প্রকৃতি সংরক্ষণের প্রত্যয়ে জাবিতে বর্ণিল প্রজাপতি মেলা

মেলায় প্রজাপতি সম্পর্কে জানতে ও চিনতে শিশু-কিশোরদের পাহাড় সমান আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 Nov 2023, 03:13 PM
Updated : 24 Nov 2023, 03:13 PM

প্রজাপতি সংরক্ষণ ও গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে `উড়লে আকাশে প্রজাপতি, প্রকৃতি পায় নতুন গতি’- স্লোগানকে সামনে রেখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে প্রজাপতি মেলা।

শুক্রবার সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তনে ১৩তম প্রজাপতি মেলার উদ্বোধন করেন উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলম।

শহরের যান্ত্রিকতা, কোলাহল থেকে একটুখানি হাফ ছেড়ে বাঁচতে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব নিয়ে অনেকেই ছুটে এসেছেন দিনব্যাপী এই প্রজাপতি মেলায়। প্রকৃতির কোলে রং ছড়ানো পতঙ্গটির সৌন্দর্য উপভোগ দেখতে সকাল থেকেই মেলায় ভিড় জমান তারা।

সাভারের কাঠগড়া থেকে প্রজাপতি মেলা উপভোগ করতে এসেছেন হাসিনুর রহমান। সঙ্গে এসেছেন তার দুই ছেলে লাবীব ও রায়হান। ছেলেদের বিভিন্ন প্রকারের প্রজাপতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন তিনি।

হাসিনুর জানান, "ইট-পাথরের শহুরে জীবনে প্রজাপতির দেখা পাওয়া দুর্লভ। ফেসবুকে প্রজাপতি মেলার কথা জানতে পেরে ছেলেদের নিয়ে ছুটে এসেছি। তারাও পাপেট শো, গান, ছবি আঁকায় চমৎকার সময় পার করেছে।"

মেলায় এসে ভীষণ আনন্দিত লাবীব ও রায়হানও। রং-বেরঙের প্রজাপতি দেখতে তারা ছোটাছুটি করছে এদিক-সেদিক।

লাবীব ও রায়হানের মত এই মেলায় প্রজাপতি সম্পর্কে জানতে ও চিনতে শিশু-কিশোরদের পাহাড় সমান আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। হরেক রকমের প্রজাপতির ওড়াউড়ি তাদের মনে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে।

সাভার থেকে বাবার সঙ্গে মেলা দেখতে এসেছে ছোট ইনসিয়া। বিচিত্র রকমের প্রজাপতি দেখে সে খুবই খুশি। এছাড়াও ছবি আঁকা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পেরে এবং পাপেট শো দেখে খুবই উচ্ছ্বসিত সে। 

২০১০ সাল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যতিক্রমী প্রজাপতি মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মহামারির কারণে ২০২০ সালে বন্ধ ছিল মেলা।

এবার ১৩তম আসরে পরিবেশ সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলামকে ‘বাটারফ্লাই অ্যাওয়ার্ড- ২০২৩’ প্রদান করা হয়।

এছাড়া প্রজাপতি নিয়ে গবেষণা কর্মের জন্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী জহির রায়হানকে ‘বাটারফ্লাই ইয়াং ইনথুসিয়াস্ট অ্যাওয়ার্ড” দেওয়া হয়।

জহির রায়হান মিলনায়তনে নানা আয়োজনে আমন্ত্রিত অতিথিরা বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন।

এছাড়া মেলা উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজাপতি পার্ক ও গবেষণা কেন্দ্র জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল। দিনব্যাপী সেখানে জীবন্ত প্রজাপতি, প্রজাপতিবান্ধব বৃক্ষাদি ও প্রজাপতির প্রজনন ক্ষেত্রসহ উন্মুক্ত বাগান ঘুরে দেখেন দর্শনার্থীরা।

মেলার আহ্বায়ক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় ১১০ প্রজাতির প্রজাপতির দেখা মিলতো। কিন্তু ক্যাম্পাসে নগরায়ণের ফলে প্রজাপতি তার আবাসস্থল হারাচ্ছে। এখন ক্যাম্পাসে ৫৭ প্রজাতির প্রজাপতির দেখা মিলে।"

"আমরা বৃক্ষরোপণের ফলে হয়তো বড় বড় গাছ লাগাই, কিন্তু নিচের ঝোপঝাড় হচ্ছে প্রজাপতির আবাসস্থল। সেটা একবার নষ্ট হয়ে গেলে আর লাগানো হয় না। ফলে দিন দিন কমছে প্রজাপতির পরিমাণ। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই প্রাণ-প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠবে।"

এদিকে সকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলম বলেন, "প্রজাপতি মেলা সবার কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রজাপতি মেলায় প্রজাপতির আদলে যে সকল প্রদর্শনী হচ্ছে তা শিশুদের মনেও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।"

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় দুটি মাস্টারপ্ল্যান করার চেষ্টা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতি রক্ষায় একটা বায়োডাইভারসিটি প্ল্যান আরেকটি অ্যাকাডেমিক মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।”

উপাচার্য এসময় দর্শনার্থী, প্রজাপতি বিশেষজ্ঞসহ সকলকে ধন্যবাদ জানান ও প্রকৃতি সংরক্ষণে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

মেলায় দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্যে ছিল শিশু-কিশোরদের জন্য প্রজাপতি বিষয়ক ছবি আঁকা প্রতিযোগিতা, প্রজাপতি বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছবি চত্বরে আয়োজন করা হয় প্রজাপতির আলোকচিত্র প্রদর্শনী। এতে প্রজাপতির নির্বাচিত বেশ কয়েকটি ছবি স্থান পায়।

অন্যান্য আয়োজনের মধ্যে ছিল প্রজাপতির আদলে ঘুড়ি উড্ডয়ন, বারোয়ারি বিতর্ক প্রতিযোগিতা, প্রজাপতি চেনা প্রতিযোগিতা, প্রজাপতি বিষয়ক ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী, পুরস্কার বিতরণী।