২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪ আশ্বিন ১৪৩৩

আড়াইহাজারে গোপন কক্ষে ‘নৌকার এজেন্টের’ উঁকি

গোপন কক্ষের সামনে কেন দাঁড়িয়ে আছেন জানতে চাইলে তিনি নিজেকে 'নৌকার এজেন্ট’ পরিচয় দিয়ে কক্ষের সামনে থেকে সরে যান৷

আড়াইহাজারে গোপন কক্ষে ‘নৌকার এজেন্টের’ উঁকি

আড়াইহাজার পৌরসভা নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে গোপন কক্ষে উঁকি দিচ্ছেন দুই ব্যক্তি।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Jun 2023, 08:00 PM

Updated : 12 Jun 2023, 08:00 PM

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার পৌরসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলাকালে নৌকার মেয়র প্রার্থী সুন্দর আলীর পোলিং এজেন্ট ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে গোপন কক্ষের কর্মকাণ্ড নজরদারি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সোমবার সকাল ৮টায় এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হয়।

ভোটগ্রহণ চলাকালে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের নাগেরচর মাদ্রাসার পুরুষ কেন্দ্রে অন্তত চারবার এ নজরদারির দৃশ্য দেখা যায়৷

বেশিরভাগ কেন্দ্রে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চললেও এ কেন্দ্রটিতে চলে বিকাল ৫টা পর্যন্ত।

গোপনকক্ষে ভোটারের ভোটের ওপর নজর রাখার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বুথে দায়িত্বরত পোলিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং প্রিসাইডিং অফিসারও।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নাগেরচর মাদ্রাসা পুরুষ কেন্দ্রের গোপন কক্ষের সামনে এক যুবককে কালো পর্দা সরিয়ে উঁকি দিতে দেখা যায়৷ তখন ভেতরে একজন ভোটার ইভিএমে নিজের ভোট দিচ্ছিলেন৷

গোপন কক্ষের সামনে কেন দাঁড়িয়ে আছেন জানতে চাইলে তিনি নিজেকে 'নৌকার এজেন্ট’ পরিচয় দিয়ে কক্ষের সামনে থেকে সরে যান৷

এরপর দুপুর ১২টা ও সোয়া ১টার দিকেও কেন্দ্রটিতে গোপন কক্ষে ভোট দেওয়ার সময় ভোটারদের পাশেও নৌকার এজেন্টদের দেখা যায়। বিকাল পৌনে ৪টার দিকেও এই কেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর বুথে একই চিত্র দেখা যায়৷

সে সময় বুথের গোপন কক্ষের কালো পর্দা সরিয়ে দুজনকে উঁকি দিতে দেখা যায়, যাদের একজনের শার্টে সাঁটানো ছিল 'নৌকা' প্রতীকের মেয়র প্রার্থীর এজেন্ট লেখা কার্ড। ছবি তোলার পরপরই সেখান থেকে সরে যান তারা৷

এ কেন্দ্রে নারকেল গাছ প্রতীকের স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট মোহাম্মদ খোকন বলেন, “বুথে ঢুকে নৌকার এজেন্টরা নৌকায় ভোট দিতে বাধ্য করছে৷ শুরু থেকেই এমন চলছে৷ প্রিসাইডিং অফিসারকে অভিযোগ করলেও তিনি কিছু করছেন না৷ ভোটের কোনো পরিবেশই নেই, কিন্তু আমরা ভয়ে কিছু বলতে পারছি না।”

নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, প্রার্থীর নির্ধারিত এজেন্টদের বাইরে বুথের ভেতর কেউ উপস্থিত থাকতে পারবেন না৷ এজেন্টরাও বসে থাকবেন গোপন কক্ষ থেকে নির্ধারিত দূরত্বের আসনে৷ ভোটার গোপন কক্ষে কোন প্রতীকে ভোট দিচ্ছেন তা দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তির দেখার সুযোগ নেই৷

তবে আড়াইহাজার পৌরসভা নির্বাচনে এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেছে।

ভোটারের ভোটদানের নজরদারির পাশাপাশি বুথের ভেতর নির্ধারিত এজেন্ট ছাড়াও নৌকার কার্ড গলায় ঝুলিয়ে রাখা একাধিক ব্যক্তির উপস্থিতি উল্লেখ্য কেন্দ্রে দেখা গেছে।

নাগেরচর মাদ্রাসা কেন্দ্রের ৪ নম্বর বুথে দায়িত্বরত সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার মাহফুজুর রহমান বলেন, “আমরা বারবার নিষেধ করছি, কিন্তু কেউ শুনছে না৷ প্রিসাইডিং অফিসার স্যারকেও বলেছি, তিনি নিজে এসে এজেন্টদের গোপন বুথের সামনে যেতে নিষেধ করেছেন৷ তার কথাও কেউ কথা শোনেনি।”

একই কথা জানালেন ৫ নম্বর বুথের দায়িত্বে থাকা সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার হুমায়ূন কবিরও৷

জানতে চাইলে প্রিসাইডিং অফিসার মো. শাহজাহান বলেন, “আমার শক্তি হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আমি তাদের শরণাপন্ন হয়েছি। তারাও চেষ্টা করেছে। চেষ্টা করার পর কতটা সফল হওয়া গেছে তা তো আপনারা নিজের চোখেই দেখলেন।”

এই ভোটগ্রহণকে 'সুষ্ঠু' বলা যায় কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমিও বলছি, ত্রুটি আছে আমাদের। আমরা অনুনয়-বিনয় করতে পারি। আমরা তো মারধর করতে পারি না৷ আমি রিটার্নিং কর্মকর্তাকে বলেছি, এই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা ম্যাজিস্ট্রেটের শরণাপন্ন হয়েছি, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এখানে আসার পর তাকেও বলেছি। আমি অসহায়। আমি বারবার তাদের নিয়ম মানতে বলেছি। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি৷”

কেন্দ্রটিতে কয়েকজন ভোটার মারধরের শিকার হন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

মোহাম্মদ কামাল হোসেন নামে এক ভোটার বলেন, ভোট দিয়ে বের হবার পরেই উপজেলার প্রভাবশালী এক ছাত্রনেতা ও তার লোকজন শার্টের কলার ধরে চড়-থাপ্পড় দিতে থাকে৷

“তারা বলে, আমি নাকি নৌকায় ভোট না দিয়ে অন্য মার্কায় দিয়েছি। এ অপরাধের কথা বলেই আমাকে মারতে থাকে। আরো কয়েকজনকে মেরেছে, সবাইকে নৌকায় ভোট দিতে বাধ্য করেছে।”

এই কেন্দ্রের কয়েকটি বুথে 'জগ' প্রতীকের এজেন্টকে দেখা যায়নি৷

এ প্রতীকের প্রার্থী হাবিবুর রহমানের অভিযোগ, বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে তার এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়েছে৷ একই অভিযোগ করেন 'মোবাইল ফোন' প্রতীকের প্রার্থী মামুন অর রশীদও৷

এই অভিযোগের বিষয়ে নাগেরচর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার শাহ্জাহান বলেন, “জগ প্রতীক এ কেন্দ্রের পাঁচটি বুথেই এজেন্ট দিয়েছিল৷ কিন্তু আমি নিজে ভিজিটে গিয়ে তিনজনকে পেয়েছি, দুইজনকে পাইনি। এখন তাদের বের করে দেওয়া হয়েছে নাকি তারাই বের হয়ে গেছেন তা বলতে পারছি না।”

এ কেন্দ্রটিসহ কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারও৷

বিকালে পরিদর্শন শেষে যাবার সময় কৃষ্ণপুরা এলাকায় জেলা প্রশাসক মঞ্জুরুল হাফিজের কাছে নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি, বহু লোকের সঙ্গে কথা বলেছি। সবাই বলেছেন, নির্বাচন ভালো হয়েছে৷ কারও কোনো অভিযোগ নেই৷”

বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে 'মোবাইল ফোন' প্রতীকের মেয়র প্রার্থী মামুন অর রশীদ সাংবাদিকদের বলেন, “নোয়াপাড়া, নাগেরচর, ঝাউগড়ার প্রতিটি বুথে গোপন কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল নৌকার এজেন্টরা৷ তারা ভোটারদের প্রথমেই নৌকায় ভোট দিতে বাধ্য করেছে৷ কয়েকবার প্রিসাইডিং অফিসার, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশকে বলেছি কিন্তু তারা কেউ অ্যাকশনে যায়নি৷

“প্রশাসন ও নির্বাচন কর্মকর্তারা পুরোপুরি নিরপেক্ষ ছিলেন না৷ এখন রেজাল্ট কী আসবে তা তো এই পরিস্থিতিই সব বলে দেয়৷”

গোপন কক্ষে নৌকার এজেন্টদের নজরদারি ও ভোটারদের মারধরের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, “আমি এ বিষয়ে একমত না৷ কেউ এমন অভিযোগ করেনি৷ আই ডোন্ট বিলিভ দ্যাট (গোপন কক্ষে নজরদারি)৷ এটা আপনাদের ক্রিয়েশন, আপনাদের নিজস্ব সৃষ্টি৷ ভোট ভালো হয়েছে৷”

নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা নরসিংদী জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা রবিউল আলমও খুব ভালো নির্বাচন হয়েছে বলে দাবি করেন। তিনি এই নির্বাচনকে মডেল নির্বাচন বলেও আখ্যা দেন।

পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটারদের মারধর, গোপন বুথে নজরদারি, এবং প্রিসাইডিং কর্মকর্তার অসহায়ত্ব প্রকাশের বিষয়টি উল্লেখ করলে তিনি বলেন, “কোথাও কোনো ঝামেলা হয়নি। নাগেরচর মাদরাসা কেন্দ্রের বাইরে দুটি পক্ষের লোক চিল্লাচিল্লি করেছিল। পরে ব়্যাব-পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। গোপন বুথে নজরদারির বিষয়টি আমাকে কেউ জানায়নি।”