টেকনাফে কলেজছাত্রীকে বিবস্ত্র করে চুল কেটে নির্যাতন, গ্রেপ্তার ২
ওই নারীর ভাষ্য, ঘটনার সময় তার ব্যাগে থাকা টাকা ও স্বর্ণের কানের দুলও নিয়ে নেওয়া হয়।
কক্সবাজারের টেকনাফে এক কলেজ ছাত্রীকে চলন্ত ইজিবাইক থেকে নামিয়ে মারধর, কাপড় ছিঁড়ে বিবস্ত্র করা, চুল কেটে দেওয়া এবং আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় ওই তরুণীর করা মামলায় দশজনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ এরইমধ্যে দুই নারীকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বুধবার বিকালে টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের উত্তর শিলখালী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে জানিয়েছেন টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম।
ভুক্তভোগী কক্সবাজারের একটি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন বাবার চিকিৎসার জন্য টাকা জোগাড় করতে শামলাপুর বাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা তুলে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি।
ফেরার পথে উত্তর শিলখালী টোয়িংগাঘাটি এলাকায় তার ইজিবাইকের পথরোধ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাকে নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে।
‘চুলের মুঠি ধরে টেনে নামানো হয়’
ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ইজিবাইকের পথরোধ করার পর একজন তার চুলের মুঠি ধরে টেনে নামান। অন্যরা তাকে মারধর করতে করতে একটি বাড়ির দিকে নিয়ে যায়। পরে জনসম্মুখে তার পরনের কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়।
তিনি বলেন, “সব কাপড়-চোপড় খুলে ফেলে অনেক মারছে। এগুলা সবাই ভিডিও করছে। এরপর একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর এবং মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়।
এ সময় তার শরীরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালশিটে দাগ ও ফোলা জখম হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করেন তিনি।
ওই নারীর ভাষ্য, ঘটনার সময় তার ব্যাগে থাকা টাকা ও স্বর্ণের কানের দুলও নিয়ে নেওয়া হয়।
যৌন নির্যাতনের অভিযোগ
ভুক্তভোগী এক পুরুষের বিরুদ্ধে তাকে ধর্ষণের অভিযোগ করেছেন। তবে বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মোহাম্মদ সাঈদ ও টেকনাফ থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেছেন, পুলিশের কাছে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ধর্ষণের অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে।
বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ বলেন, মারধরের সময় ভুক্তভোগীর কাপড় ছিঁড়ে ফেলা হয়েছিল।
ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, ঘটনার পর তার চিকিৎসা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র থানায় জমা দেওয়া হয়েছে।
ওসি বলেন, “এ বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। তাই যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে চিকিৎসা প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।”
কেন হামলা
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পেছনে একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কেন্দ্র করে বিরোধের অভিযোগ রয়েছে।
বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক মোহাম্মদ সাঈদ বলেন, “প্রধান আসামি মুর্শেদার স্বামী দুবাই প্রবাসী। তাদের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ চলছে এবং বিচ্ছেদের বিষয়টি নিয়েও এলাকায় বিভিন্ন কথা রয়েছে।”
তবে বিচ্ছেদের বিষয়টি পুলিশ এখনো নথিপত্র দিয়ে নিশ্চিত করতে পারেনি বলে জানান তিনি।
পুলিশের ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, ভুক্তভোগীর সঙ্গে ওই দুবাই প্রবাসীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি জানার পর ক্ষুব্ধ হয়ে মুর্শেদা ও তার পরিবারের সদস্যরা ভুক্তভোগীর ওপর হামলা করেন বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।
তবে ভুক্তভোগী এ ধরনের সম্পর্ক বা পরকীয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, তাকে কেন মারধর করা হয়েছে, তা তিনি জানেন না।
৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশের উদ্ধার
ভুক্তভোগী জানান, মারধরের একপর্যায়ে তিনি বাঁচাও বলে চিৎকার করলে স্থানীয় কয়েকজন সেখানে এগিয়ে আসেন। পরে তাকে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়।
খবর পেয়ে তার ছোট ভাই জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন।
পুলিশ বলছে, খবর পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী জাফর আলম জানান, “ওই সময় সেখানে প্রায় শতাধিক মানুষের উপস্থিতিতে নির্যাতন করা হয়।”
বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ ও টেকনাফ থানার পুলিশের পৃথক অভিযানে উত্তর শিলখালীর মুর্শেদা ও রেহেনা আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক মোহাম্মদ সাঈদ বলেন, “আটক দুজনকে আদালতের মাধ্যমে কারগারে পাঠানো হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।”
তিনি বলেন, চিকিৎসা নেওয়ার পর ভুক্তভোগী টেকনাফ থানায় একটি নিয়মিত মামলা করেন। মামলায় মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে মারধর, শ্লীলতাহানি ও চুল কেটে দেওয়ার পাশাপাশি ১৫ হাজার টাকা এবং স্বর্ণের কানের দুল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
