Published : 02 Jul 2026, 04:33 PM
টরন্টোতে বৃহস্পতিবার বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় ওঠার লড়াইয়ে পর্তুগাল যখন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামবে, বিশ্বকাপের পঞ্জিতে তারিখটা ২ জুলাই। কিন্তু পর্তুগালে তখন ৩ জুলাই। পর্তুগিজ ফুটবলের শোকের দিন। বিশ্ব ফুটবলেরও শোকের দিন। যে দিনটি আসলে ছাড়িয়ে গেছে ফুটবলের সীমানাও।
বছর ঘুরে চলে এসেছে সেই দিন, একটি দুর্ঘটনার খবর যেদিন গোটা ফুটবল বিশ্বকে শোকের চাদরে জড়িয়ে রেখেছিল। দিয়োগো জটার চলে যাওয়ার এক বছর!
তার দক্ষতা, গোল করার সামর্থ্য এবং জাতীয় দলের প্রতি নিষ্ঠা ও নিবেদন, তাকে করে তুলেছিল দলের ভেতর প্রবল জনপ্রিয়। দলের বাইরেও ছিলেন তিনি দারুণ দর্শকপ্রিয়। ২৮ বছর বয়সী জটা এবং তার তিন বছরের ছোট ভাই আন্দ্রে সিলভা উত্তর-পশ্চিম স্পেনে গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত হন। তাদের ল্যাম্বরগিনি গাড়িটি রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ে আগুন ধরে যায়।
গত এক বছর ধরেই ঘুরেফিরে নানা সময়ে তাদের স্মৃতি পর্তুগাল ও লিভারপুল দলকে, তার সব সতীর্থকে কাতর করে তুলেছে। পর্তুগালের বিশ্বকাপ অভিযানেও এসেছে তার প্রসঙ্গ। এখন মৃত্যুবার্ষিকীর সময়টি নিঃসন্দেহে সবাইকে আরও বেশি নাড়া দেবে, আবেগের জোয়ার তুলবে প্রবলভাবে।
পর্তুগালের কোচ রবের্তো মার্তিনেস তো আগেই ঘোষণা করেছেন, বিশ্বকাপ স্কোয়াডের সদস্য সংখ্যা ২৬+ ১। জটাকেও তিনি দলের সঙ্গেই দেখেন। শুধু এটুকুই নয়, প্রয়াত ফুটবলারকেই তিনি বলেছেন দলের শক্তি, দলের ‘আলো।’
সেটা যে বলার জন্যই নয়, তা পর্তুগাল দলের নানা কার্যক্রমেও ফুটে উঠেছে। দলের বিশ্বকাপ অভিযানে জটা দৃশ্যমান হয়ে ফুটে উঠেছেন বারবার।
জটার ২১ নম্বর জার্সিটি পরছেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হুবেন নেভ্স। দলের সবাইকে জটার নাম লেখা রিস্টব্যান্ড উপহার দিয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।
হিউস্টনে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের উদ্বোধনী বিশ্বকাপ ম্যাচের আগে আবেগঘন শ্রদ্ধাঞ্জলি আয়োজনে ছিলেন তার বাবা-মা। চোখের জলে সবাই স্মরণ করেছেন তাকে।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিন মিডফিল্ডার ভিতিনিয়া বলেন, এই ম্যাচে তাদের বাড়তি প্রেরণা জোগাবে জটার স্মৃতি।
“ম্যাচটি জিততে চাওয়ার অনেক তাড়না আছে। পাশাপাশি বাড়তি একটি ব্যাপার এই বিশেষ দিনটি। আমাদের পরিবারের জন্য, দিয়োগো জটার জন্য, পুরো দেশের জন্য, পুরো পর্তুগালের জন্য আমাদের সবরকম অনুপ্রেরণা রয়েছে।”
জটার প্রয়াণ স্পর্শ করেছিল এমনকি স্কটল্যান্ডের বিশ্বকাপ স্কোয়াডকেও। স্কটিশ অধিনায়ক অ্যান্ডি রবার্টসন যে লিভারপুলের অধিনায়কও ছিলেন। দুজনের ঘনিষ্ঠতাও ছিল অনেক। গত নভেম্বরে স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করার পরই জটার স্মৃতি মনে করেছেন রবার্টসন।
বিশ্বকাপ শুরুর পর রবার্টসনকে আবেগময় এক চিঠি লিখেছিলেন জটার স্ত্রী।
“যখন আপনি মাঠে নামবেন, দিয়োগো (জটা) আপনার ভাবনায়, আপনার পদক্ষেপে, আপনার হৃদয়ে, আপনার সঙ্গে থাকবে। তাকে ভুলে না যাওয়ার জন্য ধন্যবাদ। তাকে সঙ্গে বয়ে নেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। হারানোর বেদনাকে শক্তিতে এবং এত সুন্দর কিছুতে রূপান্তরিত করার জন্য কৃতজ্ঞতা।”
আবেগের এই স্রোত আরও উত্তাল করে তুলছে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের সময়টি। টরন্টোতে যখন খেলা শুরু হবে, পর্তুগালে তখন মধ্যরাত পেরিয়ে যাবে। পুরো জাতিকে হতবাক করে দেওয়া এবং ফুটবল জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করা সেই দিন ফিরে আসবে। এই ম্যাচটি তাই একটি ফুটবলের লড়াইয়ের চেয়েও বেশি কিছু।
পর্তুগালের অনেক ফুটবলারের কাছে জটা স্রেফ একজন সতীর্থের চেয়েও ছিলেন বেশি কিছু। এমন এক প্রজন্মের অংশ ছিলেন তিনি, যারা এই দেশের ফুটবলকে অভিজাতদের কাতারে রাখতে সাহায্য করেছিল। ফুটবল ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে তিনি ছিলেন ড্রেসিংরুমের নির্ভরতার জায়গা। স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত উপহার দিয়েছিলেন দলকে।
পায়ের মাংসপেশির চোটের কারণে গত বিশ্বকাপে তিনি খেলতে পারেননি। এবার তার দলে থাকা অনেকটা নিশ্চিত ছিল।
সময়ের প্রবাহ যদিও এই বেদনাকে খুব একটা কমাতে পারেনি, তবে ফুটবলের দুনিয়া তো এগিয়েই চলে প্রকৃতির নিয়মে। না থেকেও জটা এখনও এই দলের বড় শক্তি।
টরন্টোর ‘লিটল পর্তুগাল’ এলাকার ‘এমিগোজ দা দুন্দাস স্পোর্টস বার’-এর পর্তুগিজ-কানাডিয়ান কর্ণধার মিগেল ডি সিলভা যেমন বললেন, “দিয়োগো জটা এমন এক ফুটবলার ছিলেন. যাকে পর্তুগালের মানুষেরা খুব ভালোবাসত। আমার মনে হয়, তিনি পর্তুগিজদের আরও নতুন কিছু দেবেন, যেটি এই ম্যাচটি জেতার জন্য আরও একটি কারণ।”