২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

ইনফান্তিনোকে ‘অপমান ও দুর্বল করার প্রচেষ্টা’ নিয়ে ফিফার হুঁশিয়ারি

ফিফা সভাপতির দায়িত্বে প্রবল চাপের মুখে থাকা জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সমর্থনে আবার কঠোর বিবৃতি দিয়েছে সংস্থাটি।

ইনফান্তিনোকে ‘অপমান ও দুর্বল করার প্রচেষ্টা’ নিয়ে ফিফার হুঁশিয়ারি
গত শুক্রবার কলম্বিয়াতে একটি অনুষ্ঠানে ফিফা সভাপতি। ছবি: রয়টার্স।

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Aug 2026, 10:26 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:24 PM

জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে দুর্বল ও খাটোর করার জন্য একটি ‘সমন্বিত ও চলমান প্রচেষ্টা’ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছে ফিফা। সংস্থাটি বলেছে, সভাপতির নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার যেকোনো প্রচেষ্টা অবশ্যই নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধি এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণ করেই করতে হবে।

এই বিবৃতিটি এমন এক সময়ে এসেছে, যখন উয়েফা শুক্রবার নিশ্চিত করেছে যে, ইনফান্তিনো যখন ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তখন তার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ ওঠা এক নারী কর্মীকে ‘বিদায়কালীন অর্থ’ প্রদান করা হয়েছে।

ডেইলি টেলিগ্রাফ জানিায়, ওই নারী ছয় অঙ্কের অর্থ পেয়েছেন এবং উয়েফা একটি এমবিএ কোর্সের ফি প্রদানের পাশাপাশি অর্থ প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং যোগ করেছে যে, এটি তৎকালীন নিয়মকানুনের সঙ্গে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ’ ছিল।

ফিফার একজন মুখপাত্র টেলিগ্রাফকে বলেছেন যে, ইনফান্তিনো এই অভিযোগগুলো ‘জোরালভাবে অস্বীকার করেছেন এবং এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা।’

নতুন এই অভিযোগের আগে পুরোনো সঙ্কট তো ছিলই। বিশ্বকাপ এবং অন্যান্য টুর্নামেন্টের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বিক্রি করে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের ইনফান্তিনোর প্রস্তাবটি ভেস্তে যাওয়ার পর তার নেতৃত্ব নিয়ে তিক্ত অচলাবস্থা এখনও চলছে।

এই পরিকল্পনাটি উয়েফা, বিভিন্ন জাতীয় সংস্থা এবং ফিফার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে সমালোচনার জন্ম দেয় তারা ইনফান্তিনোকো পদত্যাগের আহ্বান জানায় এবং এই সপ্তাহে মরক্কোতে একটি সংকটকালীন বৈঠকের সূত্রপাত করে, যেখানে ফিফার নেতৃত্ব তাদের সভাপতির প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।

তবে তাতেও ইনফান্তিনোর সংকট কাটেনি। ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) নামক একটি বাণিজ্যিক সহায়ক সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বকাপের মুনাফা বিক্রি করার পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার পর তিনটি মহাদেশীয় সংস্থার প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছেন ফিফা প্রধান। 

উয়েফা, যেখানে ১৬ বছর কাজ করেছেন ইনফান্তিনো এবং ফিফা সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে ২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তারাই সবার আগে প্রতিবাদ জানায় এবং এখনও ফিফা সভাপতির পদত্যাগের দাবিতে তারা অটল আছে। 

এই সপ্তাহের শুরুতে উয়েফা জানায়, ব্যর্থ পরিকল্পনার জন্য ক্ষমা চাওয়া ইনফান্তিনো সত্ত্বেও এর ৫৫টি সদস্য রাষ্ট্র বিশ্বকাপসহ ফিফার সব প্রতিযোগিতা বর্জন করতে পারে।

ক্রমশ জটিল হয়ে পড়া পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে শনিবার আরেক দফা বিবৃতিতে সতর্কবার্তা দেয় ফিফা। 

“এটা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, ফিফা এবং এর সভাপতিকে দুর্বল করার জন্য কিছু লোকের একটি সুসংহত ও চলমান প্রচেষ্টা রয়েছে। যাদের ফিফার সদস্য সংগঠনগুলোর সমর্থন নেই, ফিফার প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যা অর্জন করা যায় না, তা অভিযোগ, ইঙ্গিত বা ভুল তথ্যের মাধ্যমে অর্জন করার চেষ্টা তাদের করা উচিত নয়।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে ফিফা এবং এর সভাপতিকে নিয়ে ভিত্তিহীন দাবি এবং সুস্পষ্টভাবে মিথ্যা অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। জল্পনা ও ইঙ্গিতকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয় এবং কোনো অভিযোগের পুনরাবৃত্তি তাকে সত্য প্রমাণ করে না।”

তদন্ত নিয়ে ফিফার আপত্তি নেই বলেই বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু আবারও অভিযোগ করা হয়েছে, ফিফা সভাপতিকে পরিকল্পিতভাবে হেয় করা হচ্ছে। 

“পরিবর্তন অনিবার্যভাবে প্রতিষ্ঠিত স্বার্থকে চ্যালেঞ্জ করে, কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা ফিফা সভাপতির গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট বা যে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, তাকে দুর্বল করার প্রচেষ্টাকে ন্যায্যতা দিতে পারে না।

ফিফা যথাযথ তদন্তকে স্বাগত জানায়। কিন্তু তদন্ত মানে এই নয় যে, তথ্য বিকৃত করা, ভিত্তিহীন অভিযোগকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো বা অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করা যাবে। যেখানে প্রতিবেদন ভুল বা বিভ্রান্তিকর হবে, ফিফা সরাসরি এবং জোরালভাবে তার প্রতিবাদ জানাবে।’

ইনফান্তিনোকে দুর্বল করার চেষ্টায় জড়িতদের পরিচয় ফিফা প্রকাশ করেনি, বা কোন প্রতিবেদন বা অভিযোগের কথা উল্লেখ করছে, তাও নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। তবে সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তারা সভাপতি নির্বাচন সংক্রান্ত এমন কোনো প্রক্রিয়াকে সমর্থন, সুবিধা প্রদান বা সহ্য করবে না, যা তাদের বিধি, গণতান্ত্রিক পদ্ধতি এবং শাসন কাঠামোর সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

তাদের মতে, “ফিফার সভাপতি ফিফার সদস্য সংগঠনগুলোর দ্বারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং তাদের ম্যান্ডেট নিয়েই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।”

ফিফার সমর্থনে বিভাজন

গত বুধবার মরক্কোতে ফিফার শীর্ষ নেতৃত্বের এক বৈঠকের পর, ফিফা স্বীকার করেছে যে প্রস্তাবটি নিয়ে তাদের ‘ভুল হয়েছে’, ২১১টি সদস্য রাষ্ট্রের কাছে তারা ক্ষমাও চেয়েছে, তবে ইনফান্তিনোর সভাপতিত্বের প্রতি ‘পূর্ণ সমর্থন’ পুনর্ব্যক্ত করেছে তারা। 

তবে ইনফান্তিনো এখনও প্রবল বিপদেই আছেন। তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের শঙ্কা এখনও কাটেনি। এবার কোনোভাবে টিকে গেলেও আগামী মার্চ মাসে মরক্কোতে অনুষ্ঠেয় ফিফা কংগ্রেসে ইনফান্তিনোর চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার ওপর কালো ছায়া পড়েছে। যদিও তাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনো স্পষ্ট প্রার্থী এখনও আবির্ভূত হননি।

উয়েফা এখনও তাদের দাবিতে অটল ও সরব আছে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বারবার বলেছে যে, তারা ইনফান্তিনোর ওপর আর আস্থা রাখে না। নরওয়েজিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিসে ক্লাভেনেস শুক্রবার তাকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ফিফা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা তার আর নেই।

তবে উয়েফা তাদের বর্জনের হুমকি বজায় রাখলেও ইউরোপের বাইরে ইনফান্তিনো উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছেন।

দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল, যারা ২০৩০ সালের ফাইনাল ৬৪ দলে সম্প্রসারণের জন্য ফিফাকে চাপ দিচ্ছে, বৃহস্পতিবার তারা জানিয়েছে যে, ইনফান্তিনোকে ক্ষমতাচ্যুত করার কোনো পদক্ষেপকে সমর্থন করা হবে না। আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের (সিএএফ) কার্যনির্বাহী কমিটিও ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের ‘সর্বসম্মত সমর্থন’ ব্যক্ত করেছে।

তবে ইনফান্তিনোর তীব্র সমালোচনা করে বিবৃতি দিয়েছে উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনক্যাকাফ। বেসরকারি বিনিয়োগকারী পরিকল্পনা সংক্রান্ত বিষয়ে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ‘একতরফা ও গুরুতর দুর্বল শাসনের কাজ’-এর অভিযোগ এনে তার নেতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে কনকাকাফ সদস্য মেক্সিকো উল্টো পথ বেছে নিয়ে ফিফা প্রধানের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করেছে এবং ‘২১১টি সদস্য সংগঠনের স্বার্থে সম্মিলিতভাবে ফুটবলের উন্নয়ন অব্যাহত রাখার’ তার আহ্বানকে সমর্থন জানিয়েছে। মেক্সিকান ফেডারেশন বলেছে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে আহূত কোনো প্রক্রিয়াকে তারা ‘স্বীকৃতি দেবে না বা অনুমোদনও করবে না।’