০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

গাজী টায়ারস: বাজার বেহাত, কারখানা খুলবে?

দেশের টায়ারের বাজারের প্রায় ৪০ শতাংশ একসময় গাজীর দখলে থাকলেও এখন তা অন্যদের নিয়ন্ত্রণে।

সৌরভ হোসেন সিয়াম

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 02 Oct 2026, 02:03 AM

Updated : 02 Oct 2026, 02:03 AM

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের রূপসী এলাকার গাজী টায়ারস লিমিটেড কারখানায় আট বছর চাকরি করেছেন শেরপুরের মো. ইপন। পরিবার নিয়ে থাকতেন কারখানার কাছাকাছি একটি ভাড়া বাসায়।

নিয়মিত বেতনে স্ত্রী, ছেলেমেয়ে নিয়ে ভালোই চলছিল তার সংসার। কিন্তু তাতে ছেদ পড়ে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট সরকার পরিবর্তনের পর।

দুই দফা অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পর কারখানাটি সে সময় বন্ধ হয়ে যায়। চাকরি চলে যায় ইপনের। পরে উপায়ান্ত না দেখে স্থানীয় একটি ভোগ্যপণ্য প্রস্তুতকারী কারখানায় কয়েক মাস চাকরি করেন। কিন্তু নতুন চাকরিতে বেতন কম, সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছিল, কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না।

একপর্যায়ে পরিবার নিয়ে গ্রামে ফিরে যান ইপন। সেখানে পৈত্রিক কিছু জমিতে চাষাবাদ আর টুকটাক কাজ করে এখন ‘কোনোমতে দিন কাটছে’ তার।

ইপনের সঙ্গে মোবাইলে কথা হচ্ছিল গাজী টায়ারস কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে। কারখানা মানেপোগা ধ্বংসস্তূপ। কেউ এর মর্মন্তুদ পরিণতি না জানলে প্রথম সাক্ষাতে হয়ত যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো স্থাপনা বলে ঠাওর হতে পারে।

ইপন জানতে চান, গাজী কারাখানা খোলার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না। চাকরির সময়কার সুখের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বলেন, “হয়ত কারখানাটা না পোড়ালে আমার চাকরিটা যেত না। আমাকে দুই বছর ধরে এই দুর্গতির মধ্যে পড়তে হত না।”

ইপনের সঙ্গে কথা শেষ করে সামনের দিকে পা বাড়াতেই রহমত আলীর (৩০) সঙ্গে দেখা। তিনি ফটক বন্ধ থাকা কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মারছিলেন। ভেতরে কেউ আছে কিনা দেখার চেষ্টা করছিলেন।

রহমত জানালেন, কারখানা পোড়ার আগে তিন বছর তিনি এখানে কাজ করেছেন। আগুনের ঘটনার পর শরীয়তপুরে গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। তিন দিন আগে রূপগঞ্জে আত্মীয়র বাড়িতে এসে উঠেছেন।

“দেখতে আইলাম, কারখানা খুলছে কিনা। খুললে এইখানেই আবার চাকরি করার ইচ্ছা। তাগো বেতন-ভাতা সুবিধা ভালো ছিল,” বলছিলেন রহমত।

রহমতের মত অনেকেই মাঝে মাঝে ভবনটির সামনে আসেন, স্মৃতি আওড়ান আর এক বুক হতাশা নিয়ে ফিরে যান।

কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের সময় ১৮২ জনের নিখোঁজ হওয়ার তথ্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তালিকাভুক্ত করা হয়। এরপর দুই বছর হয়ে গেলেও তাদের কোনো হদিস মেলেনি। পরিবারগুলোও তাদের ফেরার আশা ছেড়ে দিয়েছে।

কারখানাটি আবার চালু হবে, তেমন আশা দেখছেন না হাজার হাজার চাকরিহারা শ্রমিক। যদিও কারখানার কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন।

দুই দফায় আগুন-লুটপাট

গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তনের পর রূপসীর গাজী টায়ারস কারখানায় মতই ক্ষতিগ্রস্ত হয় রূপগঞ্জ উপজেলার কর্ণগোপ এলাকায় গাজী গ্রুপের আরেকটি কারখানা। সেখানে তৈরি হত পানির পাম্প, মোটর, প্লাস্টিকের ট্যাংক, পাইপ।

গাজী গ্রুপের একজন কর্মকর্তা বলছিলেন, ১৯৮০ সালে টায়ারের ব্যবসা শুরু করে দেশের বৃহৎ এ শিল্পগোষ্ঠী। টায়ারের কারখানা শুরুতে রাজধানীর লালবাগে থাকলেও ২০১১ সালে রূপসীতে স্থানান্তর করা হয়। তারাই প্রথম দেশে অটো টায়ার তৈরি শুরু করেন।

১৯৯৬ সালে প্লাস্টিকের পাইপ ও দরজা বানানোর কাজ শুরুর কয়েক বছর পর পাম্প ও ট্যাংক তৈরির কাজ শুরু করেন তারা। রূপসী ও কর্ণগোপের গাজীর দুই কারখানায় কাজ করতেন ৭ হাজার ২৩০ জন শ্রমিক।

এর বাইরে দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে মালামাল লোড-আনলোডের কাজে যুক্ত ছিলেন আরও বহু শ্রমিক। কাজের সুবিধার জন্য তাদের বেশিরভাগই কারখানার আশপাশে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন।

অনেক পরিবারের স্বামী ও স্ত্রী দুজনই কাজ করতেন গাজীর কারখানায়। ছেলেমেয়েরা পড়ত স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

গাজী শিল্পগোষ্ঠীর মালিক গোলাম দস্তগীর গাজী আওয়ামী লীগ সরকারের বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী এবং নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে গাজীর এ দুটি কারখানা দফায়-দফায় হামলার শিকার হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনে আর প্রশাসনের নীরব ভূমিকার মধ্যে এ দুটি কারখানায় লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা চলে বলে শ্রমিকদের অভিযোগ।

অভ্যুত্থানের কয়েক দিন পর, ২৫ অগাস্ট ভোরে গোলাম দস্তগীর গাজী রাজধানী থেকে গ্রেপ্তার হন। সেদিন বিকালে আবারও রূপসীর গাজী টায়ারস কারখানায় হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

‘কারখানা মানে শুধু শ্রমিক আর মাল না, আশপাশও’

কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেবল শ্রমিকরা চাকরি হারাননি, স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

গাজী টায়ারস কারখানার অদূরে রূপসী বাজারে এক দশকের বেশি সময় দোকান চালিয়েছেন আবু বকর। তার দোকানের চা-কেক-রুটির মত পণ্যের বড় একটি অংশের ক্রেতা ছিলেন ওই কারখানার শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।

কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিক্রি কমে গেলেও কয়েক মাস দোকানটি চালিয়েছেন আবু বকর। কিন্তু লোকসান বেশিদিন টানতে পারেননি। বছরখানেক আগে সেটি ছেড়ে দেন।

বর্তমানে দোকানটি চালান তারই প্রতিবেশী মো. রাজু। কথার ফাঁকে তিনি বলছিলেন, “আগের দিন থাকলে এইখানে দাঁড়াইতে পারতেন না। ঈদের বাজারের মত শ্রমিকরা গিজগিজ করত। এখন আর কি বেচাকেনা, এর চাইতে দ্বিগুন হইত। আপনের লগে কথা কওনেরও টাইম পাইতাম না।”

রাজু মনে করেন, অন্যায় কিছু করে থাকলে মালিক গোলাম দস্তগীর গাজী করেছেন। কিন্তু কারখানাটি পুড়িয়ে দেওয়ায় শ্রমিকদের সঙ্গে সঙ্গে এ এলাকার লোকজনও আর্থিক দুরবস্থায় পড়েছেন।

কারখানা বন্ধের দুই বছরের সঙ্গে আগের পরিস্থিতির তুলনা দিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক সুমন ইসলাম বলেন, আগে ছয় ঘণ্টা রিকশা চালিয়ে হাজার টাকা কামাতেন, এখন তা ১২ ঘণ্টায়ও হয় না।

গাজী টায়ারস কারখানার পাশে খাদুন সড়কে চা দোকান চালান মেহরাব হোসেন। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর বেচাকেনা ৮০ শতাংশ কমে গেছে বলে দাবি তার।

তিনি বলেন, “আগে পাঁচ হাজার মানুষের চলাফেরা ছিল এই রোডে। সারক্ষণ দোকানে ভিড় লেগে থাকত। দুপুরবেলা তো বইসা থাকার টাইম পাইতাম না। এখন আশপাশের এলাকা পুরাই ফাঁকা। আশপাশে যারা শ্রমিক ভাড়া থাকত তারা সবতেই বিভিন্ন জায়গায় গেছে গা।”

মেহরাব হোসেন চা বানাতে বানাতেই বলছিলেন, “ভাই, একটা কারখানা মানে তো আর খালি কারখানার শ্রমিক আর মালামাল না; আশপাশের মানুষজনও তো এর উপরে ভর করে থাকে। এখন এইখানে এইটা নাই।”

রিকশাচালক রফিকুল ইসলামের বাড়ি ভোলা জেলায়। রূপগঞ্জের এ এলাকায় থাকেন প্রায় তিন দশক। তার ছেলে মনির হোসেন ছিলেন গাজী টায়ারস কারখানার শ্রমিক। ছেলের উপার্জনেই তার সংসার চলত। ছেলে চাকরি হারানোয় ৫৭ বছর বয়সে আবারও রিকশা নিয়ে বের হতে হয়েছে তাকে।

রফিকুল বলছিলেন, “এখনো অপেক্ষায় আছি, কারখানা খুললে পোলায় আবার চাকরিতে ঢুকব। কিন্তু চালু হইব কিনা, তার কোনো ঠিক নাই।”

বাজার অন্যদের দখলে

এক দশক ধরে চাষাঢ়ায় যানবাহনের টায়ার বিক্রি করেন মো. ফিরোজ।

আগে গাজী টায়ারের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও এখন বাজারে এ কোম্পানির টায়ার না থাকায় মেঘনা, আরএফএল ও আকিজ কোম্পানির টায়ার বাজার দখল করেছে। তবে টায়ারের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে বলে জানান তিনি।

আরেক টায়ার বিক্রেতা জাহাঙ্গীর বলেন, “গাজীর টায়ারের চাহিদা লোকজনের কাছে বেশি ছিল। কারণ, তারা বাজারে তো বহু বছর ধইরা। কারখানা বন্ধ হওয়ার পরও যারা টায়ার ভালো চেনেন তারা গাজীরটাই খুঁজতেন।

“এখন তো সবার জানা যে, গাজীর কারখানা বন্ধ। তাই অন্য কোম্পানির কিনছে। আমার এখানে হোসাইন টায়ার, জিএস টায়ার ও যমুনা গ্রুপের ডাবল হর্স টায়ার বেশি চলে।”

কারখানা খোলার কী পরিকল্পনা

রূপসী ও কর্ণগোপে গাজীর দুটি কারখানায় ভেতরে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া যায়নি। বাইরে থেকে গাজী টায়ারস কারখানার মূল ছয়তলা ভবনটির পোড়া কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে দেখা যায়।

ভেতরের কয়েকটি টিন শেড এখনো অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি বহন করছে। একই পরিস্থিতি কর্ণগোপের গাজী পাইপস, ট্যাংকস ও পাম্পস কারখানাটিরও।

কারখানার কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও পাহারার জন্য দুই কারখানায় শতাধিক ব্যক্তি পালাক্রমে কাজ করছেন। তবে, কারখানা আবার চালু হবে কিনা, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেননি।

গাজী গ্রুপের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, দুই দফায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় রূপগঞ্জের এই দুই ব্লকে তাদের দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। দেশে টায়ারের প্রায় ৪০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতেন তারা। রূপসী ও কর্ণগোপের দুই ব্লকের কারখানায় বার্ষিক টার্নওভার ছিল ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। দেশের টায়ার, ট্যাংক ও পাম্প উৎপাদনে নেতৃত্বের পর্যায়ে ছিল গাজী।

কারখানাটি পুনরায় চালু করার ইচ্ছা থাকলেও ইন্সুরেন্সসহ কিছু বিষয়ে জটিলতা এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।

তার উপর গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান গোলাম দস্তগীর গত দুই বছর ধরে কারাগারে। তার স্ত্রী তারাব পৌরসভার সাবেক মেয়র হাসিনা গাজী, বড় ছেলেসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা আত্মগোপনে। ছোট ছেলে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

কুমিল্লায় টায়ার উৎপাদনের আরেকটি কারখানা স্থাপন করা হলেও সেটিও উৎপাদনে যেতে পারেনি বলে জানিয়েছে গাজী গ্রুপ।

গাজী গ্রুপের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা সরকারের নীতিগত সহযোগিতার আশ্বাস পেয়েছি। যেহেতু আমাদের ব্যাংকিং লেনদেনও বিগত সময়ে ভালো ছিল, তাই ব্যাংকগুলোও সহযোগিতা করছে। আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।”

আরও পড়ুন:

পুরানো খবর:

গাজী টায়ারসে আগুনে নিখোঁজ ১৮২: দুই বছর পর একটা ‘মৃত্যুসনদ’ চান স্বজনরা
গাজী টায়ারস: মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোক জড়ো, তারপর লুটপাট-আগুন