স্বপ্ন পূরণের রোমাঞ্চ নিয়ে কলকাতার ময়দানে ছুটছেন সানজিদা

বাংলাদেশের প্রথম নারী ফুটবলার হিসেবে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের জার্সি গায়ে চাপিয়ে একটা স্বপ্ন পূরণ হয়েছে এই মিডফিল্ডারের, এবার তিনি মাঠ রাঙাতে চান পারফরম্যান্স আর সাফল্য দিয়ে।

মোহাম্মদ জুবায়েরমোহাম্মদ জুবায়েরবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 5 Feb 2024, 05:25 AM
Updated : 5 Feb 2024, 05:25 AM

উপমহাদেশের বিখ্যাত ক্লাব ইস্ট বেঙ্গলের জার্সি গায়ে উঠেছে। বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রথমবার বিদেশের ক্লাবে খেলার অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে সানজিদা আক্তারের সময় কাটছে রোমাঞ্চে টইটম্বুর হয়ে। তবে ক্লাবটির নাম ইস্ট বেঙ্গল বলেই স্নায়ুর চাপও কম নয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের তারকা অনুভব করতে পারছেন কলকাতার তারকা হওয়ার চ্যালেঞ্জও। 

ওড়িশা এফসির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে ইস্ট বেঙ্গলের জার্সিতে এর মধ্যেই ইন্ডিয়ান উইমেন’স লিগে অভিষেক হয়েছে সানজিদার। সোমবার তার দল লড়বে কিকস্টার্ট এফসির বিপক্ষে, যে দলে খেলেন সানজিদার জাতীয় দলের সতীর্থ সাবিনা খাতুন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় কিকস্টার্টের বিপক্ষে ম্যাচ, ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে নিজের চাওয়া, স্বপ্ন নিয়ে ২২ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার মন খুলে বললেন অনেক কথাই। 

ইস্ট বেঙ্গলের জার্সিতে অভিষেক হয়েছে আপনার। এ কয়দিনের অভিজ্ঞতায় ভারতে উইমেন’স লিগ নিয়ে উন্মাদনা কেমন দেখলেন? যদি বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করতে বলা হয়! 

সানজিদা: কলকাতায় মেয়েদের ফুটবল নিয়ে উন্মাদনা বেশ। নিজেদের মাঠে ইস্ট বেঙ্গলের ম্যাচ হলে আরও বেশি। গ্যালারিতে অনেক দর্শক আসে আমাদেরকে সমর্থন দিতে। তবে আমার মনে হয়, বাংলাদেশের তুলনায় একটু কম। দেশে আমাদের ম্যাচ থাকলে গ্যালারিতে এখন, বিশেষ করে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পর আমাদের উৎসাহ দিতে কত মানুষ আসে, সেটা তো আপনারাও দেখেছেন।

দুই দেশের লিগের মান? 

সানজিদা: বলতে পারেন, প্রায় একই। প্রতিদ্বন্দ্বিতাও একই মানের। আমাদের দেশের মতো এখানেও লিগের দল সংখ্যা বেশি নয়। এবার যেমন আট দল নিয়ে খেলা হচ্ছে। তবে এখানে অনেক দলে বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়রা খেলে। তাই আমার মনে হয়, বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারার কারণে এখানে শেখার সুযোগটা আরও বেশি। 

ইস্ট বেঙ্গলে যখন খেলার প্রস্তাব পেলেন, তখন আসলে বিষয়টা কেমন লাগছিল আপনার? 

সানজিদা: আমাদের সাবিনা (খাতুন) আপু, মাতসুসিমা সুমাইয়া দেশের বাইরে খেলেছে। সাবিনা আপু তো ইন্ডিয়ার লিগে এবারও খেলছেন। দেশের বাইরের লিগে খেলার অভিজ্ঞতা আগে আমার ছিল না। তাই প্রথম যখন ডাক পেলাম, তাও আবার ইস্ট বেঙ্গলের মতো নামকরা ক্লাবের কাছ থেকে, তখনকার অনুভূতি আসলে বলে বোঝাতে পারব না। দারুণ রোমাঞ্চিত ছিলাম। 

পাশাপাশি কি চাপও অনুভব করছিলেন? 

সানজিদা: তা কিছুটা। যেহেতু প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে লিগে খেলব, একটু চাপ তো অনুভব করছিলামই। তবে কলকাতায় আসব বলে মনে হয়েছিল, এখানকার পরিবেশ একেবারে অপরিচিত নয়। আমাদের মতো বাংলায় কথা বলে। খাবারও একই রকম। মনে হয়েছিল, মানিয়ে নিতে তেমন একটা সমস্যা হবে না। শুধু দেশে যেমন পারফর্ম করি (লিগে), যদি সেই ধারাবাহিকতা এখানে ধরে রাখতে পারি, তাহলে সবকিছু আরও সহজ হয়ে যাবে। 

দেশে বসুন্ধরা কিংসের হয়ে লিগে গোলের পর গোল করেছেন। ইস্ট বেঙ্গলে ১০ নম্বর জার্সি দেওয়া হয়েছে আপনাকে। তবে অভিষেকটা সেভাবে রাঙাতে পারেননি…

সানজিদা: ওড়িশা এফসির বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে সুযোগ পেয়েছিলাম, কিন্তু কাজে লাগাতে পারিনি। তবে এ নিয়ে চিন্তা করছি না। যেহেতু দেশের বাইরের লিগে প্রথমবার খেলছি, সবকিছু বুঝে উঠতে একটু সময় লাগবে। আশা করি, দ্রুতই সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিতে পারব। 

ঢাকার গ্যালারিতে তো ‘সানজিদা’ স্লোগান শুনেছেন, কলকাতায়…? 

সানজিদা: ইস্ট বেঙ্গলের সমর্থকরা মাঠে খেলোয়াড়দের সবার নাম ধরেই স্লোগান দেয়। আমার নামেও দিয়েছে। নিজের নামে সমর্থকদের চিৎকার শুনতে কার না ভালো লাগে? তবে প্রথম ম্যাচে গোল পেলে আরও ভালো লাগত। 

এই ক্লাবের জার্সিতে বাংলাদেশে মোনেম মুন্না, রিজভি করিম রুমি, শেখ মোহাম্মদ আসলাম, গোলাম গাউস খেলেছেন। মুন্না তো কলকাতার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আজও কিংবদন্তি… 

সানজিদা: উনারা যখন এখানে খেলেছেন, তখন আমার জন্মও হয়নি। দেশে থাকতে উনাদের অনেক গল্প শুনেছি। এই ক্লাবে এসেও অনেক গল্প শুনেছি। নিজের দেশের কেউ অন্য কোনো দেশে এসে ভালো করেছে, এটা শুনলে নিজেরও ভালো লাগে। ভালো খেলার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়।

ক্লাবের দেয়ালে মুন্না-রুমিদের ছবির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলেছেন, সামাজিক মাধ্যমে তা দেখা গেছে। ইস্ট বেঙ্গলের দেয়ালে আপনার ছবিও কি সেঁটে থাকতে পারে ভবিষ্যতে? 

সানজিদা: সেটা তো চাই-ই, কিন্তু এখনই এসব নিয়ে ভাবছি না। উনারা এই ক্লাবের হয়ে ট্রফি জিতেছেন। সাফল্য পেয়েছেন। এখানে তারা ছিলেন কিংবদন্তি। আমি সবে এলাম। যদি মুন্না ভাইদের মতো পারফর্ম করতে পারি, তাহলে হয়ত আমার ছবিও থাকবে এখানে (হাসি)। 

এবার তো  ইস্ট বেঙ্গলের প্রতিপক্ষ কিকস্টার্ট এফসি। যেখানে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী থাকবেন সাবিনা খাতুন, যিনি আপনার দীর্ঘদিনের সতীর্থ। এবার সে শত্রুপক্ষে…। 

সানজিদা: এ ম্যাচটা নিয়ে আমার একেবারেই অন্যরকম লাগছে। সাবিনা আপুর বিপক্ষে দেশে থাকতে নিজেদের মধ্যে প্রস্তুতি ম্যাচে খেলেছি, কিন্তু কখনই প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে খেলিনি। সুযোগ পেলে এবার খেলব। আপুর জন্য শুভকামনা থাকল (হাসি)। তবে আমি কিন্তু জিততে চাই। আশা করি, আমার দল ইস্ট বেঙ্গল জিতবে (হাসি)। 

ভিন্ন প্রসঙ্গে আসা যাক। কলকাতায় গেলেই তো সবাই শপিংয়ের কথা ভাবে। নিউ মার্কেটে শপিং করতে গিয়েছেন? আপনার ক্লাবের পাশেই তো নিউ মার্কেট! 

সানজিদা: না, না এখনও ওখানে যাওয়া হয়নি। প্রস্তুতির ব্যস্ততার মধ্যেই থাকতে হচ্ছে। লিগে আমরা বর্তমানে ভালো অবস্থানে নেই (৭ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে ইস্ট বেঙ্গল)। লিগ টেবিলে উপরের দিকে উঠতে হবে আমাদের। আর আমি যে কাজের জন্য এখানে এসেছি, আগে সেটা করে নেই। তারপর অনেক শপিং করার সময় পাওয়া যাবে। 

শেষ প্রশ্ন, কলসিন্দুর থেকে কলকাতার ময়দান… এই পথচলায় পেছন ফিরে তাকিয়ে কেমন লাগে?

সানজিদা: শুরুতে এত বেশি ভাবিনি, কিন্তু যখন সাবিনা আপুরা দেশের বাইরে খেলতে গেলেন, এরপর আমরা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতলাম, তখন দেশের বাইরের ক্লাবে খেলার স্বপ্ন ঠিকই দেখেছি। সেই স্বপ্ন ইস্ট বেঙ্গলে এসে পূরণ হয়েছে। এখন লক্ষ্য সাফল্য পাওয়া।