প্রকল্পের মেয়াদ ফুরালেও শেষ হয়নি গোপালগঞ্জ-টেকেরহাট সড়কের কাজ, দুর্ভোগ
২০২০ সালে ৫১২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। শেষ করার কথা ছিল ২০২২ সালের জুন মাসে
টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ-ঘোনাপাড়া সড়ক সম্প্রসারণ ও মেরামত প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময় পেরিয়ে পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি।
ইতোমধ্যে দুই দফা প্রকল্পের মেয়াদ ফুরিয়েছে। কিন্তু ৪৪ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার সড়কের কাজ শেষ হয়নি; এখনও বাকি রয়েছে ২৮০ মিটার অংশ।
জমি অধিগ্রহণের জটিলতা কাটাতে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, অধিগ্রহণ জটিলতা কেটেছে; প্রকল্পের মেয়াদ আবার বাড়ানো হলে সড়কের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা ও সাগরকন্যা কুয়াকাটাসহ দক্ষিণাঞ্চলগামী যানবাহন টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ-ঘোনাপাড়া সড়ক দিয়ে চলাচল করে। এ সড়কে যাতায়াতে ঢাকা থেকে খুলনার দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার কমে।
গোপালগঞ্জ সড়ক বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী অনুজ কুমার দে বলছেন, “টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ-ঘোনাপাড়া আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ কাজে ছয়টি প্যাকেজ ছিল। ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এটি বাস্তবায়ন করে। এর মধ্যে ২, ৩, ৪ ও ৬ নম্বর প্যাকেজের কাজ ২০২৫ সালের জুনে শেষ হয়।
“এখন ৫ নম্বর প্যাকেজের গোপালগঞ্জ শহর অংশের ৫ কিলোমিটার সড়কের সারফেজিংসহ অনুসঙ্গিক ফিনিশিং কাজ বাকি রয়েছে। এছাড়া ১ নম্বর প্যাকেজের মুকুসুদপুর উপজেলার জলিরপাড়ে সড়কের বাঁক সহজি করণের ২৮০ মিটার কাজ অসমাপ্ত রয়েছে।”
গোপালগঞ্জ সড়ক বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সড়কটি যাতায়াতের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তখন যাত্রীদের ভোগান্তি থেকে রক্ষা ও পণ্য পরিহনের সুবিধার সেটি মেরামত ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। এরপর ২০২০ সালে ৫১২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে আঞ্চলিক এ মহাসড়ক প্রকল্পের কাজ শুরু হয়; যার কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের জুন মাসে।
ওই বছর এ প্রকল্পের মাত্র ৫০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর ৪০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও মুকসুদপুর উপজেলার জলিরপাড়ে ২৮০ মিটার সড়ক এবং গোপালগঞ্জ শহর অংশের ৫ কিলোমিটির সড়কের অনেক কাজ বাকি রয়েছে।
এ অবস্থায় গোপালগঞ্জ সড়ক বিভাগ প্রকল্পের কাজ শেষ করতে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবনা সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে পাঠিয়েছে। ইতোমধ্যে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কারিগরি টিমের সদস্য প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
প্রকৌশলী অনুজ কুমার দে বলেন, “আশা করছি, প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর এ প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি পাবে। ওই মেয়াদের এ প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হবে।”
এদিকে এ বছরের ভারি বৃষ্টিতে টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ-ঘোনাপাড়া সড়কের সোল্ডার ও পানি নিস্কাশন ড্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে উঠে গেছে কার্পেটিং। এতে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন যাত্রী ও চালকরা।
গোপালগঞ্জ-টেকেহাট রুটের বাস চালক হাফিজুর মোল্লা বলেন, “এ বছরের প্রবল বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে রাস্তার সোল্ডার ও পানি নিস্কাশন ড্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও-কোথাও ভেঙে গেছে। আবার রাস্তার কার্পেটিং উঠে গেছে।
“রাস্তার অনেক স্থানে ছোট-ছোট গর্ত রয়েছে। বৃষ্টি হলেই রাস্তার ওপর পানি জমে; এটি রাস্তার জন্য ক্ষতিকর। এগুলো সংস্কার করা হলে রাস্তা আরো টেকসই হবে।”
ভ্যান চালক মো. আয়ূব আলী বলেন, “রাস্তার দুই পাশের বিভিন্ন যায়গা ভেঙে গেছে। সামন্য বৃষ্টি হলেই গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক ভাঙে। তাই এ রাস্তা টিকাতে ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।”
গোপালগঞ্জ শহরের পাচুড়িয়া এলাকার বাসিন্দা নাসির উদ্দিন, হাবিবুর রহমান সিরাজী ও আবুল হোসেন শেখ বলেন, গোপালগঞ্জ-টেকেরহাট-ঘোনাপাড়া সড়কের গোপালগঞ্জ শহর অংশের পুলিশ অফিসার্স মেস থেকে পাচুড়িয়া মসজিদ পর্যন্ত এক কিলোমিটারের অবস্থা নাজুক। এ অংশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রায়ই যাত্রীরা দুর্ঘটনার মুখে পড়ছেন।
এ সড়ক নির্মাণ কাজের ৫ নম্বর প্যাকেজের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘মীর হাবিবুর রহমান-এমএম বিল্ডার্স জেভির’ ম্যানেজার বিভূতি ভৌমিক বলেন, “আমরা শহরের ৫ কিলোমিটারের কাজ করছি। এটি নির্দিষ্ট সময়ের মেধ্যে শেষ করার সব প্রস্তুতি আমাদের ছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ, বিদ্যুতের খুঁটি অপসারণ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির সীমানা প্রাচীর সরানো এবং নির্মাণে জটিলতা ছিল।
“এগুলো একাধিক দপ্তর বাস্তাবায়ন করেছে। তাই সড়কের কাজে কালক্ষেপন হয়েছে। এ কারণে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে আমরা কাজ করতে পারিনি।”
তিনি বলেন, “তবে রাস্তার মূল কাজ আমার সম্পন্ন করেছি। এখন শুধু সারফেজিংসহ অনুসঙ্গিক ফিনিশিং কাজ বাকি রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে আমরা দ্রুত এসব কাজ করে দেব।”
গোপালগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শেখ নাবিল হোসেন বলেন, “এ বছর অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এতে টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ-ঘোনাপাড়া আঞ্চলিক মহাসড়ক বেশ কিছু স্থানে ভেঙে গেছে। সেসব স্থান ঠিকাদারদের দিয়ে মেরামত করে দেওয়া হবে।
“যেহেতু তাদের সিকিউরিটি মানি আছে, সে ক্ষেত্রে তারা তিন বছর পর্যন্ত রাস্তা মেরামত করে দেবে। পাশাপাশি রাস্তার ভাঙন প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।”
গোপালগঞ্জ সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সাদেকুল ইসলাম বলেন, জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতার কারণে জলিরপাড় অংশে ২৮০ মিটারের কাজ অসমাপ্ত রয়েছে। তবে অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিম্পত্তি হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এছাড়া শহরের বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বাড়ির জায়গার মধ্য দিয়ে রাস্তা নিতে হচ্ছে। এতে ওইসব প্রতিষ্ঠানের সীমানা দেওয়াল ভাঙা পড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়াল আবার নির্মাণ করে দিতে হয়েছে।”
এসব ছাড়াও আরও নানা জটিলতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এ আঞ্চলিক মহাসড়কের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান এ প্রকৌশলী।
