Published : 24 Jul 2026, 02:56 PM
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং ক্যানটিন কর্মীর বিরুদ্ধে ছাত্রীদের ওয়াশরুমের ভিডিও ধারণের অভিযোগের বিচার দাবিতে একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
একই সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে দাবিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নের আশ্বাস না পাওয়ার অভিযোগ তুলে এ সিদ্ধান্ত নেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ’২৪ হলের গণরুম-সংলগ্ন ওয়াশরুমের ভেন্টিলেটরের ফাঁক দিয়ে মোবাইলের মাধ্যমে এক ছাত্রীর ভিডিও ধারণের চেষ্টা করা হয়। বিষয়টি টের পেয়ে ওই ছাত্রী আতঙ্কিত হয়ে সহপাঠীদের জানান। খবর ছড়িয়ে পড়লে হলের বিভিন্ন ব্লকের আবাসিক শিক্ষার্থীরা ঘটনাস্থলে জড়ো হন।
বিষয়টি নিরাপত্তাকর্মীদের জানালে হলের ক্যান্টিনে কর্মরত ইমাম হাসানকে আটক করা হয়। পরে তাকে মারধর করেন শিক্ষার্থীরা।
ইমাম হাসানকে আটকের পর তার স্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে ‘মারমুখী আচরণ’ করেন এবং ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ কারণে তাকেও আটক করা হয়। পরে হল প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে এবং পুলিশকে খবর দেয়।
এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ক্যাম্পাসে সার্বিক নিরাপত্তার দাবিতে বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জন করে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে ক্যাম্পাসেও মানববন্ধন করে তারা।
এছাড়া যৌন হয়রানির অভিযোগে দুই শিক্ষক ও ক্যানটিন কর্মীর বিচার না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা।
বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রশাসনিক কার্যালয়ে তালা দেওয়ায় বেলা আড়াইটা পর্যন্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি।
পরে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে তাদের বৈঠক হয়। কিন্তু বৈঠকে দাবিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নের আশ্বাস না পাওয়ার অভিযোগ তুলে রাতে একাডেমিক ভবনের পাশাপাশি প্রশাসনিক ভবনেও নতুন করে তালা ঝুলিয়ে দেন তারা।
এ বিষয়ে শুক্রবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক মো. নুরুন্নবী বলেন, “বৃহস্পতিবার ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাধিক জরুরি বৈঠক করে।
“এসব বৈঠকে উপাচার্য অধ্যাপকমো. রেজাউল করিম, বিভিন্ন স্কুলের ডিন, রেজিস্ট্রার, ডিসিপ্লিন প্রধান, আবাসিক হলগুলোর প্রভোস্ট, ছাত্রবিষয়ক পরিচালক ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।”
তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি তুলে ধরেন বলে জানা গেছে। দাবিগুলো হল- বিজয় ’২৪ হলের ছাত্রীদের ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ক্যানটিন কর্মী ইমাম হাসানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্টকে জবাবদিহির আওতায় আনা, যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছার ও অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামকে দ্রুত স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা এবং সম্প্রতি গঠিত ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করা।
শিক্ষার্থীদের দাবি, ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবটি গঠনের প্রক্রিয়া ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রশাসন আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো দাবিই মেনে নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে ‘সময়ক্ষেপণ’ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
এ কারণে দাবিগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপের নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।
এর আগে গত ১৮ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে মেসেঞ্জারে অশালীন বার্তা পাঠানো ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার পর তাকে ডিসিপ্লিন প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের’ গঠিত সাত সদস্যের কমিটি অভিযোগের তদন্ত করছে।
এছাড়া গত বছরের অগাস্টে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে দুই ছাত্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। তদন্ত শেষে গত ২৮ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় একটি অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে অন্য আরেকটি অভিযোগে তাকে দুই বছরের জন্য পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণসহ সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বুধবার রাতে বিজয় ’২৪ হলের ছাত্রীদের শৌচাগার ও গোসলখানায় গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে নিরাপত্তা ও যৌন হয়রানির অভিযোগগুলোর বিচার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
এদিকে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দিনভর একাধিক জরুরি সভা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সভায় অভিযুক্ত ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসান ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে হরিণটানা থানায় মামলা করার বিষয়টি জানানো হয় সেখানে।
একই সঙ্গে ঘটনার তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন, অভিযোগের মুখে থাকা ব্যক্তির পরিচালিত ক্যানটিনের বরাদ্দ বাতিল, হলের ভেতর কর্মচারীদের মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ, অপরাজিতা ও বিজয় ’২৪ ছাত্রী হলে পুরুষ কর্মী নিয়োগ না দেওয়া এবং ক্যানটিন পরিচালনায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্তের কথাও ওই বিজ্ঞাপ্তিতে জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে রিভিউ আবেদন পাওয়া গেলে পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এছাড়া অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের সাময়িক বরখাস্ত শিক্ষক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান দুটি তদন্ত কমিটিকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
পাশাপাশি চলতি টার্মের নিবন্ধনের সময় ৪ অগাস্ট পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া এবং ১১ অগাস্ট পর্যন্ত জরিমানাসহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক মো. নুরুন্নবী বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এস এম মাহবুবুর রহমান বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার ক্যানটিন কর্মী ইমাম হাসান ও তার স্ত্রী রুপা মণির বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে হরিণটানা থানায় মামলা করেছেন। মামলার পর আদালত ইমাম হাসানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।”
আগের সংবাদ
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলের ওয়াশরুমে ভিডিও ধারণ, উত্তাল ক্য