Published : 31 Jul 2026, 10:55 AM
সরকারি চাকরিতে বদলি হয়ে কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় ধরে স্বাভাবিকভাবে শ্রেণিকক্ষে যেতে পারেননি। কলেজে ঢোকার চেষ্টা করলেই একদল শিক্ষার্থী ঘিরে ধরেছে, বিক্ষোভ করেছে, এক পর্যায়ে কক্ষে আটকে রাখারও অভিযোগ উঠেছে।
আরেক শিক্ষকও প্রায় একই সময় ধরে বিভাগে নিয়মিত পাঠদান করতে পারছেন না।
দুই শিক্ষক হলেন কক্সবাজার সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুজিবুল আলম এবং ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক অলক চক্রবর্তী।
দুই শিক্ষকের অভিযোগ, সংগঠিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে ‘মব’ তৈরি করা হয়েছে। কলেজে গেলেই হেনস্তা ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে হয়।
অন্যদিকে ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ বলছে, দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সেই কারণেই শিক্ষার্থীরা তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই এখন পর্যন্ত কোনো বিভাগীয় তদন্ত বা আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়নি। একই সঙ্গে কলেজ প্রশাসনও অস্বীকার করছে না যে, দুই শিক্ষক দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান করতে পারেননি।
‘১০ বারের বেশি গিয়েছি, প্রতিবারই ফিরে এসেছি’
সহযোগী অধ্যাপক মুজিবুল আলম বলেন, ২০২৫ সালের ২০ জুলাই তিনি কক্সবাজার সরকারি কলেজে যোগদানের আদেশ পান। কিন্তু যোগদানের প্রথম দিন থেকেই বাধার মুখে পড়েন। বলেন, “কলেজে যাই, আবার ফিরে আসি। অন্তত ১০ বার এমন হয়েছে।”
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় তিনি কক্সবাজার সরকারি কলেজে ছিলেন না, তখন তিনি রামু সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। এরপরও তাকে ‘দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
মুজিবুল আলমের প্রশ্ন, “যদি রামু কলেজে আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থেকেও থাকে, সেটার তদন্ত করবে সরকার। কিন্তু অন্য কলেজে এসে আমি কীভাবে অভিযুক্ত হয়ে গেলাম?”
তিনি অভিযোগ করেন, ১৬ জুন কলেজে গেলে তাকে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়, মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলেও জানান।
“আমি শুধু চাকরি করতে চাই। সরকার বদলি করলে চলে যাব। কিন্তু যেখানে পোস্টিং দিয়েছে, সেখানে নিরাপদে দায়িত্ব পালন করার পরিবেশ তো থাকতে হবে।”
মুজিবুল আলমের দাবি, এটি সাধারণ ছাত্রবিক্ষোভ নয়, বরং সংগঠিতভাবে তাকে ঘিরে ‘মব’ তৈরি করা হয়।
তার অভিযোগ, একটি ঘটনায় এনসিপি সমর্থিত ছাত্রশক্তির কয়েকজন এবং ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে দুটি দল তাকে ঘিরে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে।
এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আব্দুল্লাহ আল নোমান। তবে তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা তাকে চায় না।”
‘সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়’
কলেজের শৃঙ্খলা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মফিদুল আলম বলেন, মুজিবুল আলম যোগদানের পর থেকেই কার্যত বিভাগে যেতে পারেননি। এক বছরের বেশি সময় হয়ে গেছে।
অধ্যাপক অলক চক্রবর্তীর ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের পরিস্থিতি চলছে বলে জানান তিনি।
কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মফিজুল হক বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো শিক্ষককে কলেজে আসতে বাধা দেওয়া হয়নি।
তার ভাষায়, “সরকার যেহেতু নিয়োগ দিয়েছে, তাই কলেজে আসতে তাদের কোনো বাধা নেই।”
তবে শিক্ষকদের নিরাপত্তার বিষয়ে তিনি বলেন, “যখনই সমস্যা হয়েছে, পুলিশ ডেকেছি। কিন্তু কলেজ প্রশাসনের পক্ষে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়।”
ছাত্রদের অভিযোগ কী?
স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কলেজ শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, মুজিবুল আলমের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগের সূত্র রামু সরকারি কলেজ। সেখানে দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছিল।
তার দাবি, কক্সবাজার সরকারি কলেজে যোগ দেওয়ার পরও মুজিবুল আলম ছাত্র প্রতিনিধিদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন এবং কলেজে প্রবেশের জন্য বিভিন্ন মহলের সহায়তা চান।
নোমানের অভিযোগ, মুজিবুল আলম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এক কেন্দ্রীয় নেতার মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেছিলেন।
একই ধরনের অভিযোগ করেন ছাত্রশক্তির সভাপতি ইরতেজা মোহাম্মদ তানহা। তার দাবি, জামায়াত, বিএনপি এবং বিভিন্ন মহল থেকে সুপারিশ এসেছিল।
নোমান দাবি করেন, মুজিবুল আলম ছাত্র প্রতিনিধিদের অর্থের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে তিনি প্রতিবেদককে কোনো যাচাইকৃত নথি দেখাননি। তার দাবি, এসবের ভিডিও ও নথি তাদের কাছে রয়েছে।
অলক চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে নোমান ও তানহা অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, হিজাব নিয়ে মন্তব্য এবং বিভাগীয় নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।
যদিও তাদের এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিচার কি শিক্ষার্থীরা নিজেরা করতে পারেন; নাকি আইন ও বিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত- এমন প্রশ্নের জবাবে তানহা বলেন, তারা পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করেছেন এবং তাকে ঘিরে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেগুলোকে ‘মব’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তা আসলে ‘মব’ নয়।
‘আইনি ব্যবস্থা নিন, মব নয়’
এ বিষয়ে কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রিদুয়ান উল হক বলেন, “একজন শিক্ষক অন্যায় করলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযোগ দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু একজন শিক্ষককে ‘মব’ করে লাঞ্ছিত করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।”
তিনি বলেন, কোনো শিক্ষক যদি রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিতও হন, তাহলে আইনের ভিত্তিতে সবার ক্ষেত্রেই সমান ব্যবস্থা হওয়া উচিত।
“সবাইকে ছেড়ে নির্দিষ্ট একজন-দুজনকে টার্গেট করলে সেখানে অন্য স্বার্থের প্রশ্ন ওঠে।”
তিনি বলেন, শিক্ষক পরিষদ, ছাত্রসংগঠন এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের কলেজ শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, তারা পুলিশ সুপার, কলেজ প্রশাসনসহ বিভিন্ন জায়গায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “যারা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে বা হামলা করেছে, তাদের আমরা যেখানে পাব, সেখানে মারব।”
যদিও কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, শিক্ষক নিয়োগ বা অপসারণের বিষয়টি ছাত্রসংগঠনের দায়িত্ব নয়।
তার ভাষায়, “আমরা ছাত্রদের প্রতিনিধি। শিক্ষার্থীরা যেসব অভিযোগ আমাদের সামনে আনে, আমরা সেগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরি।”
তিনি দাবি করেন, দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মূল আপত্তি সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষার্থীদের।
তবে ‘মব’ বা সহিংসতার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি সরাসরি মন্তব্য করতে চাননি। বলেন, “বাস্তবতা কী, সেটাও দেখতে হবে।”
'শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়েছি, সিদ্ধান্ত দিইনি’
শৃঙ্খলা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মফিদুল আলম বলেন, ইসলামের ইতিহাস বিভাগের বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তির প্রতিনিধিদের লিখিত মতামত নেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মুজিবুল আলমকে চান না বলে মত দিয়েছেন। ছাত্রশিবির ও ছাত্রশক্তিও একই মত দিয়েছে।
ছাত্রদলের মতামত ছিল মিশ্র। কেউ সমঝোতার মাধ্যমে সমাধানের কথা বলেছেন, কেউ প্রয়োজনে বদলির সুপারিশ করেছেন।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শৃঙ্খলা কমিটির কোনো এখতিয়ার নেই একজন শিক্ষককে কলেজে আসতে নিষেধ করার বা এ ধরনের সুপারিশ করার।
তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারী হিসেবে তারা কোনো নেতিবাচক মন্তব্যও করতে পারেন না। তাই শিক্ষার্থীদের মতামত সংকলন করে অধ্যক্ষকে অবহিত করার মধ্যেই তাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ।
কোনো মন্তব্য করেননি অলক চক্রবর্তী
অলক চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তিনি বলেন, “সবকিছু অধ্যক্ষ জানেন। তার সঙ্গে কথা বলেন।”
কক্সবাজার সরকারি কলেজের শিক্ষক পরিষদের জ্যেষ্ঠ এক শিক্ষক বলেন, এই ঘটনার একটি দিক হলো, দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রদের একাংশের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে সেই অভিযোগগুলোর কোনো বিভাগীয় বা বিচারিক নিষ্পত্তি ছাড়াই তারা এক বছরের বেশি সময় ধরে কার্যত শ্রেণিকক্ষের বাইরে রয়েছেন সবেতনে।
তার মতে, কলেজ প্রশাসন স্বীকার করছে, সমস্যা রয়েছে, ছাত্রদের মতামতও সংগ্রহ করেছে। কিন্তু নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা কিংবা অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তিতে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ এখনো দেখা যায়নি।
তিনি বলেন, “ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, একজন সরকারি কলেজের শিক্ষক দায়িত্ব পালন করবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত কি রাষ্ট্রের আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো নেবে, নাকি সংগঠিত ছাত্রচাপ ও মবের বাস্তবতা তা নির্ধারণ করবে?”