১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

‘দুইটা ছাওয়াক ধরি কীভাবে খাব?’ গুলিবিদ্ধ শাহীনের স্ত্রীর দুশ্চিন্তা

নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে উরুতে গুলি নিয়ে শাহীন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

‘দুইটা ছাওয়াক ধরি কীভাবে খাব?’ গুলিবিদ্ধ শাহীনের স্ত্রীর দুশ্চিন্তা
নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে কাজে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ শাহীন আলম রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

রংপুর প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 04 Sep 2025, 04:56 PM

Updated : 26 Aug 2026, 02:14 PM

নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে কাজে যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন শাহীন আলম।

সার্জারি বিভাগের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি গুলিবিদ্ধ স্বামীর শয্যার পাশে বসে আছেন জেসমি আকতার। দুই শিশুসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার চোখেমুখে অন্ধকারে চাপ। তাদের কি খাওয়াবেন কীভাবে মানুষ করবেন এ নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই জেসমিনের।

বৃহস্পতিবার সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় শাহীনের স্ত্রী জেসমি আকতারের সঙ্গে।

ঘটনার দিনের বর্ণনা জানতে চাইলে জেসমিন বলেন, “সকালে বাড়ি থাকি ইপিজেডের কোম্পানিতে কাজে যাওয়ার পথে তার (শাহীন) গুলি লাগছে। গুলি লাগি পড়ি গেইছে। পরে নীলফামারী মেডিকেল নিগাইছে। ওটে থাকি অমপুর পাঠাইছে।

“এ্যালা এখানে হামারে স্বামীর চিকিৎসা চলোছে। এ্যালা আমি কি করে দুইটা ছাওয়াক ধরি কীভাবে খাব? চাকরি করে, ওই টাকা দিয়া ছাওয়া ছোটক ধরি চলি। এখন আমরা কীভাবে খাব ছাওয়া দুটাক ধরি?”

গুলিবিদ্ধ শাহীন আলম নীলফামারীর চংড়া কিসামতডাঙ্গী তেলিপাড়া গ্রামের দিনমজুর রজব আলীর ছেলে। তিনি নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডে দেশবন্ধু পোশাক কারখানার শ্রমিক।

প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার কাজে গেলে এভারগ্রিন কোম্পানির শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হন শাহীন।

একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে হাবিব ইসলাম (২০) নামের এক শ্রমিক নিহত হন। তিনি ইকু ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি নিটিং কারখানার শ্রমিক ছিলেন। হাবিব নীলফামারী সদর উপজেলার সংগলশী ইউনিয়ের কাজীরহাট গ্রামের দুলাল হোসেনের ছেলে।

এ ঘটনায় আহত হয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন ম্যাজেন বিডি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শ্রমিক শামীম হোসেনও।

শামীমের ভাই ইমরান বলেন, তার ভাইয়ের বাম পায়ের মাংসপেশি ভেদ করে গুলি বেরিয়ে গেছে। শামীম হোসেনের বাড়ি নীলফামারীর সোনারায়। তিনিও কারখানায় যাওয়ার পথে গুলিবিদ্ধ হন।

ঘটনার দিন কি হয়েছিল জানতে চাইলে শাহীন আলম বলেন, “তখন অফিস টাইম, গেইটে গেছি, যাইতে দিবে না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক সময় কথা-কাটাকাটি হয়। এর মধ্যে ঢিল ছোড়াছুড়ি শুরু হয়া গেইছে। ইটপাটকেল মারতে মারতে সেনাবাহিনী গুলি ছুড়ছে। 

“গুলি ছোড়ার পর পাশে বন্ধু ছিল; ওরে গুলি লাগছে। পাশে আরেকজন ছিল তাঁর বুকে গুলি লাগছে, মারা গেইছে। আমার উরুতে গুলি লাগছে। অপারেশন হইছে; এখনো গুলি বের করার পারে নাই। যতবার অপারেশন করোছে, ততবার আলট্রাসনোগ্রাম, এক্সরে ডাবল করা লাগছে। এখনো গুলি আটকা, ব্যথায় শরীর খারাপ।”

শাহীনের বাবা রজব আলী বলেন, “আমার জমিজমা নাই। দুই ছেলে, শাহীন ইপিজেড করে বউ-ছাওয়া নিয়া আলাদা খায়। যে টাকা পায় তাকে দিয়া কোনো রকম পরিবার চলে। এখন গুলি খায়া হাসপাতালোত, ওর সংসার কায় চালাইবে? ছোট ছাওয়া দুইটাক কায় দেখবে?”

কারখানা বন্ধের পর উত্তরা ইপিজেডে সংঘর্ষশ্রমিক নিহত

তিনি বলেন, ঘটনার দিন আহত হয়ে তিনজন শ্রমিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এর মধ্যে নুরনবী রাতেই চলে গেছেন। আর শাহীন আলম ও শামীম হোসেনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। 

একই ঘটনায় আহত পুলিশের এসআই ফয়জুল রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন।

মঙ্গলবার নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডের এভারগ্রিন কোম্পানির কারখানা বন্ধ ও ছাঁটাইয়ের প্রতিবাদে শ্রমিকেরা ২৩ দফা দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষ হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান হাবিব। আহত হন আরও অন্তত ১০ শ্রমিক।