ফ্রান্সকে হারিয়ে দুই যুগের অপেক্ষার অবসান ঘটায় ইতালি।
Published : 16 Nov 2022, 06:34 PM
আট কোয়ার্টার-ফাইনালিস্টের ছয়টিই ইউরোপের। সেম-ফাইনালের চারটি দলই তাদের। টুর্নামেন্টের শেষ ভাগে এসে বিশ্বকাপ যেন পরিণত হয় ইউরোয়। সেখানে ফ্রান্সকে হারিয়ে নিজেদের চতুর্থ শিরোপা জেতে ইতালি। পরিণত হয় বিশ্বকাপে ইউরোপের সফলতম দলে।
২০০০ সালের ৭ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকা, মরক্কো ও ইংল্যান্ডকে পেছনে ফেলে ২০০৬ আসর আয়োজনের দায়িত্ব পায় জার্মানি। এর আগে ১৯৭৪ আসর বসেছিল পশ্চিম জার্মানিতে।
সপ্তদশ আসরে প্রথম দুটি স্বাধীন দেশ খেলে একটি দলের হয়ে! ১৯৯৮ আসরে যুগোস্লাভিয়া নামে অংশ নেয় দেশটি। ২০০৬ সালে জার্মানিতে খেলে সার্বিয়া অ্যান্ড মন্তেনেগ্রো নামে। আসর শুরুর আগে গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীন দেশে পরিণত হয় মন্তেনেগ্রো। তবে ফিফা দুটি দেশকে এক দলে খেলার সুযোগ দেয়।
বিশ্বকাপ অভিষেক হয় অ্যাঙ্গোলা, ঘানা, কোত দি ভোয়া, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো এবং টোগোর। এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপে ছিল ফিফার ছয় অঞ্চলের প্রতিটার অন্তত একটি প্রতিনিধি।
১৯৮ দেশের বাছাই পর্ব পেরিয়ে আসে ৩১ দল, এর ১৩টি ইউরোপ থেকে। পাঁচটি আসে আফ্রিকা থেকে। চারটি করে আসে এশিয়া, কনকাকাফ ও লাতিন আমেরিকা থেকে। ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে অংশ নেয় অস্ট্রেলিয়া।
গ্রুপ পর্ব
ফরম্যাটে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের মতোই ৩২ দল খেলে আট গ্রুপে। প্রতি গ্রুপের সেরা দুই দল যায় দ্বিতীয় রাউন্ডে।
গ্রুপ ‘এ’: জার্মানি, একুয়েডর, পোল্যান্ড, কোস্টা রিকা
গ্রুপ ‘বি’: ইংল্যান্ড, সুইডেন, প্যারাগুয়ে, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো
গ্রুপ ‘সি’: আর্জেন্টিনা, নেদারল্যান্ডস, কোত দি ভোয়া, সার্বিয়া অ্যান্ড মন্তেনেগ্রো
গ্রুপ ‘ডি’: পর্তুগাল, মেক্সিকো, অ্যাঙ্গোলা, ইরান
গ্রুপ ‘ই’: ইতালি, ঘানা, চেক প্রজাতন্ত্র, যুক্তরাষ্ট্র
গ্রুপ ‘এফ’: ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, ক্রোয়েশিয়া, জাপান
গ্রুপ ‘জি’: ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, টোগো
গ্রুপ ‘এইচ’: স্পেন, ইউক্রেন, তিউনিসিয়া, সৌদি আরব
গ্রুপ ‘এ’ থেকে পরের ধাপে যায় জার্মানি ও একুয়েডর। এই গ্রুপের কোনো ম্যাচ ড্র হয়নি। তিনটিতে জিতে ৯ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় জার্মানি। দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ একুয়েডর।
পোল্যান্ডের বিপক্ষে হেরে শূন্য হাতে ফেরে কোস্টা রিকা।
গ্রুপ ‘বি’ থেকে পরের ধাপে যায় ইংল্যান্ড ও সুইডেন। দুই জয় ও এক ড্রয়ে গ্রুপ সেরা হয় ইংল্যান্ড। এক জয় ও দুই ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ সুইডেন।
একমাত্র জয়ে ৩ পয়েন্ট পায় প্যারাগুয়ে। অভিষেকে ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর অর্জন সুইডেনের বিপক্ষে ড্র।
গ্রুপ ‘সি’ থেকে শেষ ষোলোয় যায় আর্জেন্টিনা ও নেদারল্যান্ডস। দুটি করে জয় ও নিজেদের মধ্যে ড্রয়ে দুই দলেরই পয়েন্ট ছিল ৭। গোল পার্থক্যে এগিয়ে থেকে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা।
সার্বিয়া অ্যান্ড মন্তেনগ্রোকে হারিয়ে অভিষেকে একটি জয় পায় কোত দি ভোয়া।
গ্রুপ ‘ডি’ থেকে গ্রুপ থেকে শেষ ষোলো যায় পর্তুগাল ও মেক্সিকো। তিন জয়ে ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় পর্তুগাল। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ মেক্সিকো।
দুটি ড্রয়ে ২ পয়েন্ট পায় অ্যাঙ্গোলা। ইরানের প্রাপ্তি একটি ড্র।
গ্রুপ ‘ই’ থেকে শেষ ষোলোয় যায় ইতালি ও ঘানা। দুটি জয় ও একটি ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা ইতালি। দুটি জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ ঘানা।
একটি জয়ে ৩ পয়েন্ট পায় চেক প্রজাতন্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তি একটি ড্র।
গ্রুপ ‘এফ’ থেকে শেষ ষোলোয় যায় ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়া। তিন জয়ে ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় ব্রাজিল। একটি করে জয় ও ড্রয়ে রানার্সআপ অস্ট্রেলিয়া। দুটি ম্যাচ ড্র করে ক্রোয়েশিয়া, একটিতে জাপান।
গ্রুপ ‘জি’ থেকে পরের ধাপে যায় সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্স। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা সুইজারল্যান্ড। এক জয় ও দুই ড্র নিয়ে রানার্সআপ ফ্রান্স।
একটি করে জয় ও ড্রয়ে সম্ভাবনা জাগায় দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু শেষ ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে হেরে গ্রুপ পর্বেই শেষ হয় তাদের পথ চলা। তিন ম্যাচেই হেরে বিদায় নেয় টোগো।
গ্রুপ ‘এইচ’ থেকে পরের ধাপে যায় স্পেন ও ইউক্রেন। তিন জয়ে ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ। নিজেদের মধ্যে ড্র করে তিউনিসিয়া ও সৌদি আরব।
দ্বিতীয় রাউন্ড
শেষ ষোলোয় মুখোমুখি হয়: জার্মানি-সুইডেন, আর্জেন্টিনা-মেক্সিকো, ইংল্যান্ড-একুয়েডর, পর্তুগাল-নেদারল্যান্ডস, ইতালি-অস্ট্রেলিয়া, সুইজারল্যান্ড-ইউক্রেন, ব্রাজিল-ঘানা ও স্পেন-ফ্রান্স।
২৪ জুন প্রথম ম্যাচে লুকাস পোডলস্কির জোড়া গোলে সুইডেনকে ২-০ ব্যবধানে হারায় জার্মানি।
পরের ম্যাচে ষষ্ঠ মিনিটে মেক্সিকোকে এগিয়ে নেন রাফায়েল মার্কেস। দশম মিনিটে সমতা ফেরান এর্নান ক্রেসপো। ৯৮তম মিনিটে মাক্সি রদ্রিগেসের অসাধারণ ভলিতে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ২-১ গোলে জিতে জায়গা করে নেয় কোয়ার্টার-ফাইনালে।
পরদিন ডেভিড বেকহ্যামের একমাত্র গোলে একুয়েডরকে বিদায় করে দেয় ইংল্যান্ড। পরের ম্যাচে একই ব্যবধানে নেদারল্যান্ডসকে হারায় পর্তুগাল।
২৬তম জুন ম্যাচের যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে ফ্রান্সেসকো তত্তির সফল স্পট কিকে অস্ট্রেলিয়াকে হারায় ইতালি। পরের ম্যাচে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর যোগ করা সময়েও হয়নি কোনো গোল। টাইব্রেকারে ৩-০ ব্যবধানে সুইজারল্যান্ডকে হারায় ইউক্রেন।
পরদিন ঘানাকে ৩-০ গোলে হারায় ব্রাজিল। পঞ্চম মিনিটে দলকে এগিয়ে নেন রোনালদো। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন আদ্রিয়ানো। ৮৪তম মিনিটে জালের দেখা পান জে রবের্তো। অন্য ম্যাচে স্পেনকে ৩-১ গোলে হারায় ফ্রান্স।
কোয়ার্টার-ফাইনাল
শেষ আটে মুখোমুখি হয়: আর্জেন্টিনা-জার্মানি, ইতালি-ইউক্রেন, ইংল্যান্ড-পর্তুগাল ও ফ্রান্স-ব্রাজিল।
৩০ জুনের প্রথম ম্যাচে ৪৯তম মিনিটে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নেন রবের্তো আয়ালা। ৮০তম মিনিটে জার্মানিকে সমতায় ফেরান মিরোস্লাভ ক্লোসা। পরে টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে জিতে শেষ চারে পৌঁছায় জার্মানি।
পরের ম্যাচে ইউক্রেনকে ৩-০ গোলে হারায় ইতালি। জানলুকা জামব্রোত্তা ষষ্ঠ মিনিটে দলকে এগিয়ে নেওয়ার পর জোড়া গোল করেন লুকা টনি।
১ জুলাই নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও গোল পায়নি ইংল্যান্ড ও পর্তুগাল। সেখানে শেষ হাসি হাসে পর্তুগাল। ৩-১ ব্যবধানে জিতে জায়গা করে নেয় শেষ চারে।
পরের ম্যাচে থিয়েরি অঁরির একমাত্র গোলে ব্রাজিলকে বিদায় করে দেয় ফ্রান্স।
সেমি-ফাইনাল
৪ জুলাই ডর্টমুন্ডে জার্মানি ও ইতালির ম্যাচে প্রথম ৯০ মিনিটে কোনো গোল হয়নি। অতিরিক্তি সময়েও আসছিল না গোল। মনে হচ্ছিল খেলা গড়াবে টাইব্রেকারে। এর মধ্যেই ১১৯তম মিনিটে ইতালিকে এগিয়ে নেন ফাবিও গ্রোস্সো। যোগ করা সময়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন আলেস্সান্দ্রো দেল পিয়েরো।
পর দিন জিনেদিন জিদানের সফল স্পট কিকে পর্তুগালকে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয় ফ্রান্স।
৮ জুলাই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে পর্তুগালকে ৩-১ গোলে হারায় জার্মানি।
ফাইনাল
৯ জুলাই, ২০০৬। বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে ৬৯ হাজার দর্শকের সামনে ফাইনালে মুখোমুখি হয় ইতালি ও ফ্রান্স।
সপ্তম মিনিটে সফল স্পট কিকে দলকে এগিয়ে নেন জিদান। ১৯তম মিনিটে সমতা ফেরান মার্কো মাতেরাজ্জি। ম্যাচের বাকি সময়ে হয়নি কোনো গোল। অতিরিক্ত সময়ে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ফ্রান্স অধিনায়ক জিদান।
টাইব্রেকারে ৫-৩ গোলে জিতে ২৪ বছরের মধ্যে প্রথম ও সব মিলিয়ে চতুর্থ শিরোপা জয়ের উল্লাসে মাতে ইতালি।
অষ্টাদশ বিশ্বকাপঃ
· স্বাগতিকঃ জার্মানি
· চ্যাম্পিয়নঃ ইতালি
· রানার্স আপঃ ফ্রান্স
· মোট ম্যাচঃ ৬৪
· মোট গোলঃ ১৪৭
· গোল গড়ঃ ২.৩
· সর্বোচ্চ গোলদাতাঃ মিরোস্লাভ ক্লোসা (জার্মানি- ৫ গোল)
· সেরা খেলোয়াড়ঃ জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স)