Published : 14 Sep 2026, 09:42 PM
টিভি পর্দায় আর কোর্টের বড় পর্দায় ভেসে উঠল ‘ম্যাচ পয়েন্ট।’ আলেক্সান্ডার স্ফেরেফের সার্ভিস রিটার্ন বাইরে মেরে দিলেন বেন শেলটন। উল্লাস আর করতালি ভেসে এলো গ্যালারি থেকে। আম্পায়ার যখন ঘোষণা করলেন, “গেম, সেট এবং ম্যাচ স্ফেরেফ...।” কিন্তু স্ফেরেফের কোনো ভাবান্তর নেই। তিনি পরের সার্ভ করার জন্য যাচ্ছিলেন বেজলাইনে। ধারাভাষ্যকার হাসতে হাসতে বললেন, “স্ফেরেফ এমনকি জানেনও না যে ম্যাচ শেষ...!”
অবিশ্বাস্য দৃশ্যই বটে। খেলার ভেতরে স্ফেরেফ এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, বুঝতেই পারেননি চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছেন! দর্শকদের হুল্লোড়ে এক পর্যায়ে সম্বিত ফিরল তার। বড় পর্দায় মুখে খেলে গেল চওড়া হাসি। এবার দুহাত উঁচিয়ে ছুটে গেলেন। ধারাভাষ্যকার আবার বললেন, “তিনি সত্যিই জানতেন না, এতটাই মনোযোগী ছিলেন...।”
ছয় বছর আগের তেতো অভিজ্ঞতার কারণেই হয়তো এবার এতটা নিবদ্ধ ছিলেন স্ফেরেফ। এই কোর্টেই সেবার ফাইনালে দুই সেটে এগিয়ে গিয়েও হেরে গিয়েছিলেন। সেই দুঃস্বপ্নের অধ্যায়কে কবর দিয়ে এবার স্বপ্নের আলোয় অবগাহন করলেন জার্মান তারকা। ইউএস ওপেনের ফাইনালে তিনি ৬-৩. ৭-৬ (২), ৫-৭, ৬-২ গেমে হারালেন যুক্তরাষ্ট্রের বেন শেল্টনকে।
পেশাদার ক্যারিয়ারের প্রথম এক যুগে কোনো গ্র্যান্ড স্ল্যাম ছিল না স্ফেরেফের। ২০২০ ইউএস ওপেনের ফাইনালে হেরেছিলেন, গত বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনালেও। এবার তিন মাসের মধ্যে দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতে নিলেন ২৯ বছর বয়সী তারকা। গত জুনে জিতেছিলেন তিনি ফরাসি ওপেন।
ইউএস ওপেন জিতলেন তিনি ১১ বারের প্রচেষ্টায়। পুরস্কার হিসেবে পাচ্ছেন গ্র্যান্ড স্ল্যাম ইতিহাসের রেকর্ড পারিশ্রমিক ৫৫ লাখ মার্কিন। নারী এককে জয়ী এলেনা রিবাকিনাও পেয়েছেন একই পরিমাণ অর্থ।
ম্যাচের পর স্ফেরেফ বললেন, ক্যারিয়ারজুড়ে লেগে থেকে হাল না ছাড়ার ফল পাচ্ছেন তিনি এখন।
“আমি মনে করি, ঈশ্বর দেখেছেন আমরা কতটা কঠোর পরিশ্রম করেছি, কতটা কষ্ট সহ্য করেছি, কতটা যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি এবং আমি মনে করি ২০২৬ সাল হলো এর আগের সমস্ত বছরের ফলাফল।”
নিজের স্বপ্ন পূরণ করে তিনি ভেঙে দিয়েছেন স্থানীয় দর্শকদের হৃদয়। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো খেলোয়াড়ের গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের ২৩ বছরের অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হলো আরও। সেই দর্শকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানালেন স্ফেরেফ।
“আমি জানি যে আজ ৯৯.৯% মানুষই চেয়েছিল বেন (শেল্টন) জিতুক, এজন্য আমি খুবই দুঃখিত। যদিও জানি যে দর্শকেরা আমার বিপক্ষে ছিল, তারা সবসময়ই অবিশ্বাস্যরকেমর ন্যায্য ছিল এবং খেলোয়াড় হিসেবে আমরা এর প্রশংসা করি।”
যদিও শেল্টনের এটি প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল, তবু লড়াই জমজমাট হবে বলেই ধরে নিয়েছিলেন অনেকে। দুজনই অনেকটা একই ঘরানার খেলোয়াড়। তবে ফাইনালে শুরু থেকেই স্ফেরেফের দাপটে বেশ অসহায় হয়ে পড়েন শেল্টন। ২৩ বছর বয়সী খেলোয়াড়ের অনভিজ্ঞতা প্রকাশ্য হতে থাকে।
ম্যাচের সেরা পয়েন্টগুলোর একটি অবশ্য জিতে নেন শেল্টনই। ষষ্ঠ গেমে একটি ড্রপ শট ধরার মরিয়া চেষ্টায় নেটের কাছে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে তিনি জয়ী হন। ম্যাচের মোড় ঘোরানোর চেষ্টায় সার্ভ-অ্যান্ড-ভলি কৌশল ব্যবহার করেন তিনি। কিন্তু এই কৌশল কাজে লাগেনি, উল্টো ডাবল ফল্ট করে তিনি সেট তুলে দেন স্ফেরেফকে।
দ্বিতীয় সেটে স্থানীয় দর্শকেরা স্ফেরেফকে চাপে ফেলার প্রবল চেষ্টা করেন। নবম গেমে তিনি একটি ডাবল ফল্ট করার পর দর্শকদের উল্লাস ছিল তুমুল। কিন্তু দর্শকদের ‘লেট’স গো বেন, কাম-অন বেন’ এসব স্লোগানের মধ্যেও জার্মান তারকা ভড়কে না নিয়ে টাইব্রেকারে ৫-০ গেমে এগিয়ে যান।
তৃতীয় সেটে এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল স্ফেরেফ সহজেই জিতে যাবে। ষষ্ঠ গেমে দুর্দান্ত ব্যাকহ্যান্ড উইনার মেরে তিনি একটি ব্রেক পয়েন্ট বাঁচান। দুই গেম পর শেল্টনের হতাশা চরমে ওঠে যখন তিনি পিছলে কোর্টে আছড়ে পড়েন। বিরক্তিতে গালি বেরিয়ে যায় তার মুখ থেকে। তবে ঘুরে দাঁড়িয়ে তিনি লড়াই চালিয়ে যান এবং বেজলাইন থেকে একের পর এক শক্তিশালী গ্রাউন্ডস্ট্রোক মেরে স্ফেরেফকে কাবু করে সার্ভ ব্রেক করেন ও খেলা চতুর্থ সেটে নিয়ে যান।
তবে এতে কেবল তার অবশ্যম্ভাবী পরাজয়ই খানিকটা বিলম্বিত হয়। চতুর্থ সেটে ২৫ শটের একটি র্যালির পর শুরুতেই একটি ব্রেক নিশ্চিত করেন স্ফেরেফ। সেই সুবিধা আর হাতছাড়া করেননি তিনি এবং সহজেই শেষ করেন বাকি কাজ।
আর্থার অ্যাশের ৫৪ বছর পর নিউ ইয়র্ক ফাইনালে খেলা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান পুরুষ খেলোয়াড় ছিলেন শেল্টন। তার শেষটা হলো হতাশায়। তার বান্ধবী ও ফুটবল তারকা ট্রিনিটি রডম্যান প্রায় ২০০ মাইল ছুটে এসে প্লেয়ার্স বক্সে পৌঁছান। দুজনের খেলার সময় প্রায় মিলেই গিয়েছিল। কিন্তু সঙ্গীর জয় তার দেখা হলো না।
ম্যাচের পর শেল্টন অবশ্য বললেন, এই মঞ্চে পা রাখতে পারাটাও তার জন্য বড় প্রাপ্তি।
“আমার সাফল্যগুলো যেমন উপহার, ব্যর্থতাগুলোও তেমনি উপহার এবং আপনাদের সামনে এখানে খেলতে পারাটাও বড় উপহার।”
স্ফেরেফের জন্য এই সাফল্য খুবই জরুরি ছিল। গ্র্যান্ড স্ল্যামে একের পর এক ব্যর্থতা তো ছিলই, মাঠের বাইরের বিতর্কেও জেরবার ছিলেন তিনি। পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে, যদিও তিনি সব উড়িয়ে দিয়েছেন। কোর্টেও তিনি পেরে উঠছিলেন না ইয়ানিক সিনার ও কার্লোস আলকারাসের দাপটের সঙ্গে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ওই দুজন মিলেই জিতে নেন সব গ্র্যান্ড স্ল্যাম। এবছরও প্রথম দুটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতেন তারাই।
বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতে নেন আলকারাস। তবে দীর্ঘ চোট কাটিয়ে ইউএস ওপেনে ফিরে তিনি কোয়ার্টার-ফাইনালে হেরে যান শেল্টনের কাছে। এই বছরের উইম্বলডনজয়ী সিনার চোটের কারণে সরে দাঁড়ান ইউএস ওপেন থেকে। স্ফেরেফের পথ তাতে সহজ হয় নিশ্চিতভাবেই।
শিরোপা জয়ের পর স্ফেরেফকে জিজ্ঞেস করা হলো, নিজেকে এখন এক নম্বর ভাবেন কি না। তিনি তুলে ধরলেন বাস্তবতার ছবিই।
“সিনার চোটের কারণে বাইরে থাকায় এবং আলকারাস চার মাস পর চোট থেকে ফিরে আসায়, এই মুহূর্তে হয়তো ‘হ্যাঁ (আমিই এক নম্বর)।’ তবে যদি তারা দুজনেই সুস্থ থাকত এবং দুজনেই তাদের সেরা ফর্মে থাকত, তাহলে হয়তো আমি এক নম্বর নই।
যদি সবাই সুস্থ থাকে, আমার মনে হয় ইয়ানিক এখনও এগিয়ে থাকবে। ব্যাপারটা এরকমই সাধারণ।”