতায় এ সাফল্য অর্জন করেছে। এখানে অপরাধের নীলনকশা ছিল না।”
টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, মোবাইল ফোন আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআই চিপের পরিচিত হুয়াওয়ে। বিশ্বজুড়ে এ কোম্পানির ব্যবসা ছড়িয়ে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের নেটওয়ার্কিং সরঞ্জামের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। বাণিজ্য বিভাগের অনুমোদন ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পণ্য ও প্রযুক্তি হুয়াওয়ের কাছে রপ্তানি করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে মামলার বিচার ও মার্কিন প্রসিকিউটরের অভিযোগ নিয়ে বৃহস্পতিবার চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, “চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দমন-পীড়ন ও বাধার তীব্র বিরোধিতা করে চীন সরকার।”
নিয়মিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, চীন তার প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।
যুক্তরাষ্ট্রে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে মামলা হয় ২০১৮ সালে। তখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার তথ্য গোপন করা এবং মার্কিন ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে লাখ লাখ ডলার লেনদেনের অভিযোগ ওঠে। এরপর হুয়াওয়ে এবং এর প্রধান আর্থিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যাংক জালিয়াতি ও নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
এর পরের বছরগুলোতে প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগসহ বিস্তৃত অভিযোগ তোলা হয়।
হুয়াওয়ের পক্ষে আইনজীবী হেবারলিগ জুরিকে বলেন, প্রসিকিউটররা বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সাধারণ ও স্বাভাবিক কাজকর্মের বিবরণ না দিয়ে সেগুলোকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরতে সাধারণ বিষয়গুলোকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছেন।
“সরকার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে বেছে বেছে উপস্থাপন করছে, যেগুলোকে সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। আদতে এসব চক্রান্তের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।”
হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগের মধ্যে মার্কিন পরোয়ানার ভিত্তিতে ২০১৮ সালে কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা মেং ওয়ানঝৌকে ভ্যাঙ্কুভারে আটক করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে তিন বছর তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যান। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও কানাডার মধ্যে একটি কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে মুক্ত হয়ে তিনি চীনে ফিরে যান।
এরপর ২০২২ সালে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো খারিজ করে দেওয়া হয়। তার দেওয়া বেশকিছু ‘স্বীকারোক্তি’ এ বিচারে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে।