Published : 13 Jan 2025, 10:06 PM
ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে ছাত্রাবাসের সিট বরাদ্দ নিয়ে ছাত্রদল ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন হয়েছে।
সংঘর্ষের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছেন আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমান উল্লাহ।
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় কলেজের পল্লীকবি জসীমউদ্দীন হলের সামনে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করেন।
এ সময় তারা জানান, সামনে তাদের পরীক্ষা, তাই হল ছাড়বেন না। এ ছাড়া হল ছেড়ে গেলে হামলাকারীরা দখল করবে।
এদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আনন্দ মোহন ছাত্রদলের পক্ষ থেকেও পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করা হয়।
এ সময় কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা জানান, শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদ করায় ছাত্রদল অপপ্রচারের শিকার হয়েছে। ছাত্রাবাসে অবৈধ সিট দখলকারী, নিষিদ্ধ ও গুপ্ত সংগঠনের অনুসারীরা এর সঙ্গে জড়িত।
কয়েক দিন ধরে আনন্দ মোহন কলেজে ছাত্রাবাসের সিট বরাদ্দ নিয়ে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিরোধ দেখা দেয়।
এ নিয়ে রোববার বিকালে ও সন্ধ্যায় হলে অবস্থান করা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে দুই পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কলেজ এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।
এ ঘটনায় ছেলেদের পল্লীকবি জসীমউদ্দীন হল, কবি নজরুল হল ও ভাষাসৈনিক আহমেদ মালেক হল বন্ধ ঘোষণা করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। সোমবার সকাল ৮টার মধ্যে ছেলেদের ছাত্রাবাস ত্যাগের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে আগামী তিন দিন কলেজে একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের সংবাদ সম্মেলন
সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় পল্লীকবি জসীমউদ্দীন হলের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন শিক্ষার্থীরা। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী আকরাম হোসেন।
তিনি বলেন, “আনন্দ মোহন কলেজ হোস্টেলে অবস্থানকারী ছাত্রদের পক্ষ থেকে আজকের এই বার্তা প্রদান করছি। আমরা ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পতনের পর থেকে শান্তিপূর্ণভাবে কলেজ হোস্টেলে অবস্থান করছি। ২০২৫ সালের সিট নবায়নসংক্রান্ত সৃষ্ট জটিলতায় আমরা আক্রান্ত হয়ে হলে অবস্থান করছি।
“এমন পরিস্থিতিতে কলেজ কর্তৃপক্ষের হল বন্ধ ঘোষণা সংক্রান্ত নোটিশ আমরা মানি না। কারণ, ২০২১-২২ সেশনের (দ্বিতীয় বর্ষ) ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। হল কর্তৃপক্ষের এই অযৌক্তিক দাবি মানি না। মাস্টার্স ২০২১-২২ সেশনের পরীক্ষা শুরু হবে ২৭ জানুয়ারি।
“এ অবস্থায় হল বন্ধের দাবি মানা সম্ভব নয়। আমরা আশঙ্কা করছি যে, হল বন্ধ থাকা অবস্থায় হামলাকারীরা হল দখল করবে, তাই আমরা হল ছাড়ব না।”
রোববারের হামলায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান আকরাম হোসেন।
তবে শিক্ষকদের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে বেলা আড়াইটার দিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা হল ছেড়ে চলে যান।
‘অপপ্রচারের’ বিরুদ্ধে ছাত্রদলের সংবাদ সম্মেলন
হলে সিট দখল নিয়ে ওঠা অভিযোগ ও হামলার ঘটনাকে ‘অপপ্রচার’ দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেছে কলেজ শাখা ছাত্রদল।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আনন্দ মোহন কলেজের প্রথম ফটকের সামনে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ছাত্রদল নেতা আশিক রাব্বি। এ সময় ময়মনসিংহ মহানগর ছাত্রদল ও আনন্দ মোহন কলেজ শাখা ছাত্রদলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে আশিক রাব্বি বলেন, “রোববার শিক্ষক লাঞ্ছনার প্রতিবাদ করায় ছাত্রদল অপপ্রচারের শিকার হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে হলের সিট নবায়নকে কেন্দ্র করে কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী ও ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো সিট নবায়নের ক্ষেত্রে চারটি যৌক্তিক দাবি জানিয়েছিল।
“এর মধ্যে ছিল- হলে মেয়াদোত্তীর্ণ কোনও শিক্ষার্থী থাকতে পারবেন না। অবৈধ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের চিহ্নিতদের বের করতে হবে। হলে ৫ অগাস্টের পর যারা অবৈধভাবে উঠেছেন, তাদের নবায়ন করা যাবে না এবং নবায়ন ফি পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা করতে হবে।”
রোববারের ঘটনার পর কলেজ প্রশাসন থেকে ঘোষণা দেওয়া সকাল ৮টার মধ্যে হল বন্ধের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আশিক রাব্বি বলেন, “দ্রুততম সময়ে হল বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হবে এবং অছাত্রদের স্থায়ীভাবে হল থেকে বের করতে হবে।”
দুপুরের পর থেকে হল ছাড়ছেন শিক্ষার্থীরা
সকাল ৮টা থেকে আবাসিক শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার কথা থাকলেও, তা পরে বেলা আড়াইটার দিকে শুরু হয়।
আবাসিক শিক্ষার্থী আনিসুর রহমান বলেন, “আমাদের দাবি ছিল নিরাপত্তা দিতে হবে, জিনিস নিরাপদে থাকবে, হলের সিট ঠিক থাকবে। বাইরের কেউ হলের নিয়ন্ত্রণ নেবে না। হল ছাড়তে না চাইলেও হলের স্টিয়ারিং কমিটির শিক্ষকরা আমাদের সব দাবি মেনে নিয়েছেন।
“কলেজ কর্তৃপক্ষ বিকাল ৪টার মধ্যে হল ত্যাগের সময় দিয়েছে। আমরা নির্দেশ মেনে হল ছেড়ে যাচ্ছি।”
কলেজের ছাত্রদের হল সুপার শাহ জাহান করীম বলেন, “ছাত্রাবাস দখলের চিন্তা কারও নেই। এক ধরনের গুজব শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়েছে। আশ্বাস দেওয়ার পর শিক্ষার্থীরা হল ছাড়ছেন।”
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “কলেজের হলে আর কোনও ছাত্র নেই। সবাই যে যার মত যানবাহনে করে বাড়ি ফিরেছেন। তবে কলেজে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত রয়েছে।”
আনন্দ মোহন কলেজের অধ্যক্ষ মো. আমান উল্লাহ বলেন, “কলেজের পরিবেশ এখন শান্ত রয়েছে। রোববারের ঘটনার পর সকাল ৮টার মধ্যে বেশিরভাগ ছাত্র হল ত্যাগ করলেও কিছু রয়ে যায়। বিকালে শিক্ষকদের প্রতিনিধি দল তাদেরকে বের করে দিয়ে হোস্টেলে তালা মেরেছে।
“তবে কলেজের পরিস্থিতি মোকাবেলায় ক্যাম্পাসে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। রাতে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তারা প্রতিবেদন দিলে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
কলেজের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ছেলেদের আবার হলে ফিরিয়ে নিয়ে আনা হবে বলে জানান অধ্যক্ষ।
আনন্দ মোহন কলেজে ছাত্রদলের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া