২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯ আশ্বিন ১৪৩৩

‘কিশোর গ্যাং’-বিরোধী অভিযান: ‘দোষ করসে, নিয়া আইসে, খুব ভালো হইসে’

‘কিশোর গ্যাং’ সম্পৃক্ততার অভিযোগে কুমিল্লায় একরাতে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়।

তানভীর দিপু

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 24 Sep 2026, 06:26 PM

Updated : 24 Sep 2026, 06:26 PM

ছেলের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সনদ ও কলেজের কাগজপত্র নিয়ে থানার সামনে বসে আছেন মা মিতা সরকার। কুমিল্লা আদর্শ সদরের কোতোয়ালি থানা থেকে বলেছে, নিলয় সরকার যে শিক্ষার্থী তা প্রমাণ করতে পারলে ছেড়ে দেবে।

বুধবার রাতে কুমিল্লা জেলাজুড়ে কিশোর অপরাধবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে মিতা সরকারের ছেলে নিলয় সরকারকে পানপট্টি থেকে ধরে নিয়ে আসে পুলিশ। পরদিন সকালে খবর পান তাকে কোতোয়ালি থানায় আটকে রাখা হয়েছে।

নিলয় বখাটেপনার অভিযোগে পুলিশের হাতে আটক হয়েছে- এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মিতা সরকার বলেন, “আটকাইসে ভালো হইসে। স্যাররা (পুলিশ) ভালো চায় দেইখ্যাইতো আটকাইসে। আমার ছেলে রাতের ৯টার দিকে পোলাপানের সাথে বইসা বইসা আড্ডা দেয়- দোষ করসে, নিয়া আইসে- খুব ভালো হইসে।”

থানার সামনেই কথা হয় আটক অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া স্কুলছাত্র শিপনের খালা ইয়াসমিনের (ছদ্মনাম) সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, “সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হইসে, পুলিশ ধরে নিয়ে আইসে। আটকাইয়া না রাইখ্যা কয়ডা মাইর দিয়া ছাইড়া দিলে হয়। অহন মা, ভাই, খালা সবাই তার জন্য থানায় আইতে হইসে। শরমের বিষয় না!"

একই দশা নগরীর ঢুলিপাড়া থেকে আটক হওয়া কিশোর রংমিস্ত্রি সাব্বিরেরও। তার মা শবানা বেগম (ছদ্মনাম) বলেন, “রাইতে ঢুলিপাড়া ভাঙ্গা বিল্ডিং থাইক্যা ধইরা নিয়া আইসে। বাইরে পোলাপানের সাথে আড্ডা দিতাসিলো। পুলিশ কয় অহন ছাড়তো না।”

থানার সিঁড়িতে বসে কাঁদছিলেন বৃদ্ধা জাহানারা বেগম। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, “আমার পোলার বয়স ৩৫। কাল রাইতে আমির দিঘীর পাড় থাইক্যা ধরসে। কেন ধরসে জানি না। আমার পোলা কি করসে জানি না।”

এমন ৭৫ জন আটক ব্যক্তির বাবা-মা, ভাই-বোন ও আত্মীয়স্বজনদের তাদেরকে ছাড়াতে থানার সামনে দিনভর অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। খেয়ে, না খেয়ে অনেক বাবা-মা ছুটোছুটি করছেন পুলিশের এই দপ্তর থেকে ওই দপ্তরে। তবে বেশিরভাগ অভিভাবকেরই দাবি, নির্দোষ কেউ যেন শাস্তি না পায়।

এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, “যাদেরকেই আটক করা হয়েছে তার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। তারা যে জায়গায় ছিল, সেখানে কেন ছিল সেটিই হয়তো বলতে পারেনি। তাদের বাবা-মাও জানেন না তারা আসলে সন্ধ্যায় কোথায় যায়।”

তিনি বলেন, “আমার কোতোয়ালি থানায় ৭৫ জন আটক হয়েছে। আমরা চাই, কোনো কারণ ছাড়া কোনো ছাত্র বাসার বাইরে থাকবে না। যারা ছাত্রের বাইরে সন্দেহভাজন আটক হয়, তাদের যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ৭৫ জনের মধ্যে কারো কারো নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, কেউ ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত, কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িত এবং কারোর ‘কিশোর গ্যাং’য়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তবে বেশিরভাগই বাবা-মায়ের অবাধ্য বখাটে আড্ডাবাজ; মুচলেকা নিয়ে তাদেরকে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।

বুধবার রাতে সারা জেলায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। ‘কিশোর গ্যাং’ সম্পৃক্ততার অভিযোগে কুমিল্লায় একরাতে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। জেলার ১৮টি থানায় একযোগে এই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হয় বলে জানান কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও মিডিয়া কর্মকর্তা লুৎফর রহমান।

তবে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে এবং তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই শেষে আইনানুগ প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের খুনের ঘটনার পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে আবারও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এরপরই পুলিশ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ জেলার ১৮টি থানা এলাকায় কিশোর গ্যাং এবং বখাটেদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে।

এদিকে বুধবার রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দিতে আটকদের মধ্যে ১৭ জন থানা কক্ষের দরজা ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, একই কক্ষে অতিরিক্ত মানুষ হয়ে যাওয়ায় এমন বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। তবে যারা গিয়েছিল তাদেরকে আবার লোকজন ধরে এনে ফেরত দিয়ে গেছে।