Published : 11 Sep 2026, 05:16 PM
দেশে থাকাকালে ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বিংয়ের কাজ করতেন ময়মনসিংহের নান্দাইলের আল মামুন। তাকে বলা হয় রাশিয়া গিয়েও তিনি একই কাজই করবেন; মাসে বেতন পাবেন দেড় লাখ টাকা।
এতে অভাবের সংসারে স্বস্তি আসবে, এই আশাতে ঋণ-দাদন করে ও গরু বেচে সাড়ে আট লাখ টাকা দিয়ে তাকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিলেন মা রোকেয়া খাতুন। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন তো পূরণ হলই না, বরং পেলেন একমাত্র ছেলের মৃত্যুর খবর।
সন্তান হারানো এ মা এখন শেষবারের মতো ছেলের মুখটা দেখতে চান। তার একটাই আকুতি, যেভাবেই হোক ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।
মামুনের মৃত্যুর খবর পরিবারকে দিয়েছেন তার সঙ্গে রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হওয়া ঝিনাইদহের রাজন হোসেন। পরে তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসেন।
২৩ অগাস্ট দেশে ফেরা রাজন বলেন, তাদের ৩০ বাংলাদেশির জন্য একজন রুশভাষী কমান্ডার ছিলেন। তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকায় বাংলাদেশিদের বিষয়ে কিছু তথ্য জানতে পারতেন।
ওই কমান্ডারের কাছ থেকেই সোমবার মামুনের মৃত্যুর খবর পান তিনি। রাজন বলেন, “কমান্ডার আমাকে জানিয়েছে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ড্রোন হামলায় মামুন মারা গেছে। এরপর আমি তার পরিবারকে খবর দিয়েছি।”
২৪ বছর বয়সি আল মামুন নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেম ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির একমাত্র ছেলে।
স্ত্রী মহিমা আক্তার, সাড়ে চার বছরের ছেলে আরিয়ান মাহমুদ মাহিন এবং পাঁচ মাস বয়সি মেয়ে আরিশফাকে রেখে চলতি বছরের ৭ মে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন মামুন।
তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে বাড়িতে শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে পরিবারের পক্ষ থেকে মিলাদের আয়োজন করা হয়।
দুপুরের দিকে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, মিলাদ উপলক্ষে স্বজনদের উদ্যোগে রান্নাবান্না চলছে। পাশের ঘরে বসে কাঁদছিলেন রোকেয়া খাতুন ও মহিমা আক্তার।
মহিমা বলেন, ইলেকট্রিকের কাজের কথা বলেই তার স্বামীকে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল। তিনি যুদ্ধ করতে যাননি।
তার অভিযোগ, দালালেরা প্রতারণা করে মামুনসহ একই দলের ৩০ বাংলাদেশিকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে নিয়ে যায়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার দুইটা সন্তান। ওদের দেখার মতো আর কেউ নাই। স্বামীই একমাত্র ছিল। এখন আমি কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। চোখভরা স্বপ্ন আর আশা নিয়ে ওকে রাশিয়ায় পাঠাইছিলাম। এখন শুধু স্বামীর লাশটা দেশে এনে শেষবারের মতো দেখতে চাই।”
রুশ ভাষায় চুক্তিতে সই
মামুনের পরিবারের সদস্যরা বলেন, দালালরা বলেছিল, রাশিয়ায় গিয়ে দুই-তিন বছর ইলেকট্রিকের কাজ করেই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারবেন, দূর করতে পারবেন পরিবারের অসচ্ছলতা। সেই স্বপ্ন নিয়েই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন মামুন। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই বদলে যায় তার জীবনের গল্প।
মামুনের সঙ্গে একই ফ্লাইটে রাশিয়ায় যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন হোসেন বলেন, তাদের ৩০ বাংলাদেশির একটি দল ছিল। ৮ মে তারা রাশিয়ায় পৌঁছান। কয়েক দিন পর ১২ মে ব্যাংক কার্ড, সিম কার্ড, চাকরি ও বসবাসের কাগজপত্র দেওয়ার কথা বলে তাদের একটি চুক্তিতে সই করানো হয়।
তবে চুক্তিটি রুশ ভাষায় লেখা থাকায় তারা এর বিষয়বস্তু বুঝতে পারেননি। পরে জানতে পারেন, সেটি ছিল রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি।
সর্বোচ্চ ২১ দিন প্রশিক্ষণের পরই সম্মুখযুদ্ধ
রাজন বলেন, এরপর তাদের সেনাক্যাম্পে নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কারও ১০ দিন, কারও ১৫ দিন এবং সর্বোচ্চ ২১ দিন পর্যন্ত প্রশিক্ষণ চলে। পরে তাদের ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
রাজনের দাবি, ১২ জুন তাদের যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠানো হয়। ১৪ জুন ড্রোন হামলার ঘটনায় ১৭ বাংলাদেশি নিহত হন। কেউ ড্রোন হামলায়, আবার কেউ মাইন বিস্ফোরণে মারা যান।
সেদিন হামলায় রাজন নিজেও আহত জানিয়ে তিনি বলেন, মাথার ওপর ড্রোন ও বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে পালিয়ে দেশে ফেরেন তিনি।
রাজন বলেন, হাসপাতাল থেকে পালিয়ে ১৮ অগাস্ট তিনি বাংলাদেশ দূতাবাসে যান। পরে রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সহযোগিতায় ২৩ অগাস্ট দেশে ফেরেন।
রাজনের দাবি, একই ফ্লাইটে রাশিয়ায় যাওয়া ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত ১৭ জন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই নিহত হয়েছেন। আরও কয়েকজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
১৯ অগাস্ট বার্তা পাঠান মামুন
রাশিয়ায় যাওয়ার পর স্ত্রী মহিমা আক্তারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে না পারলেও ভয়েস বার্তা ও ছবি পাঠাতেন মামুন। সর্বশেষ ১৯ অগাস্ট তিনি একটি ভয়েস বার্তা পাঠান। এরপর আর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ভয়েস বার্তায় মামুন ভয় ও শঙ্কার কথা বলেছিলেন জানিয়ে তার স্ত্রী মাহিমা বলেন, “আমার স্বামী বলেছিল, তার মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ঘুরছে, কখন কী ঘটে বলা যায় না। সন্তানদের দেখে রাখার কথাও বলেছিলেন। সেই কথাই এখন বারবার মনে পড়ছে মহিমার।”
মন্ত্রণালয়ে গিয়েও মেলেনি সমাধান
মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন তার খালা-শাশুড়ি মোসাম্মৎ কোবিলা আক্তার।
তিনি বলেন, প্রায় দুই বছর আগে মামুনকে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য কাগজপত্র দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন ভিসা না হওয়ার পর ‘জাবাল-এ নূর’ নামের একটি এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা হয়।
৩০ বাংলাদেশিকে মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনের চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল।
কোবিলা আক্তারের দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার পর মামুনদের রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিতে সই করানোর বিষয়টি জানতে পেরে তারা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করেন। সেখানে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানো হবে না।
কিন্তু তাদের সমস্যার সমাধান হয়নি। পরে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে বারবার যোগাযোগ করেছেন তারা।
পরিবারের দাবি, এমনকি এ ঘটনায় মামলা করার জন্য থানায়ও যোগাযোগ করেন তারা। তবে আশ্বাস ছাড়া তেমন কোনো সমাধান পাননি।
কোবিলা আক্তারের অভিযোগ, ‘জাবাল-এ নূর’ এজেন্সির মাধ্যমেই প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। ওই এজেন্সির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ছেলে নেই, কিন্তু ঋণের টাকা রয়ে গেছে
মামুন বিদেশে গেলে অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি আসবে, ঋণের বোঝা কমবে, ভাঙা ঘরের জায়গায় উঠবে পাকা ঘর। এমন আশা নিয়ে তাকে রাশিয়ায় পাঠাতে পরিবারের খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা।
এই টাকা জোগাড় করতে পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছে, নিতে হয়েছে দাদন। এমনকি গরুও বিক্রি করতে হয়েছে।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ধানের ওপর প্রায় চার লাখ টাকা দাদন নেওয়া হয়। পাশাপাশি একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল। বাকি টাকা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার এবং গরু বিক্রি করে জোগাড় করা হয়।
ঋণ-দাদনের এই টাকা এখন যেন আরও বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে রোকেয়া খাতুনের কাছে। কারণ সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি নেই, কিন্তু ঋণের টাকা রয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আমার একমাত্র ছেলে বিদেশ গেছিল নিজের ভাগ্য বদলানোর জন্য, আমাদের ভালো রাখার জন্য। সাড়ে আট লাখ টাকা ঋণ করে দিছি। এখন ছেলেই নাই। নাতি-নাতনিদের কীভাবে বড় করব, জানি না।”
এখন শুধু মরদেহ ফেরার অপেক্ষা
মামুনের মৃত্যুর সঠিক সময়, কোথায় তার মৃত্যু হয়েছে কিংবা মরদেহ বর্তমানে কোথায় রয়েছে এসবের কোনো তথ্যই পরিবারের কাছে নেই।
তারা শুধু জানেন, ভাগ্য বদলাতে বিদেশে যাওয়া পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি আর কোনোদিন ঘরে ফিরে আসবে না।
ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে রোকেয়া খাতুনের মুখে বারবার ফিরে আসছে একই কথা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলছেন, “আমার পুতের লাশটা দেশে আনার ব্যবস্থা সরকার করুক। আমি শেষবারের মতো ছেলের লাশটা দেখতে চাই। ”
আর যাদের প্রতারণার কারণে ছেলেকে যুদ্ধের ময়দানে যেতে হয়েছে তাদেরও বিচার চেয়ে তিনি বলেন, “দালাল আমার সব শেষ কইরা দিল। আমার ছেলেকে যে দালালরা বেইচা দিছে, এই দালালের বিচার চাই। সরকারের কাছে এই আবেদন।”
এদিকে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, “মামুনের মৃত্যুর বিষয়টি তার পরিবার মৌখিকভাবে জানিয়েছে। পরিবারকে লিখিত আবেদন দিতে বলা হয়েছে।”
তিনি বলেন, লিখিত আবেদন পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখার মাধ্যমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানানো হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হবে।