১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

নিউ ইয়র্কে গুলিতে নিহত রাজুর বাড়িতে শোকের মাতম, দিশেহারা পরিবার

“ঋণের বড় একটি অংশ এখনও পরিশোধ হয়নি। পরিবারের ভাঙা ঘরটিও মেরামত করা সম্ভব হয়নি।”

নোয়াখালী প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 24 Aug 2026, 05:23 PM

Updated : 16 Sep 2026, 01:00 PM

সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন নোয়াখালীর মো. ইউসুফ রাজু। তখন দেশে রেখে গিয়েছিলেন সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে। কথা ছিল, কাগজপত্রের কাজ শেষ করে স্ত্রী-সন্তানদেরও নিয়ে যাবেন নিজের কাছে। 

সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। নিউ ইয়র্ক সিটিতে গুলিতে প্রাণ হারিয়ে মাত্র ৪৪ বছর বয়সেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হল রাজুকে।

রাজুর বাড়ি সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কংশনগর গ্রামে। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্ত্রী-মেয়ে, বাবা-মা ও ভাই-বোনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

আমিশাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল আজিজ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য রাজুর প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ঋণ করতে হয়েছিল। এর মধ্যে নিজের জমানো ১২ লাখ টাকাও খরচ করেন তিনি। সেই ঋণের বড় একটি অংশ এখনও পরিশোধ হয়নি। পরিবারের ভাঙা ঘরটিও মেরামত করা সম্ভব হয়নি।”

শনিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে নিউ ইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনের ইস্ট নিউইয়র্ক এলাকার ৮৪২ রকওয়ে এভিনিউয়ে নিজের কর্মস্থল ‘পিজা-প্রায়েড চিকেনের আমেরিকান বেস্ট উইং রেস্টুরেন্টে’ সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারান রাজু।

এ ঘটনায় তার সহকর্মী মো. রাসেলও আহত হন। তার বাড়ি কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার বিপুলাশার ইউনিয়নের বড়কাছি গ্রামে। তিনি ব্রুকডেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

রাজুর দুই মেয়ে ১২ বছর বয়সী জান্নাতুল নাঈমা ও আড়াই বছর বয়সী রাইসা। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী ছিলেন সন্তানসম্ভবা। রাজু বিদেশে যাওয়ার পরই জন্ম নেয় ছোট মেয়ে রাইসা।

তার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। স্বজন ও এলাকাবাসী দ্রুত তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

ইউপি সদস্য আবদুল আজিজ বলেন, “রাজু এক সময় রঙের কাজ করতেন। মাঝে প্রায় তিন বছর কাতার ছিলেন। তার এমন মৃত্যুতে পরিবার কিভাবে চলবে তা এখন অনিশ্চিত। স্বজন ও এলাকাবাসী রাজুর অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।”

রাজুর বাবা মোহাম্মদ উল্লা ও মা লাকি আক্তার ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। 

অন্যদিকে স্বামীকে হারিয়ে দুই শিশু কন্যাকে নিয়ে সামনে কীভাবে চলবেন, সেই চিন্তায় দিশেহারা রাজুর স্ত্রী পলি আক্তার। স্বামীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি দুই সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

রেস্টুরেন্টের মালিক, সহকর্মী, রুমমেট ও পরিচিতজনদের বরাতে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক রুদ্র মাসুদ জানান, শনিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে রেস্টুরেন্টে কাজ করছিলেন মো. ইউসুফ রাজু ও মো. রাসেল। এ সময় এক দুর্বৃত্ত অতর্কিতে রেস্টুরেন্টে গুলি চালায়। প্রথমে রাসেলের পায়ে গুলি লাগে। পরে রাজুকে গুলি করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান তিনি। 

খবর পেয়ে এনওয়াইপিডির সেভেন্টি থার্ড প্রিসিংকটের পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দুজনকে উদ্ধার করে ব্রুকডেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক রাজুকে মৃত ঘোষণা করেন। রাসেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছেন মাসুদ।  

রাজুর কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তারা জানান, নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সের ওজন পার্কে ব্যাচেলর বাসায় থাকতেন ইউসুফ রাজু। অবসর সময় পেলেই তিনি স্ত্রী ও মেয়েদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতেন। রাজু ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। তার কাজ করার বৈধ কাগজপত্র ছিল। 

নিহত রাজুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও একই গ্রামের রেস্টুরেন্ট মালিকদের একজন আবদুল জলিল শিপন জানান, খবর পেয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে রেস্টুরেন্টে এবং পরে হাসপাতালে ছুটে যান। রাজু বা অন্য কোনো কর্মীর সঙ্গে কারও পূর্ববিরোধ ছিল বলে তার জানা নেই।

তিনি বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত শুরু করেছে। রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও রাজুর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন পুলিশ নিয়ে গেছে। রোববার রাত পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে আটক করার খবর তিনি পাননি।

‘দি গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইট- ইউএসএ ইনকের’ সভাপতি জাহিদ মিন্টু জানান, নিহত রাজু নোয়াখালী সোসাইটির সদস্য ছিলেন না। তবে তার মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে সংগঠনটি।

নিউ ইয়র্কে গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আরেকজন হাসপাতালে