Published : 13 Jan 2026, 12:59 PM
“এক বছর আগে মা লিভার নষ্ট হয়ে মারা গেছে। এখন সন্ত্রাসীদের হাতে বাবাকে হারাইয়া আমরা এতিম হইয়া গেলাম।” কথাগুলো শেষ করার আগেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বাসিন্দা মো. সাব্বির।
মা রাবেয়া বেগমের মৃত্যুর পর সাব্বির ও তার দুই ভাইয়ের জীবন কাটছিল বাবুর্চি বাবা রায়হান মোল্লাকে ঘিরে।
সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ফতুল্লার ইসদাইর রেললাইন এলাকায় রাস্তার ওপরে ৫০ বছর বয়সী এ বাবুর্চিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বাবার নির্মম মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ ২৩ বছর বয়সী সাব্বির।
রায়হান মোল্লা গরীর জামতলা এলাকার ‘হীরা কমিউনিটি সেন্টারে’ বাবুর্চির কাজ করতেন। তিন ছেলেকে নিয়ে ফতুল্লার তল্লা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।
অভিভাবকহীন হয়ে পড়া সাব্বিরের বাকি দুই ভাইও শোকে কাতর। নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যার হাসপাতালের লাশ ঘরের সামনে অঝরে চোখের পানি ফেলছিলেন তারা।
এই দিন ভাইয়ের বাবা রায়হান মোল্লা নারায়াণগঞ্জ নগরীর গলাচিপার প্রয়াত মেছের আলীর ছেলে। তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঘটনার বর্ণনায় ফতুল্লা মডেল থানার এসআই আবু রায়হান বলেন, “কয়েকজন ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র দিয়ে রায়হান মোল্লাকে রাস্তার উপর এলোপাতাড়ি কুপিয়ে চলে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে আসেন এবং সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।”

রায়হান মোল্লাকে কুপিয়ে জখম করার খবর তার সন্তানরা পান বেশ কিছুক্ষণ পর। শুনেই উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে যান ইসদাইর এলাকায়। কিন্তু সেখানে কাউকে না পেয়ে ছোটেন হাসপাতালের দিকে।
পরে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের লাশ ঘরে রায়হানের নিথর দেহ দেখতে পান বলে জানান তার আরেক ছেলে ফয়সাল।
হাসপাতালে পরিচিত একজনকে জড়িয়ে ধরে কান্নার করার সময় ফয়সাল বলছিলেন, “আমার বাপেরে মাইরা ফালাইছে। আমাদের আর কেউ রইলো না রে ভাই, আমাগো আর কেউ রইলো না।”
তিনি বলেন, “বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছে আগের রাতে। সকালে বাবা আগেই কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাওয়াতে কথা হয়নি। রাতে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার কথা ছিল। তাই তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে বাসায় আইছিলাম...।
“আমাদের আর কেউ থাকলো না ভাই। আমরা ভাইরা এতিম হইয়া গেলাম।”

নিহত বাবুর্চির ছেলেদের অভিযোগ, কয়েকদিন আগে চাষাঢ়া রেলস্টেশনে অস্থায়ী খাবারের দোকান দিতে চেয়েছিলেন তাদের বাবা। কিন্তু দোকান করতে গেলে রাজ্জাক নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি বাধা দেয়। দোকান দিতে হলে চাঁদা দিতে হবে বলে জানান।
ফয়সালের অভিযোগ, এ নিয়ে তর্কের জেরে রাজ্জাক তার বাবাকে ছুরিকাঘাত করেছে।
রাজ্জাককে মাদক ব্যবসায়ী দাবি করে তিনি বলেন, “তার অনেক লোকজন আছে, ওগুলাও মাদকসেবী। এই কারণে এইসব নিয়া আমরা আর বাড়াবাড়ি করি নাই। বাবারেও কইছি, এইটা নিয়া ওর সঙ্গে আর কথা না বলতে।”
তবে ওই শত্রুতার জেরেই রাজ্জাক তার লোকজন নিয়ে রায়হান মোল্লাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়েছে বলে সন্দেহ সাব্বিরের।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আব্দুল মান্নান বলেন, “ঘটনাটি পূর্ব শত্রুতার জেরে হয়েছে বলে ধারণা করছি। নিহতের পরিবারের লোকজন কয়েকজনের নাম বলছেন, বিষয়টি আমরা তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করে দেখবো।
“ঘটনাস্থল ও আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছি। জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করা হবে।”
এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হবে বলেও জানান এ পুলিশ কর্মকর্তা।