১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

এআই দিয়ে তৈরি প্রথম ভাইরাস: চিকিৎসাবিজ্ঞানে আশা, নিরাপত্তার শঙ্কা

ভাইরাস তৈরির জন্য ২০ লাখ ব্যাকটেরিওফেজের জিনগত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এআই মডেল দুটিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন গবেষকরা।

এআই দিয়ে তৈরি প্রথম ভাইরাস: চিকিৎসাবিজ্ঞানে আশা, নিরাপত্তার শঙ্কা
গবেষণায় তৈরি এসব ভাইরাস ‘ব্যাকটেরিওফেজ’ নামে পরিচিত। ছবি: স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 Aug 2026, 05:48 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:48 PM

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ ভাইরাসের নকশা তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। বিষয়টিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের বড় এ অগ্রগতি নতুন ওষুধের আশা জাগালেও এ প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করা নিয়ে তৈরি করেছে নতুন উদ্বেগ।

গবেষণায় তৈরি এসব ভাইরাস ‘ব্যাকটেরিওফেজ’ নামে পরিচিত। এগুলো কেবল ব্যাকটেরিয়াকে আক্রমণ করে ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াজনিত দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের চিকিৎসায় বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হয়।

ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার সময় এআই ডিজাইন করা ভাইরাসের একটি মিশ্রণ বা ‘ককটেল’ ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে, যা সাধারণ বা প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিওফেজও প্রতিরোধ করতে পারে।

জিনোম ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিশেষ এআই মডেল ব্যবহার করে এ ব্যাকটেরিওফেজের জিনোম তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র কেমিক্যাল প্রকৌশলী ড. ব্রায়ান হাই।

এ বিশেষ ধরনের এআই মডেল বিভিন্ন এআই চ্যাটবটের পেছনের ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’-এর জিনগত রূপ। পরবর্তীতে এই নকশা অনুসারে ল্যাবে ভাইরাস তৈরি করে একটি পাত্রে রাখা ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে পরীক্ষা চালানো হয়।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।

গবেষণাপত্রটিতে গবেষকরা লিখেছেন, “দ্রুত জিনোম ডিজাইন ও নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সেগুলোকে কার্যকর করার এই সক্ষমতা ‘ফেইজ থেরাপিকে পুরোপুরি বদলে’ এবং ‘বায়োটেকনোলজির কাজের পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে’।”

তবে এর বৈপ্লবিক সম্ভাবনার পাশাপাশি সুরক্ষার বিষয়টি নিয়েও সতর্ক করেছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, এ কাজ ‘গুরুত্বপূর্ণ বায়ো-সেইফটি, বায়ো-কন্টেইনমেন্ট ও বায়ো-সিকিউরিটি সংক্রান্ত প্রশ্ন ও বিবেচনা সামনে নিয়ে এসেছে’।

সম্পূর্ণ জিনোম ডিজাইন বা নকশা করার কাজে নিয়োজিত অন্য গবেষকদের উদ্দেশ্যে তারা আহ্বান জানিয়েছেন, “পুরো প্রকল্প চলাকালীন সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ জারি রাখা উচিত।”

সহযোগী নিবন্ধে বাল্টিমোরের ‘জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি’র ‘সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি’র অধ্যাপক টম ইঙ্গলসবি ও ড. মরিৎস হাঙ্কে সতর্ক করে লিখেছেন, “এআই প্রাণ বিজ্ঞানের প্রয়োগে বেশ প্রতিশ্রুতিশীল। তবে একইসঙ্গে জরুরি বায়ো-সেইফটি ও সিকিউরিটি নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

“জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে ভাইরাসের জিনোম তৈরির সক্ষমতা এখন তৈরি হয়ে গেছে। তবে এআইকে নিরাপদে পরিচালনার মতো কোনো প্রশাসনিক ও আইনি নীতিমালা এখনও নেই।”

ড. ব্রায়ান হাই ও তার সহযোগীরা নতুন এই ভাইরাসের জিনোম ডিজাইন করতে ‘ইভো-১’ ও ‘ইভো-২’ নামের দুটি এআই মডেল ব্যবহার করেছেন। প্রায় ২০ লাখ ব্যাকটেরিওফেজের জিনগত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এআই মডেল দুটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

তবে উদ্ভিদ, মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীকে আক্রমণ করতে পারে এমন ভাইরাসের জেনেটিক কোড সচেতনভাবেই প্রশিক্ষণের বাইরে রাখা হয়েছে, যাতে মারাত্মক ও বিপজ্জনক কোনো ভাইরাস তৈরির ঝুঁকি কমানো যায়।

পরীক্ষার সময় এআই হাজার হাজার সম্ভাব্য জিনোম তৈরি করেছিল, যেখান থেকে গবেষকরা গবেষণাগারে তৈরির জন্য প্রায় ৩০০টি বেছে নিয়েছেন। এসব কৃত্রিম জিনোম ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে বসানো হলে সেগুলোর জেনেটিক কোড পড়ে প্রাকৃতিকভাবেই নতুন ব্যাকটেরিওফেজ তৈরি হতে শুরু করে।

প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি নিখুঁত বা কার্যকর ছিল না। তিনশটির মধ্যে কেবল ১৬টি ব্যাকটেরিওফেজ টিকে থাকতে পেরেছিল। তবে এদের একটি ককটেল বা মিশ্রণ ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়ার দু’টি ভিন্ন প্রজাতির প্রতিরোধ দ্রুত ভেঙে ফেলতে পারে।

ব্যাকটেরিওফেজের জিনোম আকারে খুবই ছোট হলেও ইঙ্গলসবি ও হাঙ্কে বলেছেন, এ গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে, জেনারেটিভ এআই দিয়ে কার্যকর ভাইরাসের জিনোম তৈরি করা সম্ভব। একই পদ্ধতি অন্যান্য ভাইরাসের ক্ষেত্রে খাটবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে মানুষ, প্রাণী বা উদ্ভিদে সংক্রমণ ঘটাতে পারে এমন রোগজীবাণু বা প্যাথোজেন নিয়ে এ জাতীয় গবেষণা না করার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

“এ ধরনের জিনোম থেকে নতুন এমন রোগজীবাণু তৈরি হতে পারে, যা বর্তমান কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থা দিয়ে আটকানো বা ঠেকানো সম্ভব নয়।”

এদিকে, পুরো বিষয়টিকে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অর্জন বলে উল্লেখ করলেও এমনটা যে কতটা জটিল কাজ তা স্পষ্ট করে ‘ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন’-এর সিন্থেটিক জিনোম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক টম এলিস বলেছেন, “সত্যি বলতে, সবচেয়ে ছোট ও সহজে তৈরি করা যায় এমন জিনোম তৈরি করেছে এআই।”

তিনি বলেছেন, বিপজ্জনক রোগজীবাণুর জেনেটিক কোড দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া কোনো এআই ব্যবহার করে আরও ক্ষতিকর ভাইরাস ডিজাইন করা সম্ভব হতে পারে।

তবে জিনগত তথ্যে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ও বিপজ্জনক দেখায় এমন জিনোম তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে এ ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।