Published : 26 Jun 2026, 12:40 AM
ঢাকা নগরীর যানজট নিরসনে দূরপাল্লার বাসের চারটি টার্মিনাল বাইরে সরিয়ে নেওয়ার যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, তা কী এবার সফল হবে? বাস টার্মিনাল সরিয়ে নিলেই কী ঘনবসতির এই শহরের যানজট দূর হবে?
এর আগে ২০১০ সালে এ ধরনের উদ্যোগের কথা শোনা যায়, আর ২০২১ সালে স্থান নির্বাচনসহ কিছু পরিকল্পনার কথাও সামনে আসে। কিন্তু বাস টার্মিনাল স্থানান্তর হয়নি।
ফলে এবারের উদ্যোগ নিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউক ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন আশাবাদের কথা বললেও মানুষের মধ্যে সংশয় আছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের কারো কারো মতে, সরকার যদি এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেও, তাহলে নগরীর সঙ্গে সংযোগের পরিকল্পিত ব্যবস্থা ছাড়া তা কাজে আসবে না, বরং যানজট আরো বাড়তে পারে।

গেল বছরের জুনে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সড়ক পরিবহন বিষয়ক বিশেষ সহকারী শেখ মইনুদ্দীন এক সেমিনারে বলেছিলেন, ঢাকার যানজটের কারণে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে এবং নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা।
এক সময়ে ঢাকার একমাত্র আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ছিল গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়ায়। ১৯৮৪ সালে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদে নতুন টার্মিনাল গড়ে তোলা হয়।
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক বিভাগের জনসংখ্যা বিভাগের বৈশ্বিক প্রকাশনা ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রস্পেক্টস ২০২৫’ এর তথ্য অনুযায়ী, দুই নগর সংস্থায় বিভক্ত ঢাকা নগরীর জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ।
অথচ ১৯৮৪ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ৪৩ লাখ ৪৫ হাজার।
বিআরটিএ’র ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত সারা দেশে সংস্থার নিবন্ধিত মোটরযানের সংখ্যা ৬৭ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৭। এর মধ্যে কেবল ঢাকাতেই রয়েছে ২৩ লাখ ৯০ হাজার ৪১৮টি।
এই বিপুল যানবাহন আর জনসংখ্যার চাপে চার দশক আগের বিকেন্দ্রীকৃত টার্মিনালগুলো এখন শহরে যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগে টার্মিনালগুলো নগরপ্রান্তে ছিল, কিন্তু শহর বাড়তে থাকায় টার্মিনালগুলো এখন নগরীর ভেতরে পড়ে গেছে।

আগে কেন স্থানান্তর সম্ভব হয়নি?
আন্তঃজেলা টার্মিনালের কারণে যানজট বাড়ছে, এমন উপলব্ধি থেকে ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো টার্মিনালগুলো শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।
তখনকার পরিকল্পনা অনুযায়ী সায়েদাবাদ টার্মিনাল কাঁচপুরে, গাবতলী টার্মিনাল সাভারে, মহাখালী টার্মিনাল উত্তরা এলাকায় এবং ফুলবাড়িয়া টার্মিনাল কেরাণীগঞ্জে স্থানান্তরের কথা ছিল।
সে সময় ঢাকা সিটি করপোরেশন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-রাজউকের কাছে জমিও চেয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনাটি আর এগোয়নি।
কেন এগোয়নি? এ বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেও উত্তর মেলেনি।
রাজউকের পরিচালক (প্রশাসন) শীলাব্রত কর্মকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই বিষয়ে আমার জানা নেই।”
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলামও বললেন, “২০১০ সালে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ হয়েছিল কি না, আমার ঠিক জানা নেই।”
পরবর্তীতে ২০২১ সালেও ঢাকা শহরের বাইরে পাঁচটি নতুন আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএ-এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ঢাকার উপকণ্ঠে সাভারের গ্রাম ভাটুলিয়া, হেমায়েতপুর, কেরাণীগঞ্জের বাঘৈর, কাঁচপুর দক্ষিণ এবং রূপগঞ্জের ভুলতায় ৩৮ হাজার ২৮টি বাস পরিচালনার সক্ষমতাসম্পন্ন টার্মিনাল নির্মাণে ১৪৬২ দশমিক ৮৬ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়।
এ জন্য ১৫৭ দশমিক ২৩ একর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন ছিল।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, “বিষয়টি জমি অধিগ্রহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এটি ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্প ছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণে কিছু জটিলতা এবং অর্থের বিষয় ছিল। সে কারণে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এ বিষয়ে সেভাবে সক্রিয় হয়নি।”

সরাতে কতদিন লাগবে?
সচিবালয়ে গত ১৫ জুন এক উচ্চ পর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকার প্রধান চারটি বাস টার্মিনাল দ্রুত রাজধানীর বাইরে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন।
সে দিন সভার সিদ্ধান্ত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু বলেছিলেন, “ঢাকার যানজট নিরসনে চারটি আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে অতিদ্রুত সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ঢাকায় ছড়িয়ে থাকা বাস কাউন্টারগুলোও দ্রুত সরিয়ে নিতে তাগাদা দিয়েছেন তিনি।”
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফুলবাড়িয়া-গুলিস্তান টার্মিনাল কেরাণীগঞ্জে, গাবতলী টার্মিনাল হেমায়েতপুরে, সায়েদাবাদ টার্মিনাল কাঁচপুরে এবং মহাখালী টার্মিনাল প্রথমে অস্থায়ীভাবে পূর্বাঞ্চলে ও পরে স্থায়ীভাবে টঙ্গীর কাছাকাছি স্থানান্তরিত হবে।
এই উদ্যোগ নিয়ে আশাবাদী রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন, যাতে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়। কারণ ঢাকার চারপাশে যেভাবে নগরায়ন হচ্ছে, এই মুহূর্তে জমি অধিগ্রহণ করা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে এসব জমি সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে যাবে।”
গেল ১৮ জুন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বাস টার্মিনাল সরানো নিয়ে বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) আয়োজিত ‘বিএসআরএফ সংলাপে’ কথা বলেছেন।
মন্ত্রী বলেছেন, টার্মিনালগুলো দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে সরিয়ে নেওয়া হবে। কাঁচপুরে যে ডিপো করা হচ্ছে, সেটা টার্মিনাল হয়ে যাবে। সায়েদাবাদ টার্মিনাল চলে যাবে সেখানে।
গাবতলী টার্মিনাল হেমায়েতপুরে সরিয়ে নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মহাখালীর টার্মিনাল চলে যাবে উত্তরা, আব্দুল্লাহপুরের কাছাকাছি এলাকায়, সেখানে ইতোমধ্যে ৫০ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করতে চলেছেন তারা। তার আগে ৩০০ ফুট নামে পরিচিতি পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে এলাকায় ডিপো হবে।
এভাবে টার্মিনাল স্থানান্তরের কথা তুলে ধরে শেখ রবিউল বলেন, এখনই হচ্ছে না। এখন ডিপো হিসেবে ব্যবহার হবে। বাসগুলো সেখানে থাকবে, ছাড়ার আগে টার্মিনালে এসে যাত্রী নিয়ে চলে যাবে।
সরকারের এই উদ্যোগে কী বলছেন বাস মালিকরা? ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কোষাধ্যক্ষ এ এস এম আহম্মেদ খোকন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেসব জায়গা টার্মিনালের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে দেওয়া হলে আমাদের ওখানে যেতে কোনো আপত্তি নেই।
“ঢাকা শহর এখন অনেক বেশি ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে গেছে। শহরের ভেতর থেকে বাস বের করা কিংবা পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
কিন্তু ঢাকার নগরীর ভেতর থেকে টার্মিনাল সরানো নিয়ে কারো কারো মধ্যে সংশয় রয়েছে। গাবতলীর বাসিন্দা শরিফ আহমেদ আক্ষেপ করে বলেন, “যানজট কমবে শুনতে শুনতে আমার ছেলে প্রাইমারি স্কুল পেরিয়ে কলেজে উঠে গেছে। ঢাকার মানুষ এতদিনে শিখে গেছে, ঘোষণা আর বাস্তবায়নের মধ্যে কয়েকটা নির্বাচন পার হয়ে যেতে পারে।”
বেসরকারি চাকরিজীবী রোমান হোসেন বলেন, “বাস ঢোকা ও বের হওয়া, রাস্তার উপর পার্কিং, যাত্রী ওঠানামা মিলিয়ে মহাখালী প্রায় সারাদিনই আটকে থাকে। টার্মিনাল সরলে এলাকাটা কিছুটা স্বস্তি পাবে।
“সামনে কতোটুকু বাস্তবায়ন হবে জানি না। কিন্তু দেশে এরকম বহু উদ্যোগই কাগজে বন্দি হয়ে পড়ে আছে।”

জমি অধিগ্রহণের কী হবে?
ডিটিসিএ এর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক (ম্যাস ট্রানজিট) আবদুল লতিফ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “হেমায়েতপুর, কেরানীগঞ্জ ও কাঁচপুরের প্রস্তাবিত স্থানগুলো আগের মতোই বিবেচনায় রয়েছে। তবে ভুলতা ও ভাটুলিয়া এখনও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে।”
যদিও টার্মিনাল স্থানান্তরের নতুন নির্দেশনার পর দুই সিটি করপোরেশন ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
সায়েদাবাদ টার্মিনালটি কাঁচপুরে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কাঁচপুরে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের একটি জায়গা আমাদের অনেক আগেই ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছিল। ওই জায়গায় মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে। প্রায় ১২ একরের মতো জায়গা। বাউন্ডারির কাজও শুরু হয়েছে।
“মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা হচ্ছে, যত দ্রুত সম্ভব অন্তত অস্থায়ীভাবে হলেও টার্মিনালটি চালু করতে হবে।”
তিনি বলেন, “টার্মিনালের জন্য যে পূর্ণাঙ্গ নকশা ও অবকাঠামো পরিকল্পনা আছে, সেটা অক্ষুণ্ণ রেখেই আপাতত কিছু প্রয়োজনীয় স্থাপনা তৈরি করা হবে। যেমন টয়লেট, অস্থায়ী শেড, লাইটিংসহ মৌলিক সুবিধাগুলো দেওয়া হবে। উদ্দেশ্য হল, আগে টার্মিনালটি চালু করা, পরে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো নির্মাণ করা।”
জহিরুল ইসলাম বলেন, “সম্পূর্ণ কার্যকর টার্মিনাল বলতে যেটা বোঝায়, তার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব-ডিপিপি এখনও তৈরি হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে আরও সময় লাগবে।”
কেরাণীগঞ্জের বাঘৈর টার্মিনাল করার বিষয়ে ডিএসসিসির এই কর্মকর্তা বলেন, “বাঘৈরের জমি ‘প্রাইভেট ল্যান্ড’। সেখানে বর্তমানে কী ধরনের অবকাঠামো আছে, সেটাও আমরা সরেজমিনে দেখে নেব। প্রাথমিকভাবে এলাকা পরিদর্শন করে ভিডিও ধারণ করা হবে, যাতে পরবর্তীতে ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত কোনো জটিলতা তৈরি না হয়।”
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন-ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, “গাবতলী টার্মিনালকে হেমায়েতপুরে নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতে সেখানে যে জায়গাটি নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি চিহ্নিত করে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে।”

যানজট সমস্যা মিটবে?
রাজধানীর যানজট কমাতে এপ্রিলে বাস টার্মিনালের আশপাশ ও শহরের ভেতরের বিভিন্ন এলাকায় বসানো অবৈধ বাস কাউন্টার উচ্ছেদ শুরু করে ঢাকার দুই নগর সংস্থা। কিন্তু পরে বাস মালিকদের তিন মাসের সময় দিয়ে অভিযান স্থগিত করা হয়।
এ সময়ের মধ্যে বাস কাউন্টারগুলো বাস টার্মিনাল সংস্কার ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কথা বলা হয় সরকারের তরফে।
ডিটিসিএ-এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, আন্তঃজেলা ও উপশহরগামী বাস ঢাকার প্রধান সড়কে প্রবেশকারী মোট যানবাহনের প্রায় ২৪ শতাংশ এবং মোট বাসের ৭৪ শতাংশ।
টার্মিনাল সরিয়ে নিলে মূল সড়কে বাসের চাপ কমবে বলে ধারণা করা হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খানের প্রশ্ন, ঢাকার যানজটের কারণ কি শুধু আন্তঃজেলা বাস? নাকি এর পেছনে ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা আছে? মহাখালীতে যে যানজট হয়, সেটা কি টার্মিনালের কারণে, নাকি বাসের অবস্থান, যাত্রী তোলা ও নামানো এবং পরিচালনাগত সমস্যার কারণে?
এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখতে বলেছেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “ধরুন, একটি বাসে ৪০ জন যাত্রী আসে। তাদের যদি শহরের বাইরে নামিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে বাসের পাশাপাশি অনেকেই ছোট ছোট বাহনে করেও ঢাকায় প্রবেশ করবে। এতে যানবাহনের সংখ্যা কমবে নাকি বাড়বে, সেটাও বিবেচনা করা দরকার।”
তার মতে, বিদ্যমান টার্মিনালগুলো তুলে দেওয়ার চেয়ে ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন বেশি জরুরি।
এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “বর্তমান ব্যবস্থাপনাকে উন্নত করা গেলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। দীর্ঘদিন ধরে মাল্টিস্টোরি পার্কিংয়ের কথাও বলা হচ্ছে। সেগুলো বাস্তবায়ন করলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।”
তিনি বলেন, “নতুন টার্মিনাল দরকার হলে নতুন টার্মিনাল করা যেতে পারে। কিন্তু বিদ্যমান টার্মিনালগুলো পুরোপুরি তুলে দেওয়ার জন্য নয়। এগুলোকে কীভাবে আরও ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়, সেটাও ভাবতে হবে।”

পরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান অবশ্য সরকারের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা টার্মিনালগুলোকে আসলে টার্মিনাল হিসেবে কার্যকর করতে পারিনি। বাসগুলো দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করায় এগুলো অনেক ক্ষেত্রে গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপে পরিণত হয়েছে। আবার পরিবহন শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন না হওয়ায় নানা সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যাও তৈরি হয়েছে।
“এ কারণেই যাত্রীরা টার্মিনাল থেকে বাসে উঠতে আগ্রহী হন না। ফলে বাসগুলো রাস্তায় যাত্রী তুলতে তুলতে গন্তব্যে যায়।”
তবে পূর্ণাঙ্গ টার্মিনালের বদলে ডিপো করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “গাজীপুর, টঙ্গী, হেমায়েতপুর বা কেরাণীগঞ্জের মতো এলাকায় টার্মিনাল করার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টিকে আমি ইতিবাচক হিসেবেই দেখি।
“তবে আমার মতে, এগুলোকে পূর্ণাঙ্গ টার্মিনাল না করে ডিপো হিসেবে গড়ে তোলা উচিত।”
হাদিউজ্জামানের মতে, “পূর্ণাঙ্গ টার্মিনাল করতে হলে বড় বিনিয়োগ ও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। কিন্তু ডিপো করলে কম সময়েই কাজ শেষ করা সম্ভব। সেখানে চালক ও শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগার, ক্যান্টিন এবং ওয়ার্কশপের সুবিধা রাখা যাবে। এতে খুব বেশি বিনিয়োগও লাগবে না।”
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “এখন টার্মিনালের ভেতর যেটা হচ্ছে, সেটাই হল ডিপোর কাজ। পুরো টার্মিনাল সরিয়ে নিলেও সেখানে আবার একই অবস্থা তৈরি হবে। তখন যে উদ্দেশ্যে টার্মিনাল সরানো হবে, সেই লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না।”
সমাধান হিসেবে তিনি বলেন, “মহাখালী, সায়েদাবাদ, গাবতলী বা ফুলবাড়িয়ার মতো টার্মিনালগুলোকে টার্মিনাল হিসেবেই কার্যকর করতে হবে। টার্মিনালের ভেতরে যে ডিপো হয়ে গেছে, সেটাকে শহরতলীতে সরিয়ে নিতে পারলে আমার ধারণা প্রায় সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।”

ঢাকায় প্রবেশ কী নির্বিঘ্ন হবে?
টার্মিনাল শহরের বাইরে গেলে যাত্রীরা কীভাবে ঢাকায় আসবেন? এ প্রশ্ন সামনে আসছে।
এ বিষয়ে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হল সেই মানুষগুলো, যারা রংপুর, রাজশাহী অঞ্চল বা দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় আসে। তাদের মতামত জানতে হবে। তারা কী চায়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি বলেন, “অনেকেই বলছেন, টার্মিনাল সরিয়ে দিলে ঢাকার যানজট কমে যাবে। কিন্তু যারা জেলা থেকে ঢাকায় আসে, তাদের কথাও তো ভাবতে হবে। ধরেন, একজন যাত্রী পরিবার-পরিজন, লাগেজ নিয়ে রাতে ঢাকায় এলেন। তাকে যদি টঙ্গী, হেমায়েতপুর বা অন্য কোথাও নামিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তিনি কীভাবে ঢাকায় প্রবেশ করবেন?"
এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, “অনেকে বলছেন, মেট্রোরেল থাকবে। কিন্তু আন্তঃজেলা যাত্রী লাগেজ নিয়ে, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেট্রোরেলে উঠবে কীভাবে? এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে।”
পরিকল্পনাবিদদের সম্পৃক্ত না করার সমালোচনা করে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “আমরা তো পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে বলে শুনিনি। যারা নীতিনির্ধারণ করেন, তাদের উচিত পরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং যারা নিয়মিত এসব টার্মিনাল ব্যবহার করেন, তাদের মতামত জানা।”
যাতায়াত ব্যবস্থা আধুনিক করার কথা তুলে ধরে রাজউকের পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, “আমরা প্রতিটি টার্মিনাল এমনভাবে পরিকল্পনা করেছি, যাতে তা বিদ্যমান অথবা প্রস্তাবিত মেট্রো স্টেশনের কাছে হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ রিং রোড নেটওয়ার্কের সঙ্গেও সংযুক্ত থাকতে পারে।”

তবে যাত্রীদের জন্য বিশেষভাবে সংরক্ষিত বা শাটল বাস সার্ভিস চালু হবে কি না, সে বিষয়ে বিআরটিসি-এর পরিচালক (প্রশাসন ও অপারেশন) রাহেনুল ইসলাম বলেন, “এখনো এরকম কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত যদি হয়, তাহলে আমরা আমাদের সাধ্যমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”
ঢাকায় থাকা সিরাজগঞ্জের জয় সরকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দীর্ঘ যাত্রার পর যদি আবার লোকাল বাসে করে অনেকটা পথ যেতে হয়, তাহলে সেটি যাত্রীদের জন্য কষ্টকর হবে।”
দিনাজপুর থেকে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাকেশ রায় বলেন, “এখন এলাকার বাসে এসে ঢাকার ভেতরেই নামি। সেখান থেকে সহজেই বাইক বা অটো-রিকশা করেই চাইলে হলে পৌঁছে যাওয়া যায়। টার্মিনাল যদি শহর থেকে অনেক দূরে করা হয়, তাহলে আমাদের জন্য কিছুটা হলেও বাড়তি ভোগান্তি তৈরি হবে।”
ভাড়ার ওপর প্রভাব নিয়ে বাস মালিক সমিতির নেতা আহম্মেদ খোকন বলেন, “আশা করি আন্তঃজেলা ভাড়া কমবে।”
শহরের বাইরের টার্মিনাল থেকে ঢাকা প্রবেশের ক্ষেত্রে ভাড়া বিষয়ে তিনি বলেন, “যতটুকু দূরত্ব বাড়বে, ভাড়াও বিআরটিএর তালিকা অনুযায়ী ততটুকুই বাড়বে। এর বেশি কিছু হবে না।”
অন্যদিকে ডিপো শহরের বাইরে নিলে যাত্রী না নিয়ে টার্মিনালে আসা বা ‘ডেড মাইলেজ’ নিয়ে অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, “বাসকে ডিপো থেকে ফাঁকা অবস্থায় টার্মিনালে আসতে হবে এবং যাত্রী নামিয়ে আবার ফাঁকা অবস্থায় ডিপোতে ফিরতে হবে।
“এই ‘ডেড মাইলেজ’-এর কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হবে। সে ক্ষেত্রে ভাড়া কাঠামোয় সামান্য পরিবর্তন আনা যেতে পারে, অথবা সরকার চাইলে ভর্তুকি দিতে পারে।”

যাত্রীদের নিরাপত্তা শঙ্কা
শহরের বাইরে টার্মিনাল হলে রাতে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হবে বলেছেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ।
এ বিষয়ে সতর্ক করে পরিবহন বিশেষজ্ঞ হাদিউজ্জামান বলেন, “রাতের বেলায় দূরপাল্লার যাত্রীদের মহাসড়কসংলগ্ন দূরবর্তী টার্মিনালে যেতে হলে নিরাপত্তা ও ছিনতাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হবে। আবার শহরতলী থেকে শহরের বিভিন্ন গন্তব্যে আন্তঃসংযোগ তৈরি করাও অত্যন্ত জটিল বিষয়। কারণ প্রত্যেক যাত্রীর গন্তব্য আলাদা।”
শহরের বাইরে ডিপো করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “এটাই হবে সবচেয়ে টেকসই সমাধান। অন্যথায় আমরা শুধু ঢাকার যানজটকে শহরের বাইরে মহাসড়কে স্থানান্তর করব। পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও থাকবে।
“আর নতুন টার্মিনালগুলোও একসময় টার্মিনাল ও ডিপোর মিশ্র রূপ নিয়ে ফেলবে, তখন সেগুলো আর প্রকৃত অর্থে টার্মিনাল হিসেবে কাজ করবে না।”
নিরাপদ যাতায়াতের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আদিল মুহাম্মদ খানও বলেন, “ঢাকার বাস্তবতা বিবেচনা না করে শুধু উন্নত দেশের উদাহরণ দিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না। আগে নিশ্চিত করতে হবে শহরের বাইরে নামানো যাত্রীরা কীভাবে নিরাপদে, স্বাচ্ছন্দ্যে ও সাশ্রয়ীভাবে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাবে।”
আগের খবর: