১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বিদ্যালয় ভবনের জন্য শতবর্ষী পুকুর ভরাটের প্রস্তুতি

ঝালকাঠিতে ভরাটের প্রস্তুতি নেওয়া পুকুরটি রেকর্ডিয় হলে জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

বিদ্যালয় ভবনের জন্য শতবর্ষী পুকুর ভরাটের প্রস্তুতি
ঝালকাঠি সরকারি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শতবর্ষী পুকুর।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

ইসমাঈল মুসাফির, ঝালকাঠি প্রতিনিধি

Published : 30 May 2025, 09:25 AM

Updated : 01 Sep 2026, 11:49 AM

এক নজরে

ঝালকাঠিতে ভরাটের প্রস্তুতি নেওয়া পুকুরটি রেকর্ডিয় হলে জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

পুকুর ও জলাশয় ভরাটের আইন লঙ্ঘন করে ঝালকাঠি সদরে একটি বিদ্যালয়ের শতবর্ষী পুকুর ভরাটের প্রস্তুতির অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের জন্য এসব করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পুকুর ভরাটের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হলেও এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সচেতন মহলে সমালোচনা হচ্ছে। ক্ষোভ জানিয়েছেন পরিবেশবাদীরাও। তবে কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ে এটি রেকর্ডিয় পুকুর হলে ভরাট করতে দেওয়া হবে না; জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) অন্তরা হালদার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা শহরের সরকারি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শতবর্ষী পুকুর ভরাটের প্রস্তুতি নিয়েছে ঝালকাঠি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাড়ে আট কোটি টাকা প্যাকেজ মূল্যে কাজের ঠিকাদারি পান জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক রেজাউল করিম জাকিরের প্রতিষ্ঠান ‘মুনমুন কনস্ট্রাকশন’।

তবে জাকির আত্মগোপনে থাকায় তার বড় ভাই মানিক হাওলাদার স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী নুরুজ্জামানকে দিয়ে পুকুরটি ভরাটের কাজ শুরু করেন। আর এতে সহযোগিতা করছেন সরকারি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নূরুল ইসলাম।

স্থানীয়রা জানান, সোমবার সুগন্ধা নদীর ডিসি পার্ক সংলগ্ন এলাকা থেকে বিদ্যালয় পর্যন্ত পাইপ টানার কাজ শুরু হয়। মঙ্গলবার বিদ্যালয়ের দেয়াল ছিদ্র করে পাইপ বসানোর পর বিষয়টি সাংবাদিকদের নজরে পড়ে। এরপর সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের ভেতরে থাকা শতবর্ষী পুকুরটি পর্যন্ত পাইপ টানা হয়েছে।

মঙ্গলবার পর্যন্ত পুকুরটির তিনভাগের একভাগ অংশে বালু ফেলা হয়। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার এক পর্যায়ে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ঝালকাঠি সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইফুল ইসলাম বিদ্যালয়ে গিয়ে বালু ফেলা বন্ধ করে দেন।

সরকারি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চবিদ্যালয়টি প্রায় দেড় একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। ১৯৪৭ সালের ২ জানুয়ারি এর প্রতিষ্ঠাকাল লেখা হলেও আদি প্রতিষ্ঠাকাল ১৯১৭ সাল। যার নাম ছিল গণেশ দাস বালিকা বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি ১৯৭৭ সালে সরকারি হয়।

বিদ্যালয় এলাকায় শত বছর ধরে থাকা ১২ দশমিক ৮২ শতাংশের পুকুরটি ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভেসহ (সিএস) অন্যান্য জরিপেও রেকর্ডভুক্ত। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বিদ্যালয়ে স্থাপিত প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধারা পুকুরটি ব্যবহার করেছেন।

জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুযায়ী কোনো পুকুর, জলাশয়, খাল, লেক ভরাট করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ আইনের ৮ নম্বর ধারা অমান্যকারীর পাঁচ বছর কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া পুকুর ভরাট পরিবেশ সংরক্ষণ আইনেও নিষিদ্ধ। শুধু রেকর্ডিয় পুকুর নয়; ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুরও প্রাকৃতিক জলাধার বলে ২০২০ সালে হাই কোর্টের এক রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদের রিটের ফলে হাই কোর্ট এই রায়টি দিয়েছিল। তার কাছে ঝালকাঠির ওই বিদ্যালয়ের পুকুর ভরাটের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিএস এমনকি বিএস রেকর্ডেও যদি এটি পুকুর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকে, এটি ভরাট করা যাবে না। আর ভবন নির্মাণের তো প্রশ্নই আসে না। যদি কোনও রেকর্ডে না থাকে তখনও এটি পানি আইনে সুরক্ষা পাবে।”

ঝালকাঠি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী স্নেহলতা রায় বলেন, “ফাইল ঘেঁটে যতটুকু জেনেছি, ২০২৩ সালে ঝালকাঠি সরকারি হরচন্দ বালিকা বিদ্যালয়ে একটি ছয়তলা ভবন নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষা করে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

“মাটি পরীক্ষার সময় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুকুরটিকে ডোবা হিসেবে দেখায়। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট রেজাউল করিম জাকিরের প্রতিষ্ঠানকে এর কার্যাদেশ পায়। নয় মাসে কোনো কাজ শুরু না করলেও হঠাৎ মঙ্গলবার আমাদের কিছু না জানিয়ে ঠিকাদারের লোকজন বালু দিয়ে পুকুর ভরাট শুরু করেন। যেহেতু এটি রেকর্ডিয় পুকুর তাই ভরাট করে ভবন নির্মাণের সুযোগ নেই।”

এ ছাড়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে না জানিয়ে পুকুর ভরাটের উদ্যোগ নেওয়ায় ঠিকাদারকে কারণ দর্শাতে বলা হবে বলে জানান প্রকৌশলী স্নেহলতা রায়।

তবে ঝালকাঠি শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেছেন, “আগেই সংশ্লিষ্ট জায়গার গাছ অপসারণের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে পুরনো একটি ভবন অপসারণের অনুমতি পেয়েছি। এখন পুকুর ভরাটের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র আনার চেষ্টা করব।”

এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদার রেজাউল করিম জাকির ও তার বড় ভাই মানিক হাওলাদারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তাদের নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে।

তবে তাদের পক্ষে সাব কন্ট্রাক্টর মো. নুরুজ্জামান বলেন, “জাকিরের বড় ভাই মানিকের নির্দেশে প্রধান শিক্ষকের পরামর্শে বিদ্যালয়ের দেয়াল ভেঙে পুকুরে বালু ফেলা শুরু করেছিলাম। এসি ল্যান্ড স্যার কাজ বন্ধ রাখতে বলায় পাইপ খুলে কাজ বন্ধ রেখেছি।”

ঝালকাঠি সরকারি হরচন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নূরুল ইসলাম বলেন, “পুকুরটি অব্যবহৃত থাকায় ভরাটের অনুমতি দিয়েছিলাম। পুকুরের চেয়ে আমাদের ভবনটি বেশি দরকার। অপ্রয়োজনীয় পুকুরটি ভরাটের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরে আবেদন করব।”

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক অন্তরা হালদার বলেন, “প্রাথমিকভাবে জলাশয়টি পুকুর বলেই মনে হচ্ছে। তবে কাগজপত্র যাচাইবাছাই করে দেখা হবে। এতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জলাধার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জলাধার সংরক্ষণ নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর চরম মাত্রায় হ্রাস পাচ্ছে। জলাধার সংরক্ষণ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত অনেকের। ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে কাজ করছেন এইচ এম মোরশেদুল হাসিন।

তিনি ঢাকা থেকে মোবাইল ফোনে বলেন, “পুকুর যখন ভরাট করা হয় তখন এটা সিমেন্টিংয়ের মতো একটা লেয়ারে আটকে যায়। বৃষ্টির পানিও আর নিচের স্তরে যেতে পারে না।

“নিচে আর পানি রিচার্জ হওয়ার সুযোগ থাকে না। এ জন্য পুকুর, নদী, খাল ভরাট পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এ ছাড়া জলাধার তাপমাত্রাকে অনেক ক্ষেত্রে সহনশীল রাখতে ভূমিকা রাখে।”

ঝালকাঠি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার এরশাদুজ্জামান মৃদুল বলেন, কোথাও জলাধার ভরাট মানে ওখান থেকে আর মাটির নিচের দিকে পানি যেতে পারে না।

শতবর্ষী পুকুর ভরাটের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রথম প্রতিবাদ জানান মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের ঝালকাঠি সভাপতি আককাস সিকদার।

তিনি বলেন, “প্রশাসন আপাতত পুকুর ভরাট বন্ধ করায় আমরা সন্তুষ্ট। তবে রেকর্ডিয় এই পুকুরটি ভবিষ্যতে ভরাটের চেষ্টা করলে পরিবেশের স্বার্থে আমরা চুপ থাকব না।”