Published : 12 Nov 2025, 10:12 PM
অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় মাদারীপুরের দুই ব্যক্তি মারা গেছেন। মারা যাওয়ার ২১ দিন পর তাদের মৃত্যুর খবর পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বজনরা।
মৃত ব্যক্তিরা হলেন, মাদারীপুর সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের চর বাজিতপুর এলাকার জাফর বেপারী (৪২) ও সিরাজুল হাওলাদার (৩২)।
জাফর বেপারীর ছোট ভাই জাকির বেপারী বলেন, “লিবিয়ার পুলিশের হাতে ধরা খেয়ে তারা নিখোঁজ আছে বলে জানিয়েছিল দালাল। আমরাও দালালের কথা বিশ্বাস করি।
“কিন্তু মঙ্গলবার রাতে জানতে পারি, আমার ভাই আরও ২১ দিন আগে মারা গেছে। সিরাজও মারা গেছে। সাগরে ঠান্ডায় জমে তারা নৌকার মধ্যেই মারা গেছে।”
স্বজনরা ও স্থানীয়রা জানান, স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে ১ সেপ্টেম্বর বাড়ি ছাড়েন জাফর ও সিরাজুল। পরে ঢাকা থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান তারা।
ইতালি যেতে গত ১৪ অক্টোবর লিবিয়ার উপকূল থেকে ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকায় ওঠেন জাফর-সিরাজুলসহ অর্ধশত ব্যক্তি। কিন্তু ভূমধ্যসাগরের মাঝামাঝি এলাকায় যাওয়ার পর নৌকাটির তেল শেষ হয়ে যায়।
পরে সাগরে ভাসতে থাকে নৌকায় তীব্র শীতে, ঠাণ্ডায় জমে ২১ অক্টোবর সাগরেই জাফর, সিরাজুলসহ কয়েকজনের মৃত্যু হয়।
জাকির বেপারী বলেন, “আমার ভাই জাফর ও সিরাজ একসঙ্গে ছিল। ওদের সঙ্গে যারা ছিল, তাদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। খবর পেয়ে দালালকে ধরলে দালালও মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে। এখন আমরা কার কাছে যাব, কী হবে আমাদের?”

স্বজনদের অভিযোগ, নানা প্রলোভন দেখিয়ে ওই দুজনের পরিবারের কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা নিয়েছেন মাদারীপুর সদরের চর বাজিতপুর গ্রামের বাসিন্দা ও মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য লোকমান সরদার।
লোকমান তাদের জাহাজের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার কথা বলেছিল। কিন্তু তাদের পাঠানো হয় ছোট্ট একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায়।
দুজনের মৃত্যুর পর গা-ঢাকা দেন লোকমান। তবে তিনি মোবাইলে দাবি করেন, মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত নন, ওই দুই যুবকের মৃত্যুর বিষয়েও তিনি কিছুই জানেন না। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
লোকমানের ভাবি ঝর্ণা আক্তার বলেন, “আমার ভাশুর কোনো দালাল নন। তার দুই ছেলে ইতালি যাওয়ার পর এলাকার অনেকেই তার কাছে আসেন। এতে তার কোনো দোষ নেই। অন্য এক বড় দালাল আছে, তিনিই সব জানেন। তার পরিচয় আমরা জানি না। তবে লোকমান ভাই জানেন।”
জাফরের বাবা লাল মিয়া বেপারী বলেন, “লোকমান আমাদের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তখন বলেছিল, কোনো ঝামেলা ছাড়াই জাফরকে ইতালি পৌঁছে দেবে। কিন্তু সাগরেই আমার ছেলের মৃত্যু হলো।
“আর দালাল লোকমান বলেছিল, ওরা জীবিত আছে। কোনো চিন্তা করতে না বলেছে। এখন বলে ওরা আর বেঁচে নেই।”
তিনি আরও বলেন, “যার কারণে আমার ছেলে মারা গেল, ওই দালালের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
জাফরের স্ত্রী রুনা বেগম বলেন, “আমাদের দুই মেয়ে, একজনের বয়স ১৮ আর অন্যজনের ১৩। এখন মেয়েদের নিয়ে কার কাছে যাব? কীভাবে ওদের দেখাশোনা করব? সবকিছু শ্যাষ হয়ে গেল আমার। এখন আমি কী করবো, কিছুই মাথায় আসছে না।”
মৃত সিরাজুল হাওলাদারের স্ত্রী নিলুফা বেগম বলেন, “আমার আড়াই বছরের ছোট একটা ছেলে। ও এখনো জানে না, ওর বাবা আর জীবিত নাই। ধারদেনা করে দালালের কাছে ১৫ লাখ টাকা দিছি। বেঁচে থাকার মতো এখন আর কিছু নাই।
“আমাদের সঙ্গে কেন এমনটা ঘটল। সবাই তো শুনি সাগর পাড়ি দিয়া ইতালি পৌঁছে যাচ্ছে। আমার স্বামীর সঙ্গে কেন এমনটা ঘটল? আমার স্বামীর মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচার চাই।”
এ বিষয়ে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “মৃত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া অভিযুক্ত দালালকে ধরতে তাদের অভিযান অব্যাহত আছে।”
তিনি আরও বলেন, মানব পাচার রোধে সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে। দালালের খপ্পরে না পড়ে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে যাওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।