মেয়েদের সাফে ‘বড়’ হয়ে উঠছে বাংলাদেশ

মেয়েরা মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছেন ২০১৬ আর ২০২২ সালের বাংলাদেশ দল এক নয়।

কাঠমান্ডু থেকে মোহাম্মদ জুবায়েরবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 16 Sept 2022, 02:45 PM
Updated : 16 Sept 2022, 02:45 PM

নেপালের দশরথ স্টেডিয়ামের আঙিনায় বাংলাদেশের মেয়েদের পায়ে ফুটে উঠছে সুন্দর ফুটবল। পাস-ক্রসগুলো হচ্ছে নিখুঁত-ছন্দময়, আক্রমণগুলো ধারাল। প্রতি ম্যাচেই গোল আর জয়ের উৎসবে মেতে উঠছেন সাবিনা-কৃষ্ণারা। চাওয়ার সঙ্গে পাওয়ার হিসাবগুলো এত সুনিপুণভাবে মিলছে কীভাবে? কোচ, খেলোয়াড় সবারই উত্তর, মেয়েদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ‘বড়’ হয়ে উঠছে বাংলাদেশ।

বোধহয় একটুও বাড়িয়ে কথাগুলো বলেনি তারা। এবার মালদ্বীপকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে পথচলা শুরু বাংলাদেশের। দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তানকে ৬-০ গোলে স্রেফ খড়কুটোর মতোই উড়িয়ে দেয় দল। সাফের পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতের বিপক্ষে কখনও জয়ের গল্প লেখা ছিল না, সেটাও গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ৩-০ গোলের জয়ে লেখে বাংলাদেশ।

সেমি-ফাইনালে তো আরও দুর্বার বাংলাদেশ। ভুটানের বিপক্ষে শুক্রবার ৮-০ গোলের জয়ে ফাইনালের মঞ্চে উঠেছে গোলাম রব্বানী ছোটনের দল। এর আগে একবারই শিরোপার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন সাবিনা-মারিয়ারা, ২০১৬ সালে শিলিগুঁড়ির আসরে। সেবার স্বাগতিক ভারতের কাছে ফাইনালে হেরে হয়েছিল স্বপ্নভঙ্গ।

এবার বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখছে বড় হয়ে ওঠার আত্মবিশ্বাস নিয়ে! শিলিগুঁড়ি থেকে কাঠমান্ডুতে আসা দলটি এক নয়, তা মারিয়া-মনিকাদের পায়ের জাদুতে, স্বপ্না-তহুরাদের আক্রমণের পরতে পরতে ফুটে উঠছে।

বর্তমান দলের ২৩ জনের মধ্যে সবচেয়ে বয়সী অধিনায়ক সাবিনা খাতুন, ২৮ বছর বয়স তার। ২১ বছর বয়সী তিন জন-সিরাত জাহান স্বপ্না, কৃষ্ণা রানী সরকার ও সানজিদা আক্তার। শিউলি আজিম ও মাসুরা পারভীন ২০ বছর বয়সী। ১৯ বছর বয়সী ৯ জন, ১৮ বছর বয়সী ৭ জন। দলে সবার ছোট স্বপ্না রানী; তার বয়স ১৭ বছর।

তবে কেবল বয়সে নয়, সাবিনা-মারিয়ারা নিজেদের মেলে ধরছেন অভিজ্ঞতার ডানায়।

বর্তমান দলের সাবিনা-কৃষ্ণা-স্বপ্নাদের অধিকাংশই ছিলেন শিলিগুঁড়িতে খেলা দলে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আলাপচারিতায় খেলোয়াড়, কোচ সবার কথায় ফুটে উঠল, ছয় বছর আগের ও এখনকার দলের মাঝে ফারাক অনেক।

চলতি সাফে এরই মধ্যে চার গোল করেছেন সিরাত জাহান স্বপ্না। এর মধ্যে ভুটান ম্যাচে তিনি জালের দেখা পান এক মিনিট ৩৪ সেকেন্ডে। ভারতকে গুঁড়িয়ে দেওয়া ম্যাচে করেন জোড়া গোল। ২১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড বাংলাদেশ দলের বদলে যাওয়াটা নিয়ে জানালেন নিজের ভাবনা।

“তফাৎ এটাই যে, ২০১৬ সালে যখন ফাইনাল খেলেছিলাম, তখন আমরা অনেক ছোট ছিলাম। এরপর আস্তে আস্তে বড় হয়েছি, বয়সভিত্তিক পর্যায়, জাতীয় দলের হয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছি। এই সময়ে সিনিয়র টিমে খেলার একটা অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এটাই পার্থক্য।”

মেয়েদের সাফে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো খেলছেন সানজিদা খাতুন। দক্ষিণ এশিয়ার মেয়েদের ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে ২১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডেরও শুরু হয়েছিল শিলিগুঁড়ির প্রতিযোগিতা থেকে। তার কণ্ঠেও স্বপ্নার কথার প্রতিধ্বনি।

“এটা আমার তৃতীয় সাফে খেলা। শিঁলিগুড়ির আসরে যখন খেলেছিলাম, তখন বয়স ছিল ১৫ কিংবা ১৬। এরপর ২০১৯ সালে বিরাটনগরে খেলেছি। এখন আমরা অনেক পরিণত হয়েছি। আমার খেলায়ও উন্নতি হয়েছে।”

তৃতীয় সাফ খেলছেন মারিয়া মান্দাও। অনূর্ধ্ব-১৫ দলে থাকার সময় শিলিগুঁড়িতে তিনি খেলেছিলেন জাতীয় দলের জার্সিতে। এখন তিনি অনূর্ধ্ব-১৯ বয়সভিত্তিক দলে খেলেন। কিন্তু মাঝের পথচলায় অনেক কিছু বদল গেছে।

“বয়সভিত্তিক ও সিনিয়র টিমে খেলতে খেলতে এখন যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, ২০১৬ সালে শিলিগুঁড়িতে খেলার সময় আমাদের সেটা ছিল না। বয়সেও আমরা অনেক ছোট ছিলাম। অনূর্ধ্ব-১৫, ১৬ বা ১৭ দলে বেশি খেলতাম। এখনও আমরা বয়সভিত্তিকেও অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলি, কিন্তু আগের চেয়ে আমরা সিনিয়র হয়েছি, অভিজ্ঞতাও বেশি সঞ্চয় করেছি।”

গত পাঁচ আসরে খেলার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ সাবিনা। এবার চার ম্যাচে দুই হ্যাটট্রিকসহ ৮ গোল করে গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে আছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। সাফের চতুর্থ আর ষষ্ঠ আসরের বাংলাদেশ দল তার চোখে একেবারেই অন্যরকম।  

“(এবার যেভাবে জয় পাচ্ছি) এটাই উন্নতি এবং সাফল্য বলতে পারেন। শিলিগুঁড়িতে যখন এই মেয়েরা খেলেছিল, তখন তো তারা অনেক ছোট ছিল, ১৩-১৪ বছর বয়সী ছিল। তারা বড় হয়েছে, দিনকে দিন উন্নতি করেছে। আমার মনে হয়, যেভাবে সবকিছু হচ্ছে, এভাবেই যদি হতে থাকে, তাহলে মেয়েরা দেশকে আরও ভালো কিছু দিতে পারবে।”

“মেয়েদের খেলাতেই সেটা পরিষ্কার হয়ে ‍উঠেছে, শিলিগুঁড়ি বা বিরাটনগরের তুলনায় আমাদের মেয়েরা এখন টেকনিক্যালি, ট্যাকটিক্যালি, ফিজিক্যালি কতটা ভালো। টুর্নামেন্ট শুরুর আগের সংবাদ সম্মেলনেও আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলাম, যতগুলো দল আছে, তাদের মধ্যে আমাদের মেয়েরা ফিজিক্যালি সবচেয়ে ফিট।”

শিলিগুঁড়ি আর কাঠমান্ডু সাফ-দুই আসরে বাংলাদেশ দলের ব্যবধান বোঝাতে চমকপ্রদ উত্তরই দিলেন সহকারী কোচ মাহবুবুর রহমান লিটু।

“শিলিগুঁড়িতে মেয়েরা পড়েছিল অথৈ সাগরে। এখন ওরা অনেক পরিণত। আমার মনে হয়, গত ছয় বছরে মেয়েরা যে পরিশ্রম করেছে, তার ফলই এখন আসছে।”

সাফের বয়সভিত্তিক আসরে হরহামেশাই সাফল্য পায় বাংলাদেশ। জাতীয় দল নিয়ে হওয়া প্রতিযোগিতায় আজও শিরোপা অধরা। এবার তা ঘুচবে কিনা, তা ১৯ সেপ্টেম্বরের ফাইনালই বলে দিবে। তবে খেলোয়াড়দের মতো আশাবাদী কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। মেয়েদের সাফে বাংলাদেশ বড় দল হয়ে উঠছে কিনা-এই প্রশ্নের উত্তরও বাংলাদেশ কোচ দিলেন দৃঢ় কণ্ঠে।

“অবশ্যই। এর আগে আমরা সাফে খেলেছি অনূর্ধ্ব-১৫, ১৬ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলের খেলোয়াড় নিয়ে। এই দলেও বয়সভিত্তিক দলের খেলোয়াড় আছে। কিন্তু এখন ওরা বড় হয়েছে, অভিজ্ঞ হয়েছে এবং সেটার ছাপ তাদের খেলায় দেখা যাচ্ছে।”

টানা চার জয়, প্রতিপক্ষের জালে ২০ গোল, কোনো গোল হজম না করা- ছোটনের দলের এই পরিসংখ্যানগুলো মেয়েদের সাফে বাংলাদেশের বড় হওয়ার ইঙ্গিতই তো দিচ্ছে!

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক