হয় মার্কিন নয়তো চীন: এআই প্রশ্নে ৩৫ দেশকে ‘বলবে’ যুক্তরাষ্ট্র
প্যাক্স সিলিকার সদস্য হিসেবে রয়টার্স জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও কাজাখস্তানের নাম উল্লেখ করেছে। কোনো ইউরোপীয় দেশের নাম সেখানে নেই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা এবার মিত্র দেশগুলোর ওপর সরাসরি চাপ তৈরির দিকে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি খসড়া চিঠিতে ৩৫টি দেশকে বলা হয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘প্যাক্স সিলিকা জোটে’র সদস্য হতে চাইলে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাঠামোর সদস্য থাকতে পারবে না।
প্রযুক্তি সাইট ‘দ্য নেক্সট ওয়েবে’ প্রকাশিত প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা এবং একটি অভ্যন্তরীণ নথির বরাত দেওয়া হয়েছে। চিঠিটি জুনে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ‘এআই অপরচুনিটি স্টেটমেন্ট’-এ স্বাক্ষর করা ৩৫টি দেশের কাছে পাঠানোর কথা রয়েছে। এর মূল বার্তা হলো, এই দেশগুলোকে কোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে।
কূটনৈতিক চিঠির ভাষায়ও বিষয়টি বেশ সরাসরি। খসড়া চিঠিতে বলা হয়েছে, “সবকিছুর অংশ হতে চাইলে শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুরই অংশ হওয়া যায় না।” এতে আরও বলা হয়েছে, প্যাক্স সিলিকা ঘোষণায় স্বাক্ষর করা “শুধু সদস্যপদ নেওয়া নয়, বরং একটি অঙ্গীকার”। তাই দেশগুলো যেন সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে ওয়াশিংটন ঠিক কবে চিঠিটি পাঠাবে, কিংবা পাঠানোর আগে এর ভাষা পরিবর্তন হবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়। খসড়াটিতে কোনো তারিখও নেই। আর, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর “ফাঁস হওয়া অভ্যন্তরীণ নথি” নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
প্যাক্স সিলিকা কী?
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র প্যাক্স সিলিকা চালু করে। এর লক্ষ্য একসঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সরবরাহ ব্যবস্থা নিরাপদ করা। এগুলো হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল, সেমিকন্ডাক্টর এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ।
প্রায় দুই ডজন দেশ এরইমধ্যে এই জোটে যোগ দিয়েছে। এর মধ্যে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও কাজাখস্তানের নাম উল্লেখ করেছে রয়টার্স।
জোটের সদস্যরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রকল্পে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ পায়। পাশাপাশি এই কাঠামো তাদের যৌথ প্রকল্প এবং সমন্বিত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের দিকে এগিয়ে নেয়।
এর বাইরের বৃহত্তর গোষ্ঠীটি তুলনামূলকভাবে শিথিল। ‘এআই অপরচুনিটি স্টেটমেন্ট’-এ স্বাক্ষর করার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি “অভিন্ন লক্ষ্য” এবং “অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি”-তে প্রতীকীভাবে সম্মতি দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নিজস্ব প্রকাশিত তথ্যেও বিষয়টি এভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
এই কাঠামো এতোদিন বাধ্যতামূলক ছিল না। আর ঠিক এই জায়গাটিই বদলাতে চাইছে খসড়া চিঠি।
যে দেশটি বিষয়টি সামনে এনেছে
কাজাখস্তান জুনে প্যাক্স সিলিকায় যোগ দেয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরে। আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ একে মধ্য এশিয়ার কোনো দেশের প্রথম যোগদান হিসেবে উল্লেখ করেন।
কাজাখস্তানের কাছে উন্নত চিপ তৈরিতে প্রয়োজনীয় খনিজের বড় মজুত রয়েছে। প্যাক্স সিলিকায় যোগ দেওয়ার পর দেশটি চীনের কাঠামোতেও যোগ দেয়।
জানা মতে, কাজাখস্তানই একমাত্র দেশ, যারা দুই কাঠামোর সদস্য হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, বিষয়টি ওয়াশিংটনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে খনিজের বিষয়টি। শুল্কযুদ্ধের সময় চীন এসব খনিজের ওপর প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণকে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করেছে। একই সরবরাহকারী যদি দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক ধরে রাখে, প্যাক্স সিলিকা যে পরিস্থিতি ঠেকাতে তৈরি হয়েছে, সেটিই তখন তৈরি হয়।
জুলাইয়ে শি জিনপিংয়ের উদ্যোগ
চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী কাঠামোটি খুব বেশি পুরোনো নয়। জুলাইয়ে সাংহাইয়ের একটি সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থা গঠনের ঘোষণা দেন।
সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিকল্প হিসেবে চীনের ‘ওপেন ওয়েট’ মডেলকে সামনে রাখা হয়।
দুই কাঠামোর প্রস্তাবের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। প্যাক্স সিলিকা বিনিয়োগের সুযোগ এবং যৌথ নিয়ন্ত্রণের প্রস্তাব দেয়। অন্যদিকে বেইজিং এমন মডেলের প্রস্তাব দিচ্ছে, যেগুলো ব্যবহারকারীরা ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারবেন।
তবে চীনের অবস্থানও পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়। জুলাইয়ে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশ থেকে চীনের শীর্ষ মডেলগুলোতে প্রবেশাধিকারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি বেইজিং বিবেচনা করছে।
অর্থাৎ, দুই পক্ষই নিজেদের প্রযুক্তিতে অন্যদের কতটা প্রবেশাধিকার দেবে, তা নিয়ে নিজেদের অবস্থান ঠিক করছে।
যে শব্দটি চিঠিতে নেই
খসড়া চিঠিতে চীনের নাম একবারও উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে শুধু “এমন পরস্পর-অনুরূপ উদ্যোগ, যেগুলোর প্রত্যাশা আমাদের নিজেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক” এমন কথার ব্যবহার রয়েছে।
তবে, নাম প্রকাশ না করা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা বিষয়টি আরও সরাসরি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, কর্মকর্তারা এমনভাবে চিঠিটি তৈরি করেছেন যাতে স্পষ্ট হয়, “আপনি একই সঙ্গে দুটো পক্ষে থাকতে পারবেন না।”
ওই কর্মকর্তার যুক্তি হলো, একটি প্রযুক্তি ব্যবস্থায় কোনো দেশ নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে কীভাবে তুলে ধরছে, সেটি প্রশ্নের মুখে পড়বে যদি একই সময়ে তারা চীনের এমন একটি উদ্যোগে যোগ দেয়, যার লক্ষ্য ভিন্ন একটি প্রযুক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এগিয়ে নেওয়া।
সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ
চীনের ওপেন ওয়েট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেলগুলো ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো নিজস্ব মালিকানাধীন ব্যবস্থার সঙ্গে ব্যবধান অনেকটাই কমিয়ে এনেছে।
এই মাসে হাগিং ফেইসের প্রধান নির্বাহী সিএনবিসিকে বলেন, উন্মুক্ত মডেলের প্রতিযোগিতায় চীন এগিয়ে আছে। তার দেওয়া হিসাবে, এসব মডেলের ডাউনলোডের ৪১ শতাংশ চীনের মডেলগুলোর।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতও পুরোপুরি বন্ধ ধরনের মডেলের পক্ষে একাট্টা নয়। এ বছর এনভিডিয়া এবং আরও কয়েকটি বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ওপেন ওয়েট মডেল নিয়ে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের অবস্থান থেকে আলাদা অবস্থান নিয়েছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও আরও কঠোর হচ্ছে। চীন কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এনভিডিয়ার চিপে দূরবর্তীভাবে প্রবেশাধিকার পাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখছে বাণিজ্য দপ্তর। পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানিগুলোর ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
ইউরোপ কোথায়
একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো। প্যাক্স সিলিকার সদস্য হিসেবে রয়টার্স জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও কাজাখস্তানের নাম উল্লেখ করেছে। কোনো ইউরোপীয় দেশের নাম সেখানে নেই।
অবশ্য প্রতিবেদনে ৩৫টি দেশের পুরো তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তাই কোনো ইউরোপীয় দেশ সদস্য নয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তারপরও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই কাঠামোর আওতায় চিপ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মতো বিষয় রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ইউরোপেরও বড় ধরনের সম্পর্ক আছে।
বছরজুড়ে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার বদলে ব্রাসেলস বরং আলাদা একটি অবস্থান তৈরির চেষ্টা করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে তৈরি পণ্যের স্থানীয় উপাদানের নিয়ম পাঁচ শতাংশ স্থানীয় অংশ দিয়ে শুরু হয়েছে এবং এতে হার্ডওয়্যারও অন্তর্ভুক্ত।
প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার এই প্রচেষ্টায় ইউরোপীয় কম্পিউটিং ব্যবস্থা, ইউরোপীয় স্যাটেলাইট এবং ইউরোপীয় মডেলের বিষয়ও রয়েছে।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দুই পক্ষের মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার দাবি ইউরোপের জন্য নতুন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তবে কোনো ইউরোপীয় রাজধানী এমন চিঠি পাবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা যুক্তি
চীনা প্রযুক্তি বিশ্লেষক রুই মা মনে করেন, এই চিঠি যুক্তরাষ্ট্রের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ তিনি যুক্তি দেন, বিশ্ব দেখছে এক পক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্য পক্ষ উন্মুক্ত প্রযুক্তি ও ব্যাপক প্রবেশাধিকারের কথা বলছে।
তবে তার যুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই জোট কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, সেই প্রশ্ন। তিনি লেখেন, জোট স্থায়ী নয় এবং সময়ের সঙ্গে প্রণোদনাও বদলে যায়। তার এই বক্তব্য মূলত বেইজিংকে সমর্থন করার চেয়ে চাপ প্রয়োগের ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা।
এর পাশাপাশি আরেকটি যুক্তিও সামনে এসেছে। কয়েকজন মডেল নির্মাতা বলেছেন, দেশগুলোর উচিত নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা এবং কোনো পক্ষের ওপর নির্ভর না করা। কারণ দুই পক্ষের যে কোনো একটির ওপর নির্ভরতা তৈরি হলে নিজেদের অর্থনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণের একটি সুইচ অন্য কারও হাতে চলে যেতে পারে।
তবে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা যত সহজ, সেটির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা তত সহজ নয়।
কোন বিষয়গুলো সিদ্ধান্ত পরিষ্কার করবে?
প্রতিবেদন বলেছে, এখানে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, খসড়া চিঠিটি আদৌ পাঠানো হবে কি না। এটি এখনো একটি খসড়া, এতে কোনো তারিখ নেই এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর নথিটির অস্তিত্বও নিশ্চিত করেনি।
দ্বিতীয়ত, নজর থাকবে কাজাখস্তানের দিকে। দেশটি একই সঙ্গে দুই কাঠামোর সদস্য এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজের মালিক। চিঠি পাওয়ার পর দেশটি কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা থেকে বোঝা যাবে যুক্তরাষ্ট্রের এই চাপ কতটা কার্যকর।
তৃতীয়ত, প্রয়োজন প্যাক্স সিলিকার ৩৫ সদস্যের পূর্ণ তালিকা। জোটটি এখন পর্যন্ত একেকটি দেশের যোগদানের কথা আলাদাভাবে জানিয়েছে। তাই ৩৫টি দেশের নাম প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন ঠিক কোন কোন দেশকে এই পছন্দের মুখে দাঁড় করাচ্ছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না।
