Published : 25 Aug 2025, 08:13 PM
সিলেট নগরীর ক্বিন ব্রিজ এলাকায় ঐতিহ্যবাহী ‘আলী আমজদের’ ঘড়িঘরের পাশেই জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিফলক ‘স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প’ নির্মাণ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
জুলাই শহীদদের স্মরণে স্মৃতিফলক নির্মাণকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন সবাই। তবে সমালোচকরা বলছেন, এ কাজ করতে গিয়ে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা আলী আমজদের ঘড়িঘরের সৌন্দর্য আড়াল করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিফলক নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে সিলেট সিটি করপোরেশন। প্রতিটি ফলক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৩৭৫ টাকা। সিলেট নগরে চারজন শহীদের স্মরণে স্মৃতিফলক নির্মাণের কাজ গত জুলাই মাসে শুরু হয় এবং অগাস্ট মাসে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের স্মরণে প্রত্যেকের জন্য আলাদাভাবে ঘটনাস্থলে কিংবা ঘটনাস্থলের পাশে একই নকশায় ‘স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প’ নামে স্মৃতিফলক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্মৃতিফলক নির্মাণের স্থান চূড়ান্ত করতে একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। বিশেষত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শহীদদের শহীদ হওয়ার স্থান দেখিয়ে দিয়েছেন। সে অনুযায়ী ঘটনাস্থল ও ঘটনাস্থলের কাছাকাছি স্মৃতিফলক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আলী আমজদের ঘড়ির সামনে মো. পাবেল আহমদ কামরুল ও পঙ্কজ কুমার কর শহীদ হন। তাই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেখানে দুই শহীদ স্মরণে স্মৃতিফলক নির্মিত হচ্ছে। এর বাইরে কোর্ট পয়েন্ট মধুবন মার্কেটের সামনে শহীদ সাংবাদিক আবু তাহের মো. তুরাব এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষার্থী রুদ্র সেনের স্মরণে ঘটনাস্থলের পাশে স্মৃতিফলক নির্মিত হচ্ছে।
সিলেট নগরীর সুরমা নদীর পাড় আর সারদা হলের মাঝখানে শহরের জিরো পয়েন্ট। তার ঠিক ১০০ মিটারের মধ্যেই আলী আমজদের ঘড়ির অবস্থান। ক্বিন ব্রিজ পার হয়ে শহরের উত্তর অংশের ঠিক প্রবেশমুখে এটি দাঁড়িয়ে আছে ১৮৭৪ সাল থেকে।
স্থানীয়রা জানান, ওই বছর তৎকালীন বড়লাট লর্ড নর্থব্রুক সিলেটে সফরে এসেছিলেন। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার পৃত্থিমপাশার জমিদার নবাব আলী আহমদ খান ঘড়িটি নির্মাণ করেন। নামকরণ করেন নিজের ছেলে আলী আমজদ খানের নামে। ঘড়িটি দেখভাল করার দায়িত্বে আছে সিলেট সিটি করপোরেশন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, “শহীদদের স্মরণে স্মৃতিফলক নির্মাণে গঠিত কমিটি কর্তৃক নির্ধারিত স্থানে সিটি করপোরেশন স্মৃতিফলক নির্মাণ করছে। দেখা গেছে অনেকে রাস্তায় শহীদ হয়েছেন; এ জন্য রাস্তার মাঝখানে তো আর নির্মাণ করা যাবে না।
“ঘটনাস্থলের কাছাকাছি, স্মৃতিফলকের নিরাপত্তা ও পথচারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে করে আলী আমজদের ঘড়ির নিরাপত্তা বাড়বে।’’
তিনি বলেন, ‘‘তবে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, আমরা উনাদের বলেছি কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক ও সিটি করপোশেন কর্তৃপক্ষ বরাবরে স্বারকলিপি দিতে; কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্মাণ কাজ হবে। আলী আমজদের ঘড়ি সিলেটের সিম্বল, এটি আমরা সবাই জানি।’’
সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, মহানগর পুলিশ, গণপূর্তের কর্মকর্তাসহ কয়েকজনের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি স্থানটি চূড়ান্ত করেছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ঘটনাস্থলের ঠিক পাশেই স্মৃতিফলক নির্মাণে উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নবাব আলী আমজদের নাতি সাবেক সংসদ সদস্য নবাব আলী আব্বাস খান বলেন, “আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানাই। এটি আমাদের পরিবারের না, এটি সিলেটবাসীর ঐতিহ্য ও প্রতীক। এখানে নির্মাণ কাজ শুরু করে সমগ্র সিলেটবাসীর অনুভূতিতে আঘাত করেছে। আমি কর্তৃপক্ষকে এই নির্মাণ বন্ধের দাবি জানাই।”সিলেটে কি জায়গার অভাব পড়েছে প্রশ্ন ছুড়ে তিনি বলেন, “এটি করা হচ্ছে ঘড়িটি আড়াল করতে। সিলেটের ঐতিহ্যকে আড়াল করতে এটি করা হচ্ছে।”
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি আবদুল করিম চৌধুরী কিম বলেন, “যে কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার কারণে সিলেটের মানুষ গর্ব অনুভব করেন, এর মধ্যে ১৮৭৪ সালে স্থাপিত আলী আমজদের ঘড়ি। আরও কয়েকটি স্থাপনার সঙ্গে এটি সিলেটের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ ঘড়িঘরের বেষ্টনীর মধ্যেই নির্মাণ করা হচ্ছে স্মৃতিফলক। ঘড়িঘরের সীমানার মধ্যে যে স্মৃতিফলক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এটি ঘড়ির মূল কাঠামো, সৌন্দর্য ও আভিজাত্যের সঙ্গে অসংতিপূর্ণ।
“এটি প্রাচীন স্থাপনার সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক মূল্য রক্ষার জন্য প্রযোজ্য আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের পক্ষে এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও সিটি করপোরেশন বরাবরে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।’’
সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের প্রধান পরিচালক শামসুল বাসিত শেরো ফেইসবুকে লিখেছেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ নিঃসন্দেহে মহতি উদ্যোগ, এতে আরেকটু সচেতন হওয়া যায় না..?”
‘আলী আমজদের ঘড়িঘর’ পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সিলেট জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম।