অনন্য, অতুলনীয়, সত্যিকারের নেতা সাবিনা

শুধু গোল আর পারফরম্যান্সেই নয়, মাঠের ভেতরে-বাইরে সাবিনার অসাধারণ নেতৃত্ব দলকে এগিয়ে নিয়েছে শিরোপার পথে। 

কাঠমান্ডু থেকে মোহাম্মদ জুবায়েরবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 20 Sept 2022, 04:43 AM
Updated : 20 Sept 2022, 04:43 AM

‘ক্যাপ্টেন, গোলের লোভ সামলে নিচে নেমে খেললেন কি করে? বেশ কয়েকবার আপনাকে রক্ষণ সামলাতে দেখা গেল!’ প্রশ্ন শুনে প্রাণোচ্ছল হাসিতে সাবিনা খাতুনের উত্তর, ‘আমি স্যাক্রিফাইস করতে ভালোবাসি…।” ত্যাগের সঙ্গে যখন কেউ প্রাণ বেঁধে নেয়, আদর্শ নেতার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে তো তখনই।

বাংলাদেশ অধিনায়কের এই ত্যাগ, নিষ্ঠা আর নিবেদন নিয়ে সতীর্থদের ভাবনাতেও সেই একই সুরের প্রতিধ্বনি। মারিয়া মান্দার চোখে তাই সাবিনা ‘পারফেক্ট ক্যাপ্টেন’, স্বপ্না খুঁজে পান না কোনো তুলনা, “সাবিনা আপু তো সাবিনা আপুই!”

মেয়েদের ফুটবলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নাম সাবিনা। দলের বড় ভরসাও। সেই আস্থার প্রতিদান এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দারুণভাবেই দিয়েছেন তিনি। দলের শিরোপা জয়ে নেতৃত্বে দিয়েছেন সামনে থেকে।

টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলস্কোরার, সেরা খেলোয়াড়, সবই তিনি। তবে সবচেয়ে ভালো যে কাজটি তিনি করেছেন, দলকে এক সুতোয় গেঁথে রাখা, উজ্জীবিত করা এবং দলের প্রয়োজনে মাঠে নিজের ভূমিকা বদল করেও সেখানে মানিয়ে নিয়ে শতভাগ উজাড় করে দেওয়া।

টুর্নামেন্টে এবার পথচলার শুরুতেই মালদ্বীপের জালে জোড়া গোল করেন সাবিনা। এরপর পাকিস্তানের জালে উপহার দেন হ্যাটট্রিক। কিন্তু সাফের পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মহারণে সাবিনার ভূমিকা গেল বদলে। তখন তিনি আর মূল ফরোয়ার্ড নন, মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগের অর্কেস্ট্রার সুর বেঁধে দেওয়া কন্ডাক্টর। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেই দায়িত্বও সাবিনা পালন করেন সূচারুভাবে।   

সেমি-ফাইনালের প্রতিপক্ষ যখন তুলনামূলকভাবে দুর্বল ভুটান, কোচ গোলাম রব্বানীর ছকে ফের পরিবর্তন। আক্রমণের ভার, গোল এনে দেওয়ার দায়িত্ব সাবিনার বিশ্বস্ত কাঁধে। ২৮ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড যথারীতি তা পালন করলের আবারও হ্যাটট্রিক করে! ৮ গোল নিয়ে উঠে গোলস্কোরারের তালিকার শীর্ষে।

স্বাগতিক নেপালের বিপক্ষে ফাইনালে ছোটনের ছকে আবারও বদল। সাবিনাকে ফিরিয়ে নেওয়া হলো সেই ভারত ম্যাচের ছকে। সোমবারের ফাইনালের আগে নেপাল সাফের চারবারের রানার্সআপ, ২০১৬ সালে একবারই রানার্সআপ হয়েছিল বাংলাদেশ। এবারের ফাইনালও নেপালের আঙিনায়। ছোটন তাই সাবিনাকে খেলালেন আক্রমণভাগের একটু নিচে, প্লেমেকারের ভূমিকায়।

সাবিনা কোচের ছককে আপন করে নিলেন নিঃস্বার্থ মানসিকতায়। অধিনায়কের মানসিকতা নিয়ে কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের কণ্ঠে তাই উচ্ছ্বাসের বান। সাবিনা তার চোখে মাঠের আসল নেতা।

“এই টুর্নামেন্টে সাবিনা শুধু সেরা খেলোয়াড় বা সেরা গোলদাতা নয়, সেরা লিডারও। আমরা তো বাইরে কাজ করি, ভেতরে ভেতরে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার যে বিষয়টা থাকে, সেটা এই টুর্নামেন্টে সাবিনা যেভাবে পালন করেছে, আমি এক কথায় বলব-সুপার।”

“দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলারদের মধ্যে সাবিনা একজন, এ কারণেই সে আত্মবিশ্বাসী। এই টুর্নামেন্টেও প্রতিটি ম্যাচে দেখা গেছে, বল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ওর মধ্যে কোনো জড়তা নেই, তাড়াহুড়ো নেই। ও শুধু দলনেতা হিসেবে নিজের কাজটুকু করতে চেয়েছে এবং করেছে।”

শুধু কথায় নয়, কোচ ছোটনও স্বীকৃতি দিতে চান নিজের পক্ষ থেকে অধিনায়ককে পুরস্কার দিয়েও।

টুর্নামেন্ট জুড়ে মাঝমাঠে আলো ছড়ানো মিডফিল্ডার মারিয়া মান্দা প্রয়োজনের সময় পাশে পেয়েছেন সাবিনাকে। ২৮ বছর বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড তাই তার কাছে আদর্শ অধিনায়ক।

“সেরা একাদশ নিয়ে কোচ যে পরিকল্পনা করেন, আমরা সবাই সেটা বাস্তবায়নের চেষ্টা করি এবং সাবিনা আপু পারফেক্ট ক্যাপ্টেন বলেই সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। আপু যে এই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় এবং সর্বোচ্চ গোলদাতা, ওই কারণেই। আত্মত্যাগের দিক থেকেও আপু সেরা।” 

মাঝমাঠে মারিয়ার সতীর্থ মনিকা চাকমার কণ্ঠও অধিনায়ককে নিয়ে বেজে উঠল একই মুগ্ধতায়। এবারের সাফে বাংলাদেশের অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ারও পথে অধিনায়কের অবদান তিনি রাখলেন সবকিছুর ওপরে।

“নেপালের বিপক্ষে ফাইনাল, ওরা স্বাগতিক, আমাদের কাজটা সহজ ছিল না। কিন্তু ফাইনালেও আমরা মাঝমাঠ নিরাপদ রাখার চেষ্টা করেছি। সাবিনা আপুও খুব সহযোগিতা করেছেন। এ কারণে আমরা মাঝমাঠে যেটা করতে চেয়েছিলাম, সেটা ঠিকঠাকভাবে করতে পেরেছি।”

অধিনায়ককে সাবিনার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসার প্রকাশ সবচেয়ে বেশি আবেগ দিয়ে করলেন সিরাত জাহান স্বপ্না। দশম মিনিটের পর ডান পায়ের পুরানো চোটের ব্যথায় যিনি ফাইনালে খেলা চালিয়ে যেতে পারেননি। দর্শক হিসাবে দেখেছেন দশরথ স্টেডিয়ামের আঙিনায় দলের প্রথম শিরোপা জয়ের উৎসব।

“সাবিনা আপুর তো তুলনাই হয় না। সাবিনা আপু তো সাবিনা আপুই। উনি যেভাবে গোলের পর গোল করছেন… উনি গোল করেন, গোল করান-আপুর প্রতিটি দিক আমার ভালো লাগে। প্রতিটি ম্যাচে আপু ফরোয়ার্ড লাইন ধরে রাখছেন, আবার মাঝমাঠে বল সাজানো-গোছানোর যে বিষয়টা থাকে, সেটাও করছেন।”

কোচ-সতীর্থদের এমন ভালোবাসা যখন পৌঁছে দেওয়া হলো সাবিনাকে, সতীর্থদের মধ্যেই সাবিনা খুঁজে নিলেন তৃপ্তি ও আনন্দ।

“কোচরা সবসময় আমাকে বলেন, এই ধরণের ম্যাচে আমার অভিজ্ঞতা ভালো এবং সেটা কাজে লাগাতে বলেন। এই ম্যাচেও আমি সেটা করতে চেয়েছি। আমি এই স্যাক্রিফাইসটুকু উপভোগ করি। আমি এই দলের সবাইকে খুব ভালোবাসি এবং এ কারণেই স্যাক্রিফাইসটুকু করতে পারি।”

প্রথম সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফিতে চুমু আঁকার এই অভিযানের পরতে পরতে লেখা হয়ে আছে অধিনায়ক সাবিনার নেতৃত্বের গল্প। বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবলে সাবিনা আগে থেকেই মহীরূহ। এবার যেন তিনি ছুঁয়ে ফেললেন আকাশ!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক