Published : 04 Jun 2026, 11:10 PM
সুইডেনে ১৯৫৮ সালের ৮ থেকে ২৯ জুন বসে বিশ্বকাপের ষষ্ঠ আসর। দীর্ঘ অপেক্ষার ইতি টেনে প্রথম শিরোপা জয়ের আনন্দে ভাসে ব্রাজিল।
আট বছরে কত পরিবর্তন। ১৯৫০ আসরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না স্বাগতিক হওয়ার জন্য আগ্রহী কোনো দেশ। ১৯৫৮ আসর আয়োজনের জন্য চারটি দেশ জানায় আগ্রহ। ফিফা কংগ্রেসে ভোটাভুটিতে জিতে আয়োজনের সুযোগ পায় সুইডেন। নরডিক কোনো দেশে সেটাই এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ।
তবে, ফিফার ওই সিদ্ধান্তে বেশ ক্ষুব্ধ হয় লাতিন আমেরিকার দেশগুলো। ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ আসরের পুনরাবৃত্তি করে পরপর দুটি আসর ইউরোপে দেওয়া মানতে পারেনি তারা। এরপরেই ফিফা চার বছর পর ভিন্ন মহাদেশে আসর আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।
ষষ্ঠ আসরেও মূলে পর্বে অংশ নেয় ১৬ দেশ। এর মধ্যে সরাসরি খেলার সুযোগ পায় স্বাগতিক সুইডেন ও শিরোপাধারী পশ্চিম জার্মানি। বাছাই পর্ব পেরিয়ে আসে বাকি ১৪ দেশ।
বিশ্বকাপে অংশ নেয় যে সব দেশ-
ইউরোপ: সুইডেন, অস্ট্রিয়া, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস, যুগোস্লাভিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন, হাঙ্গেরি, পশ্চিম জার্মানি, ফ্রান্স ও চেকোস্লোভাকিয়া
দক্ষিণ আমেরিকা: ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে
উত্তর আমেরিকা: মেক্সিকো
এই আসর দিয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে অভিষেক ঘটে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ওয়েলসের
১৬ দল চারটি গ্রুপে খেলে। গ্রুপগুলো হলো-
গ্রুপ-১: পশ্চিম জার্মানি, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, চেকোস্লোভাকিয়া, আর্জেন্টিনা
গ্রুপ-২: ফ্রান্স, যুগোস্লাভিয়া, প্যারাগুয়ে, স্কটল্যান্ড
গ্রুপ-৩: সুইডেন, ওয়েলস, হাঙ্গেরি, মেক্সিকো
গ্রুপ-৪: ব্রাজিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া
গ্রুপ পর্ব
চারটি গ্রুপে চারটি করে দল অংশ নেয়। গতবারের মতো কোনো বাছাই, অবাছাই ছিল না এবার। গ্রুপের প্রতিটি দল রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতিতে খেলে পরস্পরের বিপক্ষে।
গ্রুপ-১ থেকে এক জয় ও দুই ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে কোয়ার্টার-ফাইনালে যায় পশ্চিম জার্মানি।
একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে অন্য একটি জায়গার জন্য লড়াইয়ে নামে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ও চেকোস্লোভাকিয়া। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো প্লে-অফে ২-১ গোলে জিতে পশ্চিম জার্মানির সঙ্গী হয় নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড। একমাত্র জয়ে ২ পয়েন্ট নিয়ে তলানিতে থেকে আসর শেষ করে আর্জেন্টিনা।
গ্রুপ-২ থেকে কোয়ার্টার-ফাইনালে যায় ফ্রান্স ও যুগোস্লাভিয়া। দুই দলেরই পয়েন্ট ছিল ৪ করে। ফ্রান্স জেতে দুই ম্যাচে, গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে তারাই হয় গ্রুপ সেরা। যুগোস্লাভিয়ার এক জয়ের পাশে ছিল দুটি ড্র।
একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয় প্যারাগুয়ে। একটি ড্রয়ে কেবল ১ পয়েন্ট পায় স্কটল্যান্ড।
এই গ্রুপের ৬ ম্যাচে হয় ৩১ গোল! ৯ জুন প্যারাগুয়ের বিপক্ষে আসরের প্রথম হ্যাটট্রিক করেন ফ্রান্সের জুস্ত ফঁতেন। প্রথম পর্বে তিনি করেন ৬ গোল।
গ্রুপ-৩ থেকে শেষ আটে যায় সুইডেন ও ওয়েলস। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় সুইডেন।
তিন ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট পায় ওয়েলস, একটি করে জয় ও ড্রয়ে হাঙ্গেরিরও পয়েন্ট হয় ৩। প্লে-অফ ম্যাচে ২-১ গোলে তাদের হারিয়ে টুর্নামেন্টে টিকে থাকে ওয়েলস। ১ পয়েন্ট নিয়ে বিদায় নেয় মেক্সিকো।
গ্রুপ-৪ থেকে কোয়ার্টার-ফাইনালে যায় ব্রাজিল ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৫ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় ব্রাজিল।
তিন ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট পায় ইংল্যান্ড, একটি করে জয় ও ড্রয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নেরও পয়েন্ট হয় ৩। প্লে অফ ম্যাচে ১-০ গোলে জিতে পরের ধাপে যায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১ পয়েন্ট পেয়ে তলানিতে থেকে আসর শেষ করে অস্ট্রিয়া।
কোয়ার্টার-ফাইনাল
শেষ আটে মুখোমুখি হয় ব্রাজিল-ওয়েলস, ফ্রান্স-নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড, সুইডেন-সোভিয়েত ইউনিয়ন, পশ্চিম জার্মানি-যুগোস্লাভিয়া।
ওয়েলসকে ১-০ গোলে হারিয়ে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। এই ম্যাচ দিয়েই নিজের আগমণীবার্তা দেন ফুটবলের মহানায়ক, তর্কসাপেক্ষে সর্বকালের সেরা ফুটবলার পেলে। সেদিন ১৭ বছরের তরুণই করেছিলেন ব্যবধান গড়ে দেওয়া গোলটি।
ফঁতেনের জোড়া গোলে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডকে ৪-০ গোলে হারায় ফ্রান্স।
সোভিয়েত ইউনিয়নকে ২-০ গোলে হারায় সুইডেন। যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ১-০ গোলে জেতে পশ্চিম জার্মানি।
সেমি-ফাইনাল
২৪ জুন পেলের হ্যাটট্রিকে সেমি-ফাইনালে ফ্রান্সকে ৫-২ গোলে হারায় ব্রাজিল। তিন আসরের মধ্য দ্বিতীয়বার দলটি যায় ফাইনালে।
শিরোপাধারী পশ্চিম জার্মানিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ফাইনালে ওঠে স্বাগতিক সুইডেন।
২৬ জুন তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ফঁতেনের হ্যাটট্রিকে পশ্চিম জার্মানিকে ৬-৩ গোলে হারায় ফ্রান্স। ওই আসরে ফঁতেনের ১৩ গোল এখনও এক আসরে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড হয়ে আছে।
ফাইনাল
২৯ জুন, ১৯৫৮। ৫০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে শুরু হয় সুইডেন ও ব্রাজিলের শিরোপার লড়াই।
ম্যাচের শুরুতেই স্বাগতিকদের এগিয়ে নেন নিলস এরিক লিদহোম। ভাভার জোড়া গোলে প্রথমার্ধে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। দ্বিতীয়ার্ধে জোড়া গোল করে ব্যবধান আরও বাড়ান পেলে। সেলেসাও অধিনায়ক মারিও জাগালো করেন আরেক গোল। স্বাগতিকদের হয়ে শেষ দিকে ব্যবধান কমান আগনা সিমন্সন।
এক নজরে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ
স্বাগতিক: সুইডেন
চ্যাম্পিয়ন: ব্রাজিল
রানার আপ: সুইডেন
মোট ম্যাচ: ৩৫
মোট গোল: ১২৬
গোল গড়: ৩.৬
সর্বোচ্চ গোল: জুস্ত ফঁতেন (ফ্রান্স)-১৩ গোল
সেরা খেলোয়াড়: দিদি (ব্রাজিল) [আন অফিসিয়াল]