২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে উৎপাদন শুরুর অনুমোদন

আগামী মাসেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 29 Oct 2026, 07:36 PM

Updated : 29 Oct 2026, 07:36 PM

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পথে আরও এক ধাপ অগ্রগতি হয়েছে।

প্রয়োজনীয় ফিজিক্যাল স্টার্টআপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর এবার কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিটে ‘স্টেজ-সি’ বা পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম পরিচালনার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ-বায়েরা।

এর ফলে প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে তা সরবরাহের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাল।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাসান বলেন, বায়েরা চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি দিয়েছেন।

প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানায়, পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কমিশনিং কার্যক্রম এগিয়ে গেলে আগামী মাসেই জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।

এর আগে প্রথম ইউনিটের বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ যাবতীয় প্রাক্-প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা ও কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এসব পরীক্ষার বিস্তারিত প্রতিবেদন বায়েরার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার পরই স্টেজ-সি পর্যায়ের কার্যক্রম শুরুর অনুমোদন মিলেছে।

ফিজিক্যাল স্টার্টআপের ধাপ পেরিয়ে কেন্দ্রটি এখন সরাসরি পাওয়ার স্টার্টআপ বা উৎপাদন প্রস্তুতি পর্বে প্রবেশ করছে। এ পর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন্দ্রটির পরিচালনাকারী সংস্থাকে বায়েরা ট্রায়াল অপারেশনাল অনুমোদন দিয়েছে।

স্টেজ-সি বা পাওয়ার স্টার্টআপ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর, প্রাথমিক ও দ্বিতীয় পর্যায়ের কুল্যান্ট ব্যবস্থা, টারবাইন-জেনারেটর, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং সার্বিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার কার্যকারিতা ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষা করা হবে।

একই সঙ্গে এসব ব্যবস্থার পারস্পরিক সমন্বয় নিখুঁতভাবে কাজ করছে কিনা, তাও নিবিড়ভাবে যাচাই করা হবে। এই ধাপের মূল লক্ষ্য হলো কেন্দ্রটির নিরাপদ, স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য পরিচালনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা শতভাগ যাচাই করা।

রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্রপাতিগুলোর কার্যকারিতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। বিশেষ করে, টারবাইনের নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাব্যবস্থা, জেনারেটর এবং সংশ্লিষ্ট বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম স্বাভাবিক পরিচালন পরিস্থিতিতে যথাযথভাবে কাজ করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে।

পুরো প্রক্রিয়ায় রিঅ্যাক্টর, টারবাইন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে নিখুঁত সমন্বয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি, বায়েরা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড পরিচালনাসংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও পারমাণবিক জরুরি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় অব্যাহত রাখতে হবে।

স্টেজ-সি পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো জেনারেটরকে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা। এই প্রক্রিয়ায় গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও অন্যান্য প্যারামিটারের সঙ্গে সমন্ময় রেখে স্থিতিশীলভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা যাচাই করা হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা কম রেখে পরীক্ষা শুরু করা হবে এবং পরবর্তী কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে তা ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে। রিঅ্যাক্টরের তাপীয় ক্ষমতা ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হলে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রথম ইউনিট থেকে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে এই সময়সীমা সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষার ফলাফল, কমিশনিং কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত শর্ত পূরণের ওপর নির্ভরশীল।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্টেজ-সি পর্যায়ের পরীক্ষা সম্পন্ন করা, জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু এবং পরবর্তীতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে যাওয়া এই তিনটি সম্পূর্ণ পৃথক মাইলফলক। বাণিজ্যিক উৎপাদনে পৌঁছানোর আগে প্রয়োজনীয় সব কারিগরি পরীক্ষা, কমিশনিং কার্যক্রম এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্তগুলো পুরোপুরি পালন করতে হবে। ফলে পাওয়ার স্টার্টআপের অনুমোদন পাওয়ার অর্থ এই নয় যে তাৎক্ষণিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়ে গেছে। জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর পরও কেন্দ্রের বিভিন্ন ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করতে পরীক্ষা অব্যাহত থাকবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মোট দুটি ইউনিট রয়েছে, যার প্রতিটির উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে এই মেগা প্রকল্পটির মোট উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটে। এই কেন্দ্র চালুর মধ্য দিয়ে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত হবে এবং বাংলাদেশ পারমাণবিক প্রযুক্তির অধিকারী দেশের মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় যুক্ত হবে।

রূপপুর প্রকল্পের মূল মেয়াদ মূলত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও পরবর্তীতে দুই দফায় তা বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং অন্যান্য আর্থিক ও বৈশ্বিক কারণে প্রকল্পের ব্যয় সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে দাঁড়িযেছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকায়।