হামজা-শমিতদের সঙ্গে লড়াই করেই এগিয়ে যেতে চান কাজেম
শান্ত শৈশব, কানাডার জীবন, ক্রিকেটার বাবার ছেলে হয়েও ফুটবলার হয়ে ওঠা, লাল-সবুজের জার্সি ঘিরে স্বপ্ন-এসব নিয়ে কথার ঝুড়ি মেলে ধরলেন বাংলাদেশের অনেক প্রবাসী ফুটবলারদের একজন।
বরাবরই তিনি চুপচাপ। প্রথমবারের মতো কোনো পণ্যের ‘দূত’ হওয়ার অনুষ্ঠানে এসেও সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি তেমনই থাকলেন। ইলেক্ট্রোলাইট ড্রিংকস ব্রুভানার প্রচারে কাজ করবেন, নিজেকে লাল-সবুজের জার্সিতে আরও মেলে ধরবেন, ছোট-ছোট কথায় বললেন এসব। তবে এরপর, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাথে আলাপচারিতায় এই মিডফিল্ডার খুলে দিলেন মনের আগল।
ঢাকায় শান্ত শৈশব, এরপর কানাডার জীবন, বাংলাদেশে ফেরা, ক্রিকেটার বাবার ছেলে হিসেবে ফুটবলার হয়ে ওঠা, প্রথমবারের মতো কোনো পণ্যের দূত হওয়ার রোমাঞ্চ, লাল-সবুজের জার্সিতে নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন-এমন অনেক বিষয় নিয়ে কথার ঝুড়ি মেলে ধরলেন তিনি!
কাজেমের বাবা হালিম শাহ, যিনি ঘরোয়া ক্রিকেটে ২০০৫ সাল পর্যন্ত খেলেছেন। জাতীয় দলের জার্সিতে অবশ্য খেলার সুযোগ মেলেনি তার। হালিমের স্বপ্ন ছিল ছেলেকে ক্রিকেটার বানাবেন, লাল-সবুজের জার্সিতে দেখবেন। ছেলেকে ক্রিকেটার বানানোর স্বপ্ন নানা কারণে পূরণ হয়নি, তবে বাংলাদেশের জার্সিতে ঠিকই দেখার ইচ্ছাটা পূরণ হয়েছে তার। কিভাবে কাজেমের পথটা বেঁকে ক্রিকেট থেকে ফুটবলের পানে ছুটল, ফুটবল কিভাবে তাকে খ্যাতি এনে দিল, সেই গল্পের পুরোটাই তুলে ধরা হল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পাঠকদের জন্য।
প্রশ্ন: ছোটবেলা থেকেই আপনি কি এমন শান্ত, চুপচাপ?
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: হ্যাঁ, ছোটবেলা থেকেই আমি খুব কম কথা বলি। শান্তশিষ্ঠ। ঢাকায় যে দুই বছর আমি স্কুলে পড়েছিলাম, সেখানে আমাকে স্কুলের টিচাররাও বলতো যে, আমি খুব কম কথা বলি। তবে এখন চেষ্টা করি নিজেকে আরও বেশি প্রকাশ করতে, সবার সাথে কথা বলতে।
তাহলে বলুন, ক্রিকেটার বাবার ছেলে হয়ে ফুটবলে এলেন কিভাবে?
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: ছোটবেলায় আমি চুপচাপ থাকলেও খেলাধুলা করতে পছন্দ করতাম। বাংলাদেশে থাকতে টুকটাক ক্রিকেট খেলতাম, ক্রিকেটার হওয়ার ইচ্ছাই ছিল। কিন্তু কানাডাতে (২০০৫ সালে) চলে যাওয়ার পর দেখলাম সেখানে বাচ্চারা ক্রিকেট খেলে না, ফুটবল খেলে। তো আমিও ওদের সাথে ফুটবল নিয়ে খেলা শুরু করি। বাবা ২০০৬ সালে বিশ্বকাপের সময় একটা বল কিনে দেয়, তখন ওটা নিয়ে নিয়মিত খেলা শুরু করি। এভাবেই ফুটবলে আসা।
কখন মনে হলো, ফুটবল আপনার পেশা হতে পারে?
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: যখন আমার বয়স ১৭ বা ১৮ বছর, তখন আমার মনে হয়েছে যে না আমি এটাকে পেশা হিসেবে নিতে পারি। তারপর-ই আরকি মনোযোগী হই খেলায় আরও।
শুরু থেকে কি মিডফিল্ডে খেলতেন?
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: না। শুরুতে স্ট্রাইকার পজিশনে খেলতাম। তারপর ধীরে ধীরে মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেকে তৈরি করি। এটা একটা সৃষ্টিশীল পজিশন। এই পজিশনে খেলা আমি বেশ উপভোগ করি। এই পজিশনে আরও বেশি সৃষ্টিশীল হওয়া যায়। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডেও খেলতে পারি।
ইদানিং বাংলাদেশ দলে তো মাঝমাঠের লড়াই বেশ জমে উঠেছে। হামজা চৌধুরী এসেছেন, কানাডা থেকে শমিত সোম এসেছেন। আপনি ইদানিং অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন তাতে…।
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: যদি খেলতে না পারি, খেলোয়াড় হিসেবে খানিকটা হতাশা তো লাগেই। কিন্তু আমি নিজেকে বোঝাই যে, ধৈর্য ধরলে ভালো কিছু হবে। আর আমার মধ্যে একটা ভালো গুণ আছে যে, আমি নিজেকে এই সময় অনুপ্রাণিত করতে পারি। প্রতিটা দিন নিজেকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত করি, আজ এটা হয়নি, কাল হবে, কাল না হলে পরশু হবে। আমাকে কেবল ধৈর্য্য ধরে চেষ্টা করে যেতে হবে। নিজের স্কিল নিয়ে আরও কাজ করি যাতে আরও ভালোভাবে নতুন দিন শুরু করতে পারি এবং নিজেকে আরও দক্ষতার সাথে প্রমাণ করতে পারি।
অবশ্যই চ্যালেঞ্জ আছে (দলে জায়গা পাওয়ার), আমি এটা বেশ উপভোগ করি। দলে অনেক বেশি ভালো মিডফিল্ডার রয়েছে। হামজা-শমিত আসার পর এই চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। এটা আমি বেশ উপভোগ করছি। আমি মনে করি, এটা থেকে আমার নিজের খেলা আরও উন্নত করার অনুপ্রেরণা আসে।
ধৈর্য ধরার এই মানসিকতা বাবা নাকি মায়ের দিক থেকে পাওয়া?
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: বাবা-মায়ের একটা প্রভাব তো সন্তানদের ওপর থাকেই। আমার বাবা ক্রিকেটার হলেও কখনও জোরাজুরি করেননি যে আমাকে ক্রিকেটার হতেই হবে। কিছু হওয়া নিয়ে মা-ও চাপ দেননি কখনও। এতে আমার জন্য অনেক কিছু সহজ হয়েছে। আর নির্দিষ্টভাবে যদি ধৈর্য্য নিয়ে বলেন, আমি বলব, ধর্ম আমাকে এটা শিখিয়েছে।
প্রবাসীদের মধ্যে জামাল ভূঁইয়া, আপনি আগে থেকেই ছিলেন দলে। হামজা-শমিতদের আসার পর ফুটবলে নতুন উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। তো মাঝে যখন এই উন্মাদনা ছিল না, হতাশ লাগত না?
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: বাংলাদেশে আমি চার মৌসুম ধরে খেলছি। যখন এসেছিলাম, তখন কিন্তু দেশের ফুটবলে এত উন্মাদনা ছিল না। অন্য দেশ এবং বিদেশি ক্লাব ফুটবলের প্রতি মানুষের যে উন্মাদনা ছিল, সেটা দেশের ফুটবলের প্রতি ছিল না। এটা দেখে সে সময় খানিকটা হতাশ যে হতাম না, তা নয়। তবে আশাহত হতাম না। বললাম না, আমি ধৈর্য ধরতে পারি, অপেক্ষা করতে পারি। এখন দেশের ফুটবলের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। স্টেডিয়ামে মানুষ আমাদের খেলা দেখতে আসছে। আমাদের খেলাধুলার খোজ খবর নিচ্ছে।
চার বছর আগে কী ভেবে বাংলাদেশের হয়ে খেলতে এসেছিলেন?
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: আসলে কানাডায় খুব বেশি অপরচুনিটি ছিল না। তখন বাংলাদেশের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নিই। তখন আমাকে জানানো হয় যে, জাতীয় দলে জায়গা পেতে হলে আগে লিগে খেলতে হবে। তো তখন আমি চলে আসি। যখন কোনো খেলোয়াড় ফুটবল খেলতে আসে, তখন তার ইচ্ছা থাকে অবশ্যই সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার। আমারও তেমনি ইচ্ছা ছিল। বাবা দেশে ক্রিকেট খেলেছিল, যদিও সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলেনি, তবে সেটা নিয়ে আমার উপর চাপ ছিল না। আমি নিজের মত করে এগুচ্ছিলাম যে, লিগে পারফরম করে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়াব। নিজের পরিকল্পনা অনুসারেই আমি এগিয়েছিলাম। এরপর খেলেছি এবং খেলছি।
গত দেড় বছরে জাতীয় দলের হয়ে ছয় ম্যাচ খেলেছেন, বিষয়টা…
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: জাতীয় দলে এখন পর্যন্ত আমি খেলার খুব বেশি সময় পাইনি। যতটুকু পেয়েছি, নিজের সেরাটা খেলার চেষ্টা করি। তবে আরও বেশি প্লেয়িং টাইম পেলে আরও বেশি কিছু দেখানোর চেষ্টা করব। বল নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য, থ্রু পাসসহ আরও বেশ কিছু দিকে আমি দক্ষ। আরও বেশি সুযোগ পেলে মাঠে সেগুলো দেখাব। বাকীটা সময়ই বলে দিবে, দেখা যাক কী হয়।
একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। এই প্রথম কোনো পণ্যের দূত হলেন।
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: এটা অন্যরকম আনন্দের। এটা আমার জন্য অনুপ্রেরণার। এই প্রথম কোনো পণ্যের সাথে যুক্ত হলাম। তবে আমরা জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুবাদে এই ইনডোরসমেন্টগুলো পাচ্ছি, বাইরের দেশে কিন্তু ক্লাব পর্যায়ে এগুলো পেয়ে থাকে সবাই। এই দিকটা নিয়েও ভাবতে হবে আমাদের।
সেই ভাবনার জায়গা থেকে যদি জানতে চাই, এক্ষেত্রে দেশের ক্লাবগুলোকে এই বাজার তৈরি করতে হলে কী করতে হবে? আপনি নিজেও খেলছেন দেশের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনীতে।
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: এর বিস্তারিত তো বলতে পারব না। যতটুকু সহজভাবে বুঝি সেটা হচ্ছে, আমাদের যে লিগ চলে, এটা খুব বেশি উন্নত না। খেলাগুলো যে মাঠে হয়, সেগুলো খুব বেশি উপযুক্ত নয় পাশাপাশি ব্রডকাস্টিং কোয়ালিটিও ভালো না। তো জাতীয় দলের ফুটবলের প্রতি মানুষের যে ক্রেজ এখন আছে, সেটা লিগের বেলায় থাকে না। এটা খুব দুঃখজনক।
মাঠ ভালো না হলে খেলার মান ভালো হয় না। ব্রডকাস্টিং ভালো না হলে মানুষের আগ্রহ জন্মে না। এইগুলো যদি আরও উন্নত হয় তাহলে দর্শকরাও আরও আগ্রহ নিয়ে খেলাগুলো দেখবে, উন্মাদনা বাড়বে, স্থানীয় খেলোয়াড়দেরও মান আরও উন্নত করার মানসিকতা তৈরি হবে।
আপনি যে পণ্যের দূত হলেন, সেই ব্রুভানার দূত হয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন রোনালদিনিয়ো। ব্রাজিলিয়ান গ্রেটের মতো আপনিও কি দেশের ফুটবলে ছাপ রেখে যেতে চান?
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: রোনালদিনিয়োর মতো আমিও ব্রুভানার দূত, এটা যেহেতু স্বাস্থ্যকর, এটার প্রচার ও প্রসারে আমি দুই বছর কাজ করব, বিষয়টা আমার কাছে এতটুকুই। আর আমি রোনালদিনিয়ো হতে চাই না, আমি কাজেম হতে চাই।
এবার কিছু ছোট প্রশ্ন। বাংলাদেশের বাইরে প্রিয় দল?
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: স্পেন
প্রিয় খেলোয়াড়?
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: এ মুহূর্তে পেদ্রি
সবচেয়ে প্রিয়?
সৈয়দ কাজেম শাহ কিরমানি: লিওনেল মেসি
