১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

নারায়ণগঞ্জে ডাকাত সন্দেহে ৮ জনকে পিটিয়ে হত্যা

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে একটি চালের আড়তে ‘ডাকাতি চেষ্টার পর’ আটজনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে জনতা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 14 Dec 2015, 05:22 PM

Updated : 12 Oct 2022, 04:41 PM

বৃহস্পতিবার ভোরে উপজেলার পুরিন্দা বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে সহকারী পুলিশ সুপার মো. জহিরুল ইসলাম জানান।

তিনি বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠিয়েছে। তাদের মধ্যে একজনকে থানায় নেওয়া হয়েছে।  

নিহতদের মধ্যে চারজনের পরিচয় জানা গেছে। এরা হলেন ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার আলমপুর গ্রামের ওবায়দুল হকের ছেলে রনি ওরফে গঠন (৪০), ময়মনসিংহ শহরের কোতোয়ালি থানার মধ্য বাড়েবা আকুয়ার রোবেল (২৫), টিটু (৩০) ও শওকত (৩২)।

আহতরা হলেন ময়মনসিংহ শহরের কোতোয়ালি থানার মিলন মিয়ার ছেলে সাব্বির (২৫), ছানা মিয়ার ছেলে সজিব (২৬), লতিফের ছেলে মানিক (৩২) এবং চাঁদপুর সদরের ওছমান মিয়ার ছেলে লোকমান (২৮)।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে এএসপি বলেন, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ‘একদল ডাকাত’ পুরিন্দাবাজারের দুই নৈশপ্রহরীকে বেঁধে ফেলে ব্যবসায়ী এম এ গফুর ভূঁইয়ার ‘ভাই ভাই স্টোরের’ তালা ভেঙে চালের বস্তা ট্রাকে তুলতে থাকে।

“এক পর্যায়ে এক নৈশ প্রহরী পালিয়ে স্থানীয়দের খবর দিলে এলাকার লোকজন পুরিন্দা বাজার জামে মসজিদের মাইকে ডাকাত পড়ার ঘোষণা দেয়। তখন জনতা এগিয়ে এসে ডাকাতদের ঘিরে ফেলে এবং তাদের পিটুনিতে ঘটনাস্থলেই আটজনের মৃত্যু হয়।”

বাজারের নিরাপত্তা প্রহরী জামান জানান, ভোর সাড়ে ৪টার দিকে একটি ট্রাকে করে এসে কয়েকজন বলে,  ভাই ভাই দোকানের চাল এসেছে, তাদের সাহায্য করতে হবে।

এক পর্যায়ে ডাকাতরা গলার মাফলার ও রশি দিয়ে তাকে এবং আরেক নিরাপত্তা প্রহরী মোতালেবকে বেঁধে ফেলে এবং আড়তের তালা ভেঙে ট্রাকে চাল তোলা শুরু করে।  

পরে ‘কৌশলে’ হাত-পায়ের বাঁধন খুলে জামানই এলাকাবাসীকে খবর দেন।

মোতালেব বলেন, “আমার লগের গার্ড ছুইট্টা গিয়া জনগণরে খবর দিছে। হেরাই আমারে পরে ছুটাইছে।”

‘ডাকাতরা’ ততক্ষণে প্রায় দেড়শ বস্তা চাল ট্রাকে তুলে ফেলেছিল বলে জানান তিনি।

সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই আড়তের পাশেই কাচ ভাঙা অবস্থায় অর্ধেক বোঝাই ট্রাকটি দাঁড় করিয়ে রাখা অবস্থায় দেখা যায়।

ডাকাতি ও গণপিটুনির খবর পেয়ে সকালে আশেপাশের এলাকা থেকে বহু মানুষ ওই আড়ত ও আশেপাশে ভিড় করে।

স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, জনতা ধাওয়া দিলে তিন ‘ডাকাত’ বাজারের পাশের পুকুরে পড়ে যায়। সেখান থেকে তুলে তাদের পিটিয়ে মারা হয়। বাকিরা বাজারের পাশে ও কাছের একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলের সামনে গণপিটুনির শিকার হয়।

আরও লাশ আশপাশের ডোবায় পড়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন কেউ কেউ। তবে ‘ডাকাতরা’ ঠিক কতজন ছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। 

আড়ত মালিক গফুর বলেন, “ভোর সাড়ে ৫টার দিকে আমারে ফোন দিয়া কইল দোকানের তালা ভাইঙ্গা ডাকাতি হইতেছে। আমি নামাজ পইড়া আইসা দেখি এই অবস্থা।”

কিছুদিন আগে মাইলখানেক দূরে তার মামার দোকানেও এভাবে ডাকাতি হয়েছিল বলে জানান গফুর।

“তখন লোকজন আমারেও সাবধান হইতে বলছিল। কিন্তু আমি গুরুত্ব দেই নাই।”

ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে আড়ত লুটের চেষ্টা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এইটা ডাকাতি। আমার তেমন কোনো শত্রু তো নাই।”

সহকারী পুলিশ সুপার মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, বিকাল ৩টার দিকে আড়াইহাজার থানায় গিয়ে রনির লাশ শনাক্ত করেন তার স্ত্রী নাজমা বেগম।

নাজমার বরাত দিয়ে তিনি জানান, রনি পরিবার নিয়ে ঢাকার শনির আখড়া এলাকায় ভাড়া থাকতেন। তিনি যাত্রাবাড়িতে ৯ নম্বর বাসে কন্ডাকটরের কাজ করতেন। সে বুধবার রাতে কাজের কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে যান। তাদের সাদিয়া নামে (৮) একটি মেয়ে রয়েছে।

আটক লোকমানকে জিজ্ঞাসাবাদের পর এএসপি জহিরুল জানান, রাত ২টার দিকে ঢাকার তেজগাঁও থেকে তারা ১৫/১৬ জন ও পরে যাত্রাবাড়ি থেকে আরও ১৪/১৫ জনসহ ৩০/৩৫ জন ট্রাকে (ঢাকা মেট্রো ট-১৮-৪৩১১ নম্বর) করে ভোর রাতে পুরিন্দা বাজারে ডাকাতি করতে যায়।

এএসপি জহিরুল ইসলাম জানান, থানায় সুরতহাল করে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ‘ডাকাতি’ কাজে ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্র ও ট্রাকটি জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ হেফাজতে থাকা ‘ডাকাতদের’ জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই ঘটনায় আড়াইহাজার থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। 

“আটক সন্দেহভাজন ডাকাত সদস্য আমাদের বলেছে, তারা পেশাদার ডাকাত। ময়মনসিংহ এলাকায় ডাকাতি করে। ওই ট্রাক তারা এনেছে ঢাকা থেকে।”

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন জানান, ১৫ থেকে ২০ জনের সংঘবদ্ধ ‘ডাকাত’ দল পুরিন্দাবাজারে একটি চালের আড়তে ‘ডাকাতি’ করতে ট্রাক নিয়ে এসেছিল। বিক্ষুদ্ধ জনতার পিটুনিতে আট ‘ডাকাত’ নিহত হয়েছে।

এ পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে তাদের বাড়ি চাঁদপুর, ময়মনসিংহ ও ফেনী অঞ্চলে। তবে আড়াইহাজারের কেউ কেউ এই গ্রুপে থাকতে পারে। ‘ডাকাতদের’ দল নেতার বাড়ি ময়মনসিংহ অঞ্চলে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ঢাকার তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে ‘ডাকাতদের’ কেউ ট্রাকটি ভাড়া করে। পথে সায়েদাবাদ থেকে অপর ‘ডাকাতরা’ ট্রাকে ওঠে। ট্রাকের মধ্যে ত্রিপল পেঁচিয়ে শুয়ে তারা আড়াইহাজারে আসে যাতে মহাসড়কের পুলিশের চেকেপোস্টে কারো নজরে না পড়ে।