ডায়রিয়া, বমি, জ্বর, চর্মরোগ ও পেট ব্যথাসহ নানা উপসর্গের রোগীই বেশি বলে জানাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
Published : 16 Aug 2023, 09:44 PM
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর বান্দরবানের হাসপাতালে রোগীর ভিড় বাড়ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ; যাদের অধিকাংশই পানিবাহিত রোগ নিয়ে আসছেন।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে ও ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিৎসা দিতে বেগ পেতে হচ্ছে চিকিৎসক ও সেবিকাদের। বন্যায় ক্ষতি হওয়ার পর এমন অসুখ-বিসুখে ভোগান্তিতে পড়েছেন আক্রান্ত মানুষেরাও।
বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) এস এম আসাদুল্লাহ বলেন, “বন্যার পানি নেমে গেলে স্বাভাবিকভাবে পানিবাহিত নানান রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। তবে একটু সচেতন হলেই বন্যার পরবর্তী নানান উপসর্গ হতে মুক্তি পাওয়া যায়। রোগের উপসর্গ দেখা দিলে বিচলিত না হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
যারা চিকিৎসা নিতে আসছেন তাদের মধ্যে ডায়রিয়া, বমি, জ্বর, চর্ম রোগ ও পেট ব্যথাসহ নানা উপসর্গের রোগীই বেশি বলে জানাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
জেলায় ৬ অগাস্ট থেকে ভারি বৃষ্টিপাত শুরু হয়। এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত হয় নিম্নাঞ্চল। পানিবন্দি হয়ে পড়ে হাজারো পরিবার। সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে গোটা জেলা কার্যত কয়েকদিন বিচ্ছিন্ন ছিল সারাদেশের সঙ্গে।
৯ অগাস্ট থেকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে জনজীবন। এখনও জেলার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে রুমা ও থানচি উপজেলার। তার মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরবর্তী অসুখ-বিসুখ ছড়িয়ে পড়ছে।
বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, টিকেট কাউন্টার ও ওষুধ বিতরণ কক্ষের সামনে বিভিন্ন বয়সি মানুষের লাইন। বিনামূল্যে ওষুধ সংগ্রহ করতে এসে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে অনেকেই মাটিতে বসে পড়েছেন। চিকিৎসা সেবা প্রত্যাশীদের বেশিরভাগই নারী। শিশুদের নিয়ে আসা অনেক নারীকে বিরক্ত হতে দেখা গেছে।
বর্হিবিভাগে টিকেট বিক্রির দায়িত্বে থাকা মো. ওমর ফারুক বলেন, “আজ প্রচন্ড রোগীর ভিড়। জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ার রোগী থাকলেও চর্ম রোগীর সংখ্যাই বেশি। আজ টিকেট সংগ্রহ করেছেন ৩৩৩ জন। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ নারী। যাদের বয়স ২৫ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে।
এর আগে মঙ্গলবার ২৩১ জন, সোমবার ২১৩ জন ও রোববার ৩০৬ জন টিকেট সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানান ওমর ফারুক।
তবে এদের মধ্যে একটা অংশ বহির্বিভাগের প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি চলে যায় আর যাদের অবস্থা একটু জটিল তাদের ভর্তির জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়।
সদর হাসপাতালের আরএমও আসাদুল্লাহ জানান, মঙ্গলবার ভর্তি হয়েছিল ১০১ জন। তার মধ্যে পুরুষ ৩৮, নারী ৪২, শিশু ১৯ ও ডেঙ্গু রোগী দুজন। সোমবার রোগী ভর্তি হয়েছিল ৮৬ জন। তার মধ্যে ছিল ২৮ জন পুরুষ, ৩২ জন নারী, ২২ জন শিশু, তিনজন ডেঙ্গু রোগী এবং ম্যালেরিয়ার রোগী একজন।
শিশু ওয়ার্ডে চার মাসের সন্তানকে ভর্তি করিয়েছেন মা শারমিন আক্তার। তিনি বলছিলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর বাড়ির ভেতরের কাদামাটি পরিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু মেঝে স্যাঁতস্যাঁতে রয়ে গেছে। বাচ্চাটা হঠাৎ করেই পেটের সমস্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাই সোমবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এখানে ঠিকমত সেবা পাচ্ছেন বলেও জানালেন শারমিন।
শহরের ইসলামপুর ট্যাংকি পাহাড় এলাকার আসমা আক্তার বলেন, তিন মাস বয়সি মেয়ে হুমাইরা জান্নাতকে মঙ্গলবার শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করেছেন।
“নলকূপের পানি খাওয়ার পর থেকে বাচ্চার ডায়রিয়া ও বমি করতে থাকে। অবস্থা খারাপ দেখে হাসপাতালে ভর্তি করতে বাধ্য হয়েছি।”
হাসপাতালের ১৪ নম্বর বেডে ভর্তি আছেন শহরের মেম্বার পাড়া এলাকার রহিমা আক্তার (১৯)। সকালে তিনি ভর্তি হয়েছেন জ্বর, বমি ও কাশি নিয়ে।
জ্বর, মাথাব্যথা নিয়ে সোমবার ভর্তি হয়েছেন রোয়াংছড়ি ছাইংগা দানেশ পাড়া এলাকার রোকেয়া বেগম (৫৫)।
বান্দরবান সরকারি কলেজের ছাত্র আবুল কাশেম হালকা পেট ব্যাথা ও জ্বর নিয়ে বহির্বিভাগে এসেছেন চিকিৎসা নিতে।
হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ নার্স মঞ্জু রাণী চাকমা বলেন, “বন্যার আগে ডেঙ্গু রোগী থাকলেও এত চাপ ছিল না। বন্যার পরে এখন প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ছে। বহির্বিভাগেও রোগীদের ভিড় লেগেই আছে। প্রতিদিন নতুন রোগী এসে ভর্তি হচ্ছে। তারপরও আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে সবাইকে সেবা দিয়ে যাচ্ছি।”
এবারের বন্যায় জেলায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে লামা উপজেলা। সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাটসহ সবকিছু বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিও কয়েকদিন ডুবে ছিল। বন্যার ধকল কাটিয়ে সেবা দিতে শুরু করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ।
লামা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) মহিউদ্দিন মোরশেদ বলেন, “বন্যায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারপরও আমরা বন্যা দুর্গত মানুষদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ছে। জ্বর, ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি, শরীরে চর্মরোগ নিয়ে হাসপাতালে আসছেন রোগীরা।”
রোয়াংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মংহ্লা প্রু মারমা বলেন, “রাস্তাঘাটে কাদামাটি ছিল। পাহাড় ধসে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
“চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু হওয়ার পর থেকে রোগী বাড়তে শুরু করেছে। রোগীদের সেবা প্রদানে কোন ধরনের অবহেলা যাতে না হয় সেজন্য সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
এদিকে এখনও শহরের বনানী স মিল এলাকার বাসিন্দারা বিদ্যুৎ সংযোগ পাননি বলে জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ আমির হোসেন বলেন, “শহরের ৯০ ভাগ এলাকায় বিদ্যুৎ দিতে পেরেছি। দুয়েকদিনের মধ্যে শহরের শতভাগ বিদ্যুৎ চালু হবে।
“রোয়াংছড়িতে মঙ্গলবার বিদ্যুৎ চালু করা গেছে। থানচি ও রুমার সড়ক এখনও বিচ্ছিন্ন আছে। সড়ক মেরামত হয়ে গেলে সেখানেও দ্রুত বিদ্যুৎ চালু করা হবে।”