ব্রহ্মপুত্রে ভাঙন: ১৭ পরিবারের বসতভিটা বিলীন, কাঁচা ধান কাটছেন কৃষক
জরুরি কাজের জন্য এখন কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই বলে জানিয়েছে কুড়িগ্রাম পাউবো।
কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এক সপ্তাহে নদী ভাঙনে উপজেলার চর শৌলমারী ইউনিয়নের সুখেরবাতি ও খেদাইমারী গ্রামের ১৭টি পরিবারের ভিটেমাটি বিলীন হয়েছে।
এলাকাবাসী বলছেন, বসতবাড়ির পাশাপাশি নদীগর্ভে চলে গেছে বিঘার পর বিঘা কাঁচা-পাকা আমন ধান, ভুট্টা ক্ষেতসহ শাক-সবজি। ভাঙন এতটাই তীব্র রূপ ধারণ করেছে যে, কাঁচা-পাকা ধান কাটছেন কৃষকেরা।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেছেন, জরুরি কাজের জন্য এখন কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই। ভাঙনের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের (সুখেরবাতি এলাকা) সদস্য আনছার আলী তুহিন বলেন, এক সপ্তাহে তার ওয়ার্ডে সাতটি এবং পার্শ্ববর্তী ৮ নম্বর ওয়ার্ডের খেদাইমারী গ্রামে ১০টি বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
ভাঙনে সর্বস্ব হারানো পরিবারগুলোর মধ্যে সুখেরবাতি এলাকার প্রয়াত জুরান শেখের ছেলে দেলোয়ার, প্রয়াত নওশাদের ছেলে নজরুল ইসলাম, বাবু পাগলার ছেলে রুপচান, আশেক আলীর মেয়ে আয়শা খাতুন, প্রয়াত বুলু শেখের ছেলে ছোবহান এবং গোলাপ ঠাকুরের ছেলে লালু শেখের বাড়ি রয়েছে।
অন্যদিকে ৮ নম্বর ওয়ার্ডে ঘরবাড়ি হারানো বাসিন্দারা হলেন- বুলা বয়াতির ছেলে কপিল উদ্দিন, আফছার আলী, হাতেম, কদম আলী, কোরবান আলীর ছেলে আব্দুল খালেক, পিয়ার আলীর ছেলে মহর উদ্দিন, আব্দুস ছপুরের ছেলে সিরাজুল, প্রয়াত মজিদ আলীর ছেলে জমসের আলী এবং সোলায়মানের ছেলে আক্কাস আলী।
এ ছাড়া চরে নতুন বাড়ি করা আরও দুই ব্যক্তির বসতভিটাও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে; যাদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বসতবাড়ির পাশাপাশি নদী ভাঙনের গ্রাসে নিঃস্ব হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুখেরবাতি চরে ভয়াবহ ভাঙনের মুখে কৃষকদের নিরুপায় হয়ে কাঁচা ধান কাটার কিছু ছবি ভাইরাল হয়। এক বছরে এই এলাকার পাঁচ শতাধিক পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) থেকে ৬ থেকে ৭ মাস আগে ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেললেও সঠিক তদারকি ও স্থায়ী ব্যবস্থার অভাবে সেগুলোও এখন নদীগর্ভে চলে গেছে। ফলে নদীর পাড় কোনো বাধা ছাড়াই ভেঙে পড়ছে।
ইউপি সদস্য আনছার আলী তুহিন বলেন, ওই এলাকার প্রয়াত মহেজ মোল্লার ছেলে ইউনুছ মোল্লার নদীর তীরবর্তী দেড় বিঘা আমন ধানের জমির পুরোটাই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া ছবুর প্রামাণিকের চার বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘা আমন ক্ষেত নদীতে চলে গেছে।
সেইসঙ্গে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা প্রয়াত মজিদ আলীর ছেলে জমসের আলীর বাড়িভিটাসহ তিন বিঘা ধানি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, হঠাৎ ভাঙন তীব্র হওয়ায় চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। নিঃস্ব পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে ও অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছেন।
ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দ্রুত ও স্থায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান এই ইউপি সদস্য।
ভাঙনের শিকার জমসের আলী মোবাইলে বলেন, “আমাগো বাড়িভিটাসহ তিন বিঘা জমি নদীতে গেছে। অহন আমি কি করুম! ধারদেনা করি মানুষের জমিতে ঘর উঠাইছি। সরকারি-বেসরকারিভাবে কেউ সহযোগিতা করে নাই।”
চর শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এইচ এম সাইদুর রহমান বলেন, সুখেরবাতি, খেদাইমারী ও সোনাপুর ওয়ার্ড তিনটিতে নদী ভাঙন মারাত্মক রূপ ধারণ করেছ। এখানে ব্লকের কাজ না করায় জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানো যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে যেসব জিও ব্যাগ ফেলানো হয়েছিল, তা নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন উন্মুক্ত হয়ে গেছে নদী। ফলে আবাদিজমি, গাছপালা ও বাড়িঘর ভেসে নিয়ে যাচ্ছে।
সরকারিভাবে ভাঙন কবলিতদের আর্থিকভাবে সহায়তা প্রদান করা হলেও এখন তা বন্ধ হয়ে গেছে; এতে গরীব মানুষের জন্য নতুন করে মাথা গোঁজা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানান ইউপি চেয়ারম্যান।
ভাঙনের সত্যতা নিশ্চিত করে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “জরুরি কাজের জন্য এখন কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই। তবে স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকাতে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করছেন।”
