২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণে ব্যস্ত রাজবাড়ীর চাষিরা, দুশ্চিন্তা খরচ নিয়ে

“সা‌রের দোকা‌নে গেলে দোকানদার কয় সার নাই। আবার যাও টু‌কিটা‌কি পাওয়া যায় দাম বে‌শি।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 27 Oct 2026, 12:17 PM

Updated : 27 Oct 2026, 12:55 PM

রাজবাড়ীর মাঠে মাঠে শুরু হয়েছে মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপণের ব্যস্ততা। স্বল্প সময়ে ফসল ঘরে তোলার আশা নিয়ে জমি প্রস্তুত ও পেঁয়াজ রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষিরা।

তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সার না পাওয়া এবং বাজারদর নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।

অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া মুড়িকাটা পেঁয়াজের রোপণ শেষে ডিসেম্বরেই ফসল ঘরে তোলার আশা করছেন কৃষকরা। স্বল্প সময়ে উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় এ পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ রয়েছে তাদের। তবে খরচের তুলনায় ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে অনেকের।

স‌রেজ‌মি‌নে দেখা যায়, রাজবাড়ীর বি‌ভিন্ন মাঠে কৃষকদের কেউ জমি প্রস্তুত করছে; কেউ সারি সারি করে রোপণ করছেন পেঁয়াজ। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি শ্রমিকদের নিয়েও চালা‌চ্ছে এই কর্মযজ্ঞ।

রাজবাড়ী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জনি খান জানান, সারা দেশের মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের ১৪ শতাংশ এ জেলায় হয়। জেলায় হালি ও মুড়িকাটা-দুই ধরনের পেঁয়াজের আবাদ হয়ে থাকে।

চলতি বছর জেলায় ছয় হাজার ১৩ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

কালুখা‌লি উপ‌জেলার হ‌রিণবা‌ড়িয়া চ‌রের কৃষক আফজাল হো‌সেন ব‌লেন, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করতে প্রায় ৬০ হাজার ৪০০ টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে জমি চাষে তিন হাজার, সারে ১০ হাজার, ১০ মণ বীজে ৩০ হাজার, রোপণের শ্রমিক খরচ ছয় হাজার ৪০০, সেচে তিন হাজার, কীটনাশকে পাঁচ হাজার এবং নিড়ানিতে তিন হাজার টাকা ব্যয় হয়। সব মিলিয়ে মোট খরচ ৬০ হাজার ৪০০ টাকা।

তিনি ব‌লেন, “এই হিসাব তো যা‌দের নি‌জের জ‌মি আছে তা‌দের। যা‌দের জ‌মি লিজ নি‌তে হয়, তা‌দের ওই ৬০ হাজা‌র খরচের সঙ্গে আরও ৩০ হাজার যোগ করতে হয়।”

পা‌শেই ব‌সে‌ পেঁয়াজ রোপন কর‌ছি‌লেন ফজল মোল্লা। তি‌নি ব‌লেন, “খরচ করে পেঁয়াজ লাগাই, কিন্তু দাম তো পাই না। প্রতি বছরই লোকসান হচ্ছে। বিঘা প্রতি খরচ হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।

“ফলন ভালো হলে বিঘায় ৭০ থেকে ৮০ মণ পেঁয়াজ পাব। এখন বাজারে কী দাম পাব, তার ওপরই লাভ-লোকসানের হিসাব নির্ভর করছে।”

সামসু‌দ্দিন প্রামাণিক নামের আরেক কৃষক ব‌লেন, “এখন পেঁয়াজ লাগালে তিন মা‌সের মধ্যে ঘ‌রে তুলতে পারব। তবে সমস‌্যা হচ্ছে, বাজা‌রে সার পাচ্ছি না। সা‌রের দোকা‌নে গেলে দোকানদার কয় সার নাই। আবার যাও টু‌কিটা‌কি পাওয়া যায় দাম বে‌শি। সরকার সা‌রের দাম কামালে কৃষক একটু বাঁচ‌তো।”

একই অভিযোগ ক‌রেন কামাল খান, না‌সির মোল্লা, আফতাব প্রামাণিক ও হা‌লিম সরদার। তারা ব‌লেন, সা‌রের যারা ডিলার, তারা বড় চোর। ওরা সার মজুদ ক‌রে রাখ‌ছে বে‌শি দা‌মে বি‌ক্রির জন্য।

কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে অভিযোগ করেও তারা প্রতিকার পাচ্ছেন না বলে দাবি এ কৃষকদের। বাজারে গেলে যেন সহজেই সার পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।

তবে সার সংক‌টের অভিযোগ অস্বীকার ক‌রে কৃষি কর্মকর্তা জ‌নি খান ব‌লেন, “কৃষ‌কেরা যেন সার পায় তার জন‌্য নিয়‌মিত সার সরবরহ করা হ‌চ্ছে। আপাতত জেলায় সা‌রের কোনো সংকট নেই।

“কৃ‌ষি বিভাগ সব সময় কৃষক‌দের খোঁজ খবর রাখছে। তা‌দের নিয়‌মিত কৃ‌ষি বিষয়ক পরামর্শও দেওয়া হ‌চ্ছে।”

সদর উপজেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের কৃষক জলিল শেখ বলেন, “গত বছর মুড়িকাটা পেঁয়াজ উৎপাদন মৌসুমে প্রতি মণ পেঁয়াজ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয়েছিল ১ হাজার টাকার বেশি। এতে লাভ না হলেও উৎপাদন খরচ উঠে এসেছে।

“এবারও চাষ, সেচ, শ্রমিক ও বীজের খরচ রয়েছে। এর সঙ্গে সারের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে। এবার উৎপাদন মৌসুমে প্রতি মণ পেঁয়াজ ১ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হলে লোকসানে পড়তে হবে।”

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবছর মুড়িকাটা পেঁয়াজের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হবে এবং চাষিরা লাভবান হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।