Published : 13 Mar 2026, 11:17 AM
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলমান বাস র্যাপিড ট্রানজিট-বিআরটির প্রকল্পের কাজ এক যুগেও শেষ হয়নি। এতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হয় এ পথে চলাচলকারী যাত্রীদের। আর ঈদের সময় দুর্ভোগ বেড়ে যায় আরও কয়েক গুণ।
বিশেষ করে মহাসড়কের মাঝের অংশে থাকা বিআরটি লেনের দুপাশে বেষ্টনী থাকায় কোনো কারণে গাড়ি বিকল হলে বা দুর্ঘটনা পতিত হলে তা উদ্ধারে রেকার নিয়েও যাওয়া যায় না। আর এতে দেখা দেয় দীর্ঘ যানজট। ফলে গাজীপুরে থেকে এবারের ঈদযাত্রাও বিআরটি লেন গলার কাটা হবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
গাজীপুর থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্দিষ্ট লেনে দ্রুত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা প্রবর্তনে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি হাতে নেয় সরকার। ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়কে বিআরটি প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় চার বছর এক মাস।
তবে এখন পর্যন্ত এ প্রকল্পের সময়সীমা পাঁচ দফা বাড়ানো হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও তা করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে ভোগান্তিও কমেনি।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের এডিসি (ট্রাফিক) অমৃত সূত্রধর বলেছেন, গাজীপুর মহানগরের চান্দনা চৌরাস্তা মোড়ের পশ্চিমে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কিছু স্থানে খানা-খন্দক রয়েছে। ঈদের আগে এ অংশ মেরামত করা না হলে ঈদযাত্রায় যানবাহনের চলাচল ধীরগতি এবং যানজটের কারণ হবে।
স্থানীয় সড়ক ও জনপথ বিভাগকে বিষয়টি অবগত করা হলে, তারা বাজেট না পেলে মেরামত করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন।
ঈদে গাজীপুরে ঘরমুখো মানুষের জন্য পর্যাপ্ত গাড়ি না থাকায় সুযোগে এক শ্রেণীর চালকরা মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। ফলে মাঝপথে এসব গাড়ি হঠাৎ অকেজো হয়ে কিংবা দুর্ঘটনা শিকার হয়ে মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি করে।
ঢাকা-শেরপুর পথে চলাচলকারী ‘এমা পরিবহনের’ চালক মোকছেদ মিয়া বলেন, গাজীপুরের বাঘের বাজার, নয়নপুর বাজার, জৈনাবাজার ও এমসি বাজার এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের অর্ধেকটাই কাঁচামাল ও হকারদের দখলে থাকে।
এ ছাড়া সড়কের পাশে দোকান-পাট ও অটোরিকশা অবস্থান করায় বাসসহ অন্যান্য যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। ঈদের আগে এলাকাবাসী এসব দোকানে কেনাকাটার জন্য ভিড় করলে মহাসড়কে তীব্র যানজট দেখা দেয়। তখন ৪০ মিনিটের রাস্তা পার হতে লাগে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা।
ঈদের আগে এসব দোকান ও অটোরিকশা সরিয়ে দিলে যান চলাচল অনেকটাই স্বাভাবিক হবে বলে জানান বাস চালক মোকছেদ মিয়া।
ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে চলাচলকারী থ্রি-স্টার ট্রাভেলসের বাস হেলপার সাব্বির হোসেন বলেন, ময়মনসিংহের ভালুকা ও ভরাডোবা এলাকায় রাস্তা খারাপ। দ্রুত মেরামত না করলে ঈদে যানজটের শঙ্কা রয়েছে।
যেসব স্থানে যানজটের শঙ্কা
যাত্রী ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী স্টেশন রোড, কলেজ গেইট, বোর্ড বাজার, চান্দনা চৌরাস্তা, সদর উপজেলার ভবানীপুর, বাঘের বাজার, শ্রীপুর উপজেলার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, মাওনা চৌরাস্তা, এমসি বাজার, নয়নপুর ও জৈনাবাজারে যানজটের শঙ্কা আছে।
এ ছাড়া চান্দনা চৌরাস্তার ফ্লাইওভার খুলে না দেওয়ায় এবারও চান্দনা চৌরাস্তায় ভোগান্তি সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে যানজটের এসব স্থান চিহ্নিত করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থাগুলো।
কী বলছে ট্রাফিক পুলিশ
গাজীপুর মহানগর পুলিশের ডিসি ট্রাফিক এস এম আশরাফুল আলম বলেন, ঈদের আগে পোশাক কারখানা ছুটি হওয়ার পরে শ্রমিকরা গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য একযোগে রাস্তায় নেমে পড়েন। এ সময় মানুষের তুলনায় গাড়ির সংকট দেখা দেয়। এতে রাস্তায় জটের তৈরি হয়।
তিনি বলেন, “ময়মনসিংহগামী গাড়িগুলো মহানগরের চান্দনা-চৌরাস্তা মোড় এলাকা হয়ে যায়। এখানে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহগামী যানবাহনগুলো ফ্লাইওয়ে ব্যবহার করায় কিছুটা রেহাই পাওয়া যায়। এছাড়া চান্দনা-চৌরাস্তা এলাকায় ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী ফ্লাইওয়েটিও ওপেন করা হয়েছে। এতে স্বস্তিতে যানবাহন চলাচল করতে পারবে। ফলে এ অঞ্চলে ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি কমবে বলে আশা করা যায়।”
যানজট নিরসনে পুলিশ প্রশাসনের পদক্ষেপ নিয়ে জানতে চাওয়া হলে আশরাফুল আলম বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে পরিবহণ মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। ঈদে গাড়ি ভাড়া যাতে না বাড়ে এবং সড়কে গাড়িগুলো যাতে যত্রতত্র না থামে সেসব বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
“ঈদে পোশাকে, সাদা পোশাকে অতিরিক্ত পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে। সড়কের সামগ্রিক পরিস্থিতি নজরদারিতে থাকবে। এবার ঈদের চারদিন আগেই ছুটি হয়ে যাবে। এ সময় একেক দিন একেক কারখানা ছুটি হবে। ফলে যানজট হওয়ার আশঙ্কা কমবে।”
এ ছাড়া চান্দনা-চৌরাস্তা, ঢাকা বাইপাস (ভোগড়া মোড়) থেকে মীরের বাজার পর্যন্ত সড়কের কিছু জায়গায় ভাঙা রয়েছে; এর মধ্যে সড়ক ও জনপথের লোকজন এসব মেরামত করছে বলে জানান ট্রাফিক পুলিশের এ কর্মকর্তা।
উত্তরের যানজট নিয়ে পুলিশের প্রস্তুতি
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক হয়ে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। প্রতি বছর ঈদযাত্রায় যানবাহনের চাপ বেড়ে যায় এ মহাসড়কে। বিশেষ করে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড়ে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়।
মহাসড়কের নানা স্থানে দুই পাশেই অবৈধ দখলদারদের কারণে সড়ক সংকুচিত হয়ে গেছে। বিশেষ করে পোশাক কারখানা ছুটি হলে চাপ বাড়ে মহাসড়কে। ফলে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি হলে যেকোনো সময় যানজট দেখা দিতে পারে।
তবে মহানগর ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যানজটের আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন। তারা বলছে, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে তাদের ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে। সে হিসেবে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন তারা।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) শফির উদ্দিন বলেন, “ঈদযাত্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মৌচাক থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত যানজট সৃষ্টি হয়। আগে অভিজ্ঞতার আলোকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হবে। যাত্রীরা যানজটমুক্ত পরিবেশে আনন্দে বাড়ি যেতে পারবেন।”
এর মধ্যে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সভায় আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে এবং যানজট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সভায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে মোবাইল কোর্টসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
সভায় ঈদ উপলক্ষে গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এম মঞ্জুরুল করিম রনি অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
এ ছাড়া সভায় পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন কলকারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা সময়মতো পরিশোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মালিকপক্ষকে এ বিষয়ে আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সংসদ সদস্য রনি বলেন, বেতন নিয়ে যেন কোনো শ্রমিককে ভোগান্তিতে পড়তে না হয়। এ ছাড়া যানজট নিরসনে ধাপে ধাপে ছুটি দেয়ের অনুরোধ জানান তিনি।