Published : 14 Jan 2026, 04:56 PM
মানবদেহের মস্তিষ্ক, অণ্ডকোষ, প্লাসেন্টা, ধমনীসহ বিভিন্ন অঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে এমন দাবি করা বেশ কয়েকটি আলোচিত গবেষণা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। একদল বিজ্ঞানীর মতে, এসব গবেষণার অনেক ফল আসলে পরীক্ষার সময়ের দূষণ, ভুল শনাক্তকরণ এবং পদ্ধতিগত দুর্বলতার কারণে তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে সরাসরি “বোমফাটানো” বলে মন্তব্য করেছে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। কারণ, প্রকৃতিতে প্লাস্টিক দূষণ সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। খাবার, পানীয় এমনকি আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই সেখানেও প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু মানবদেহে এসব কণার প্রকৃত পরিমাণ কত এবং এগুলো আদৌ কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই অনেক গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক কণা এতটাই ক্ষুদ্র যে বর্তমান প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্লেষণ সক্ষমতা সীমায় গিয়ে পরীক্ষা করতে হয়। ফলে সামান্য ত্রুটি বা দূষণও বড় ভুল ফল তৈরি করতে পারে।
গবেষকদের ভাষায়, এখানে কোনো ইচ্ছাকৃত অনিয়মের অভিযোগ নেই। তবে দ্রুত ফল প্রকাশের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ঠিকমতো করা হয়নি।
গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে সাড়া জাগানো অন্তত সাতটি গবেষণার ফল, যেগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা জার্নালে আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি জানিয়েছেন। পাশাপাশি একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে ১৮টি গবেষণার কথাও উঠে এসেছে, যেখানে মানব টিস্যু থেকে পাওয়া সংকেতকে সাধারণ প্লাস্টিকের সংকেতের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার ঝুঁকি বিবেচনায় আনা হয়নি।
ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত একটি বহুল আলোচিত গবেষণার শিরোনাম ছিল বেশ চমকপ্রদ। সেখানে বলা হয়, মানব মস্তিষ্কে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা দ্রুত বাড়ছে। গবেষণাটি প্রভাবশালী ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে এবং এতে ১৯৯৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মৃত্যুর পর সংগৃহীত কয়েক ডজন মস্তিষ্কের নমুনা বিশ্লেষণের ফল তুলে ধরেছেন গবেষকরা।
তবে কয়েক মাসের মধ্যেই এই গবেষণার ফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নভেম্বরে একই জার্নালে প্রকাশিত একটি ‘ম্যাটার্স অ্যারাইজিং’ চিঠিতে একদল বিজ্ঞানী লেখেন, “প্রতিবেদনে উপস্থাপিত গবেষণাটিতে পদ্ধতিগত কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে দূষণ নিয়ন্ত্রণ সীমিত ছিল এবং যাচাইয়ের ধাপের অভাব রয়েছে, যা প্রকাশিত ফলের নির্ভরযোগ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে।”
এই চিঠির সঙ্গে যুক্ত গবেষকদের একজন, জার্মানির হেলমহল্টজ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের ড. দুশান মাতেরিচ আরও সরাসরি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “মস্তিষ্কের মাইক্রোপ্লাস্টিক বিষয়ক গবেষণাটি একটি রসিকতা ছাড়া কিছুই নয়।”
ড. মাতেরিচ ব্যাখ্যা করে বলেন, মানবদেহের চর্বি থেকে পলিথিনের মতো সংকেত তৈরি হতে পারে, যা পরীক্ষায় ভুলভাবে প্লাস্টিক হিসেবে ধরা পড়ে। মানব মস্তিষ্কের প্রায় ৬০ শতাংশই চর্বি, ফলে ভুল শনাক্তকরণের ঝুঁকি খুব বেশি। তার মতে, বিশ্বজুড়ে স্থূলতার হার বাড়ার বিষয়টি ওই গবেষণায় দেখানো প্রবণতার বিকল্প ব্যাখ্যা হতে পারে।
ড. মাতেরিচ আরও বলেন, “ওই গবেষণাটি কেন ভুল, তা ব্যাখ্যা করা খুব সহজ।” তার ধারণা, মানব টিস্যুতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার দাবি করা উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন গবেষণাগুলোর অর্ধেকেরও বেশি ফল নিয়ে গুরুতর সন্দেহ রয়েছে।
তবে গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন এই সমালোচনার জবাবে ভিন্ন মত দেন। গার্ডিয়ান-কে তিনি বলেন, “সাধারণভাবে বলতে গেলে, মানবস্বাস্থ্যের ওপর এমএনপির সম্ভাব্য প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে আমরা এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে আছি। কীভাবে এই কাজ করা উচিত, তার কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশিকা নেই।” তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত তাদের গবেষণা এবং অন্যদের কাজ নিয়ে যেসব সমালোচনা এসেছে, তার বেশিরভাগই অনুমানভিত্তিক এবং সরাসরি তথ্য দিয়ে সমর্থিত নয়।
অধ্যাপক ক্যাম্পেন বলেন, গবেষণার পদ্ধতিতে উন্নতির সুযোগ আছে, বিষয়টি তারা স্বীকার করেন। তবে সীমিত সম্পদের মধ্যে তারা বিতর্কে জড়ানোর চেয়ে উন্নত পরীক্ষাপদ্ধতি ও আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য তৈরির দিকে বেশি মনোযোগ দিতে চান।
এই বিতর্ক শুধু মস্তিষ্কের গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়। একটি গবেষণায় দাবি ছিল, ক্যারোটিড ধমনীর প্লাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি হয়। পরে বিজ্ঞানীরা সেই গবেষণার সমালোচনা করেন, কারণ সেখানে অপারেশন কক্ষ থেকে নেওয়া ফাঁকা নমুনা পরীক্ষা করা হয়নি। এ ধরনের ফাঁকা নমুনা পরীক্ষা করলে পরীক্ষার সময় কতটা পটভূমিগত দূষণ থাকতে পারে, তা বোঝা যায়।
আরেকটি গবেষণায় দাবি ছিল, মানব অণ্ডকোষে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে এবং এটি পুরুষ প্রজনন ব্যবস্থায় প্লাস্টিক দূষণের ব্যাপক উপস্থিতি নির্দেশ করে। তবে, অন্য বিজ্ঞানীরা এই ফল মানতে নারাজ। তাদের ভাষায়, “ব্যবহৃত বিশ্লেষণ পদ্ধতি এসব দাবি সমর্থন করার মতো যথেষ্ট শক্ত নয়।”
এই গবেষণার লেখকদের মধ্যেও ছিলেন অধ্যাপক ক্যাম্পেন। তিনি এবং তার সহকর্মীরা জবাবে বলেন, “জৈব বিশ্লেষণ কখনোই নিখুঁত হবে না। আমাদের কাজ হলো সাহায্য চাইতে থাকা এবং সেই সাহায্য গ্রহণ করা। তাতে আমরা ধীরে ধীরে আরও ভালো দিকে এগোতে পারব।”
এ ছাড়া রক্তে প্লাস্টিক কণা পাওয়ার দাবি করা দুটি গবেষণা এবং ধমনীতে প্লাস্টিক শনাক্তের আরেকটি গবেষণাও সমালোচনার মুখে পড়েছে। বোতলজাত পানিতে প্রতি লিটারে ১০ হাজার ন্যানোপ্লাস্টিক কণা পাওয়ার দাবি করা একটি গবেষণাকে সমালোচকেরা “মৌলিকভাবে অবিশ্বাসযোগ্য” বলেন, যদিও গবেষকেরা সেই অভিযোগ মানেননি।
ডাও কেমিক্যাল কোম্পানির সাবেক রসায়নবিদ রজার কুলম্যান বলেন, এই সব সন্দেহ একত্রে একটি বড় “বোমাশেল” তৈরি করেছে। তার ভাষায়, “এতে আমাদের মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পর্কে যা জানি বলে মনে করি, সবকিছু নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আমরা খুব বেশি কিছু জানিই না।” তিনি আরও বলেন, অনেক গবেষক অসাধারণ সব দাবি করছেন, কিন্তু সেগুলোর পক্ষে সাধারণ মানের প্রমাণও দিচ্ছেন না।
বিশ্লেষণী রসায়নের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে নমুনা পরীক্ষা করার দীর্ঘদিনের নির্দেশিকা থাকলেও, মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিকের জন্য নির্দিষ্ট এমন মানদণ্ড এখনো তৈরি হয়নি। নেদারল্যান্ডসের ভ্রিয়ে ইউনিভার্সিটেইট আমস্টারডামের ড. ফ্রেদেরিক বেন বলেন, অনেক গবেষণায় এখনো মৌলিক ল্যাবরেটরি চর্চা ঠিকভাবে মানা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, পরীক্ষার সময় পটভূমিগত দূষণ বাদ দেওয়া, ফাঁকা নমুনা ব্যবহার, বারবার মাপ নেওয়া এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ প্লাস্টিক কণা মিশিয়ে যন্ত্র পরীক্ষা করার মতো ধাপগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অনুসরণ করা হয়নি। ফলে পাওয়া ফল পুরোপুরি বা আংশিকভাবে এসব সমস্যার কারণে তৈরি কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।
বিশেষ করে পাই-জিসি-এমএস নামের একটি পদ্ধতি নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। এই পদ্ধতিতে নমুনা গরম করে বাষ্পে পরিণত করা হয় এবং সেই বাষ্প বিশ্লেষণ করে প্লাস্টিক শনাক্ত করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ রসায়নবিদ ড. ক্যাসান্দ্রা রাউয়ার্টের নেতৃত্বে জানুয়ারি ২০২৫-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়, পলিথিন ও পিভিসি শনাক্তের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি এখনো নির্ভরযোগ্য নয়।
গার্ডিয়ান-কে ড. রাউয়ার্ট বলেন, “পুরো ক্ষেত্রটিতেই এটি একটি বড় সমস্যা।” তার মতে, অনেক গবেষণায় যে পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিকের কথা বলা হচ্ছে, তা অবাস্তব। তিনি আরও বলেন, মানব টিস্যুতে থাকা চর্বি থেকেও একই ধরনের সংকেত তৈরি হতে পারে, যা ভুলভাবে প্লাস্টিক হিসেবে ধরা পড়ে।
ড. রাউয়ার্টের মতে, ৩ থেকে ৩০ মাইক্রোমিটার আকারের কণা সহজে রক্তপ্রবাহে ঢুকে অঙ্গে জমা হয়, এমন প্রমাণ তিনি দেখেননি। তার ভাষায়, দৈনন্দিন জীবনে আমরা যেভাবে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসি, তাতে এত বড় মাত্রার প্লাস্টিক অঙ্গে জমা হওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, মূলত ন্যানো আকারের প্লাস্টিক কণাই জৈবিক বাধা অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, বর্তমানে ব্যবহৃত যন্ত্র দিয়ে সেই ন্যানো আকারের কণাগুলো নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেন, মানবদেহে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা নিয়ে ত্রুটিপূর্ণ তথ্য নীতিনির্ধারণে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা বিপজ্জনক। একইসঙ্গে এতে প্লাস্টিক শিল্পের লবিয়িস্টরা প্রকৃত উদ্বেগকে ভিত্তিহীন দাবি করার সুযোগ পেতে পারে। তাই এই ক্ষেত্রের গবেষণায় আরও সতর্কতা, উন্নত পদ্ধতি এবং স্বচ্ছতা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।