০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

লেবাননে ড্রোন হামলা: করিমের আশা ছিল যুদ্ধ থামবে, কিন্তু থামল তার জীবন

নরসিংদীর শিবপুরের করিম ১২ বছর ধরে লেবাননে বসবাস করতেন।

বিডিনিউজ২৪

আসাদুজ্জামান রিপন. নরসিংদী প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 14 May 2026, 01:37 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:36 PM

পরিবারের অভাব ঘুচাতে এক যুগ আগে লেবাননে গিয়েছিলেন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার করিম মিয়া। ভালই চলছিল তার জীবন-সংসার। কিন্তু ইসরায়েলের ইরান আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে গোটা পশ্চিম এশিয়া অশান্ত হয়ে উঠলে তার ঢেউ লেবাননেও লাগে। ইরানের পাশাপাশি ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননেও হামলা শুরু করে। 

আর তখন থেকেই মধ্য বয়সি করিমের মেজাজ খারাপ হতে থাকে। পরিবারের সঙ্গে কথা হলেই নিজের দুশ্চিন্তার কথা বলতেন। সবশেষ শনিবার রাতে যখন কথা হয়েছিল, তখন তিনি পরিবারকে বলেছিলেন, হয়ত সপ্তাহ খানেকের মধ্যে যুদ্ধ হয়ে যাবে। 

কিন্তু তার আগে সোমবার রাতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়ের মাইফাদুন এলাকায় আবাসস্থলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, সেই হামলাতেই জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে করিমের। 

লেবাননের বৈরুতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রধান সচিব (শ্রম) আনোয়ার হোসেন মঙ্গলবার এক বার্তায় জানিয়েছেন, তারা বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে দুই বাংলাদেশি মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পেরেছেন। 

তবে যেহেতু, সেখানে যারা মারা গেছেন তাদের কারও মরদেহ শনাক্ত করা যায়নি। এ কারণে দূতাবাস মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। তারা স্থানীয়ভাবে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। 

নরসিংদীর করিমের সঙ্গে বার্তায় সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার শুভ কুমার দাসের মৃত্যুর বিষয়টিও বৈরুদের দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছে। করিমের মত শুভর মৃতদেহও শনাক্ত করা যায়নি। 

এর আগে দূতাবাস থেকে শুভ ও করিমের নিখোঁজ থাকার বিষয়টি জানানো হয়েছিল। পরে মঙ্গলবার রাতে দুজনই পরিবারই তাদের মৃত্যুর বিষয়টি জানতে পারে।  

পশ্চিম এশিয়াজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ১০ বাংলাদেশি নাগরিক বিভিন্ন দেশে প্রাণ হারানোর কথা জানা গিয়েছে। এর মধ্যে লেবাননেই এক নারীসহ পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া সংযুক্ত আবর আমিরাত ও সৌদি আরবে দুজন করে এবং বাহারাইনে একজন নিহত হয়েছেন।

‘বউ, যুদ্ধ থামবো, টেনশন কইরো না’

করিম মিয়া শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের হরনখোলা গ্রামের কাজম আলী ও ময়না বেগম দম্পতির দ্বিতীয় ছেলে। তিনি লেবাননে একটি মুদির দোকানে চাকরি করতেন।

বাড়িতে মা, ভাইবোন ছাড়াও তার স্ত্রী শরিফা বেগম, ১৩ বছরের ছেলে রাহিম মিয়া এবং দেড় বছরের মেয়ে নুসরাত বেগম রয়েছে।

প্রায় প্রতিদিনই পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন করিম। শনিবার রাতেও স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয় করিমের। তারপর রোববার রাতে বেশ খানিকটা সময় নিয়ে কথা বলেন দুজন।   

শরিফা বেগম বলছিলেন, “আমাকে বলছিলেন, ওখানে খুব যুদ্ধ চলার কারণে উনার মন-মেজাজ খুব একটা ভাল না। যুদ্ধের কারণে উনি খুব দুশ্চিন্তায় ছিলেন। আমি ওনারে বারবার কইছি, সাবধানে থাকতে। 

“তখন উনি আমারে সান্ত্বনা দিয়া কইলেন, ‘বউ, এক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ থামব, তুমি টেনশন কইরো না।’ যুদ্ধ থেমে যাবে জানিয়ে তিনি নিজেই চিরতরে থেমে গেলেন।

“এখন আমাদের কী হবে? আমরা শেষবারের মতো তার মুখটা দেখতে চাই, সরকার যেন লাশটা এনে দেয়।”

করিমের মৃত্যুর সংবাদ আসার পর পরিবার শুধু নয়, পুরো গ্রামজুড়েই শোক ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের স্বজন, প্রতিবেশী, শুভাকাঙ্ক্ষী সবাই ছুটে আসেন। যারা সান্ত্বনা দিতে এসেছেন তাদের চোখেও পানি।  

ছেলের শোকে মঙ্গলবার রাত থেকে কান্নাকাটি করতে করতে বৃদ্ধা ময়না বেগম এখন অনেকটা বাকরুদ্ধ।  

করিম মিয়ার স্ত্রী বলেন, “উনি আমারে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘বউ, ঈদুল আজহা কত তারিখে?’ আমি কইলাম, ‘২৭ বা ২৮ তারিখে হবে।’ এরপর উনি রান্না করতে গেলেন। বললেন, ‘মাছ রান্না করতাছি, তোমার সাথে কথা শেষ করেই খামু।’ এটাই ছিল ওনার সাথে আমার শেষ কথা। 

“সোমবার সকালে আমি যখন রান্নাবান্না করতাছি, তখন ওনার ওখান থেকে একজন ফোন দিয়া আমারে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি করিমের কে হন?’ আমি কইলাম, ‘আমি ওনার বউ।’ তখন উনি আমারে কইলেন, ‘আপনার স্বামী তো আর এই দুনিয়ায় নাই, উনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।’”

লাশ ফেরত আনার আকুতি

ড্রোন হামলায় নিহত করিমের লাশ শনাক্ত করতে না পারার কথা জানিয়েছে বৈরুত দূতাবাস। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে লাশ ফিরিয়ে আনার আকুতি জানানো হয়েছে।  

করিমের স্ত্রী শরিফা বেগম সরকারের কাছে আকুতি জানিয়ে বলেন, “আমার স্বামী তো আর ফিরবে না। কিন্তু উনার মৃতদেহটা যেন একবার দেখতে পারি। সরকারের কাছে আমার একটাই অনুরোধ, যেভাবেই হোক উনার লাশটা যেন দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয়। উনার মা, সন্তানসহ আমরা সবাই যেন উনারে শেষবারের মত একবার দেখতে পারি। এইটুকুই আমাদের চাওয়া।”

নিহতের বড় ভাই শরিফ মিয়া বলেন, পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে প্রায় ১২ বছর আগে লেবাননে পাড়ি জমিয়েছিলেন ভাই করিম। তার আয়ের ওপরই নির্ভরশীল ছিল পরিবার। 

তিনি বলেন, “সেখানে বসবাসরত পরিচিত প্রবাসীদের মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর জানতে পেরেছি। মরদেহ কোথায় আছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।” 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ইয়াছমিন বলেন, “করিম মিয়া নিহতের বিষয়টি এখনও সরকারিভাবে আমার জানা নেই। পরিবারের পক্ষ থেকেও কেউ অবহিত করেননি।”

এ বিষয়ে জানতে নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়ার মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। 

আরও পড়ুন:

ইসরায়েলি হামলা: লেবাননে আরও ২ বাংলাদেশি নিখোঁজ, সরকারের নিন্দা

ঋণ করে লেবাননে শফিকুল-নাহিদুল, ইসরায়েলি ড্রোনে 'স্বপ্ন' শেষ

ইসরায়েলি হামলা: লেবাননে আরও ২ বাংলাদেশি নিখোঁজ, সরকারের নিন্দা

লেবাননে ড্রোন হামলায় সাতক্ষীরার আরেক যুবক নিহত, মৃত্যু বেড়ে ৩