Published : 21 Sep 2025, 06:50 PM
বিলুপ্তপ্রায় রেংমিটচ্য ভাষা বাঁচাতে এবার এই ভাষায় দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করা কথোপথন বাক্য নিয়ে একটি বই প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এখনও রেংমিটচ্য ভাষার নিজস্ব অক্ষর না থাকায় এটিকে ম্রো ও বাংলা ভাষায় রূপান্তর করে প্রকাশ করা হয়।
ম্রো ভাষার লেখক ও গবেষক ইয়াঙান ম্রো দৈনন্দিন জীবনে রেংমিটচ্য ভাষার কথোপথনগুলো সংগ্রহ করে এই বইটি প্রকাশ করেন। এর আগে ২০২৩ সালে এই ভাষার শব্দভান্ডার নিয়েও একটি বই প্রকাশ করেন তিনি। এতে ‘রেংমিটচ্য ভাষায়’ তিন হাজারেও বেশি শব্দ স্থান পায়।
এবার রেংমিটচ্যভাষীদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করা কথোপথন নিয়ে বই প্রকাশের বিষয়ে ইয়াঙান ম্রো বলেন, “সবার একটা আশঙ্কা এই ভাষার ছয়জন মানুষ মারা গেলে চিরতরে জন্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে রেংমিটচ্য ভাষাটি। এই ভাষায় কথা বলা ও চর্চা করা মানুষ আর কেউ থাকবে না। হয়ত চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আগে স্মৃতিস্মারক হিসেবে এই বইগুলো বেঁচে থাকবে। বিভিন্ন সময় এই ভাষা নিয়ে কাজ করার সময় তাদের দৈনন্দিন জীবনে কথোপথনগুলো সংগ্রহ করে রেখেছি। মূলত এই বইয়ে সেগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এখন ভাষাটি এত সহজে হারাবে না।”
নতুন প্রকাশিত এই বইয়ের নাম ‘তেক মিটচ্য তখক’। এর বাংলা অর্থ, ‘রেংমিটচ্য ভাষায় কথা বলা’। মোট ২৮ পৃষ্ঠার বইটিতে রয়েছে দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ কথোপথন ও সংখ্যা গণনা।
বান্দরবানে আলীকদমের দুর্গম এলাকায় ম্রো জনগোষ্ঠীর এক গোত্র রয়েছে; যাদের নিজের মাতৃভাষা ‘রেংমিটচ্য’। কথা বলতে পারেন মাত্র ছয়জন। এখন তাদের কারও বয়স ষাটের কাছাকাছি, কারও বয়স ষাটোর্ধ্ব। ভাষা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ছয়জন মানুষ মারা গেলে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে আরেকটি ভাষা। তবে আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট বিপন্নপ্রায় এই ভাষা রক্ষার্থে তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টশন) সংগ্রহ করে ভাষাটা টিকিয়ে রাখার কথা বলেছে।
রেংমিটচ্যভাষী এই ছয়জন হলেন- আলীকদম সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ক্রাংসি পাড়ার বাসিন্দা মাংপুং ম্রো (৭৩), কুনরাও ম্রো (৬০), কুনরাও ম্রো-২ (৭৩); নয়াপাড়া ইউনিয়নের মেনসিং পাড়ার বাসিন্দা থোয়াই লক ম্রো (৫৯), নাইক্ষ্যংছড়ি ইউনিয়নের ওয়াইবট পাড়ার বাসিন্দা রেংপুং ম্রো (৬৯) এবং সাংপ্লং পাড়ার বাসিন্দা মাংওয়াই ম্রো (৬৩)।
এর মধ্যে কুনরাও ম্রো নামে দুজনই নারী, বাকীরা পুরুষ। অন্যদিকে মাংপুর মেঝ ভাই রেংপুং ম্রো এবং ছোট ভাই হল মাওয়াই ম্রো।
যুক্তরাষ্ট্রের ডার্থমাউথ কলেজের ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক ডেভিড এ পিটারসন বাংলাদেশে কুকি-চিন জাতিভুক্ত ভাষা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। ২০১৩ সালে বান্দরবানে আলীকদমে এসে বিলুপ্তপ্রায় এই রেংমিটচ্যভাষীদের তিনিই প্রথম খুঁজে বের করেন। তখন গবেষণার কাজে সহযোগী হিসেবে ছিলেন ম্রো ভাষার লেখক ইয়াংঙান ম্রো। পরে ডেভিড এ পিটারসন চলে যাবার পর এই রেংমিটচ্য ভাষা নিয়ে কাজ শুরু করেন ইয়াংঙান ম্রো।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের পক্ষ থেকে বিলুপ্তপ্রায় এই রেংমিটচ্য ভাষার তথ্যচিত্র সংগ্রহ করে নানা উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনও কোনো কাজ শুরু করতে পারেননি তারা। তবে এই ভাষাকে কিভাবে টিকিয়ে রাখা যায় ও তথ্যচিত্র (ডকুমেন্টশন) সংগ্রহ করা যায়- এ নিয়ে আয়ারল্যান্ডে ‘ট্রিনিটি কলেজ অব ডাবলিন’-এ পিএইচডি গবেষণা করছেন আফসানা ফেরদৌস আশা। বর্তমানে তথ্যচিত্র সংগ্রহের কাজে বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম ম্রো পাড়ায় অবস্থান করছেন তিনি।
রেংমিটচ্য ভাষা নিয়ে জানতে চাইলে গবেষক আফসানা ফেরদৌস আশা শনিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আলীকদমে এই ভাষায় কথা বলতে পারে এমন পাঁচটি পাড়া জরিপ করা শেষ। এখন সমস্যা হল- বৃষ্টি এবং জুমের ধান কাটায় ব্যস্ত তারা। বৃষ্টির শব্দের কারণে ডকুমেন্টশন (তথ্যচিত্র) করতে সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে জুমের ধান কাটার কারণে তাদেরকে ঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। যখন-তখন পাড়ায় গিয়ে কাজ করা যাচ্ছে না। তাদের নির্ধারণ করে দেওয়া সময়ে গিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
“এই ভাষা নিয়ে যত কাজ হবে তত বেশি টিকিয়ে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হবে। মাঠ পর্যায়ে তথ্যচিত্র সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখি, ম্রোদের মধ্যে এই ভাষা নিয়ে নতুনভাবে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। রেংমিটচ্য ভাষায় কথা বলতে পারা মানুষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। তবে যারা পারে একেবারে বেসিক পর্যায়ে তারা। শুধু সাধারণ কথাবার্তাটুকু বলতে পারে। নতুনভাবে খুঁজে পাওয়ার মধ্যে চিপ্পী ম্রো নামে একজন রেংমিটচ্য ভাষায় অনর্গলভাবে কথা বলতে পারেন।”
আফসানা ফেরদৌস আশা বলেন, “এই ভাষা পরিবার হয়ত সৃষ্টি করা যাবে না। কিন্তু ভাষাটা মুখে মুখে হলেও টিকিয়ে রাখা যাবে। এ বছর ডিসেম্বর শেষে মাঠ পর্যায়ে তথ্যচিত্র সংগ্রহের কাজ শেষ হলে গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরতে পারব বলে আশা রাখি।”