Published : 26 Feb 2026, 07:48 PM
কক্সবাজার শহরের কলাতলীতে গ্যাস পাম্পে বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রাথমিকভাবে ‘লোড-আনলোড’ ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকার কথা বলছে ফায়ার সার্ভিস।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও পরিবেশগত কোনো অনুমোদন না থাকার কথাও বলা হচ্ছে। যদিও মালিকপক্ষ দাবি করেছে, তাদের সব ধরনের অনুমোদন রয়েছে।
বুধবার রাত ১০টার দিকে কলাতলীর প্রবেশমুখে কক্সবাজার এলপিজি স্টেশন নামের পাম্পটিতে বিস্ফোরণে অন্তত ১৫ জন আহত হন। তাদের মধ্যে আশঙ্কাজনক ছয়জন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, গ্যাস লোড-আনলোডের ত্রুটির কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।
“তবে পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতি ও এর কারণ তদন্ত প্রতিবেদনের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
পাম্পটির অগ্নি নিরাপত্তা পরিকল্পনা কিংবা এ বিষয়ক সনদ ছিল না বলেও জানান তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিদর্শক মো. মুসাইব ইবনে রহমান বলেন, “কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই এটি নির্মাণ করা হয়েছে।
“যেকোনো ধরনের সিএনজি স্টেশন বা পাম্প স্টেশন করতে গেলে পরিবেশ অধিদপ্তরের অবস্থানগত ছাড়পত্র নিতে হয়। এই প্রতিষ্ঠান তাও মানেনি। আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
ঘটনার পর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান।
কমিটিতে ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের পরিদর্শক, জেলা পুলিশের প্রতিনিধি এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা রয়েছেন।
তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাহিদুল আলম বলেন, “আমরা কাজ শুরু করেছি। পাম্পের মালিকের সাথেও কথা হয়েছে। তাকে সমস্ত কাগজ দেখাতে বলা হয়েছে।”
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন,
“সেখানকার চিকিৎসকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জেনেছি। আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ খোঁজ খবর রাখা হচ্ছে।”

কক্সবাজার শহরের প্রবেশমুখ কলাতলী থেকে লিংকরোড পর্যন্ত মাত্র তিন কিলোমিটারের মধ্যে চারটি ফিলিং স্টেশন গড়ে ওঠা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে এতগুলো ঝুঁকিপূর্ণ দাহ্য পদার্থের স্টেশন থাকা বৈধ কি-না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাহিদুল বলেন, “স্বল্প দূরত্বের মধ্যে এতগুলো স্টেশন স্থাপনে সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা আমরা খতিয়ে দেখব।”
গ্যাস পাম্পটির স্বত্বাধিকারী এন আলম বলেন, “লাইসেন্স ছাড়া এরকম প্রতিষ্ঠান করার কোনো সুযোগ নাই আপনারা জানেন। ওরা তালিকা দেখুক আমাদের নাম আছে কিনা। আর এটা ঘনবসতি এলাকা কীভাবে বলবেন, পেছনে হয়তো দুইটা বাড়ি আছে। আর আশপাশে কী কোনো বাড়ি আছে?”
তিনি বলেন, “আহত যারা আছে তাদের পাশে আমরা আছি। আমাদের দুইজন কর্মচারী আহতদের ওখানে সার্বক্ষণিক আছে। ওদের ঢাকাও যদি নেওয়া লাগে আমরা নেব। দুর্যোগ সচিবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ব্যবসা থাকলে দুর্ঘটনা হবে সেটা মাথায় নিয়েই ব্যবসা করতে হবে। আহতরা যতোদিন সুস্থ হবে না, আমরা পাশে আছি।”

গ্যাস পাম্প সংলগ্ন ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘরের মালিক শাহাদাত হোসেন বলেন, বিস্ফোরণে তাদের ঘরবাড়ির সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি অভিযোগ করেন, “আমরা প্রায় ৩০ বছর ধরে এই রেজিস্ট্রি করা জায়গায় বসবাস করছি।
“অথচ এই গ্যাস পাম্প কোনো অনুমোদন ছাড়াই জবরদখল করা জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা শ্রমিক খাটিয়ে তড়িঘড়ি করে গত পরশুদিন এটি উদ্বোধন করা হয়।”
সব হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া শাহাদাত বলেন, “আমি এখন সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি। আমরা চাই না এই ঘনবসতি এলাকার মধ্যে এমন ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস পাম্প থাকুক।”
পাম্পটির ৫০ গজ দূরে একটি গ্যারেজে থাকা প্রায় ২০টি গাড়িও পুড়ে গেছে।
গ্যারেজে থাকা চালক মো. ফরিদুল আলম বলেন, “গ্যাসের সাথে হঠাৎ করে আগুন এসে মুহূর্তের মধ্যে পুড়ে যায় সব। গ্যাসের গন্ধে কেউ চোখ-মুখ খুলতে পারছিল না। ২০টি গাড়ির ক্ষতি হয়েছে। অনেক গাড়ি আগুনসহ চালিয়ে বের করা হয়েছে।”