লোডশেডিং: গোপালগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীতে উৎপাদন নেমেছে অর্ধেকে
“দিনে ১১ ঘণ্টা কারখানায় কাজ হয়। এর মধ্যে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে। এ সময় শ্রমিকরা বসে থাকেন। কিন্তু তাদের বেতন দিতে হয়।”
কয়েকদিন ধরে ঘনঘন লোডশেডিংয়ে গোপালগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীতে অর্ধেকে নেমেছে উৎপাদন। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এখানকার শিল্প কল-কারখানায় উৎপাদনের কাজ চলে।
বিদ্যুৎ নির্ভর এ নগরীতে ১১ ঘণ্টার মধ্যে লোডশেডিং করা হচ্ছে পাঁচ ঘণ্টা। ভরা কাজের সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। কিন্তু শ্রমিকদের পুরো বেতন দিতে হচ্ছে। এতে শিল্প ইউনিটগুলো লোকসানে পড়ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে প্লাস্টিক কারখানায়।
ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাটিকো) গোপালগঞ্জ শহর বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় জানিয়েছে, শহরের বিসিক ফিডারে প্রতিদিন দুই মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সেখানে এক থেকে এক দশমিক ২৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
গোপালগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা সুজন দাস বলেন, শহর সংলগ্ন ঘোষেরচর এলাকায় ১০ দশমিক ৫০ একর জমিতে ১৯৯৫ সালে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বিসিক শিল্পনগরী যাত্রা শুরু করে সরকার। এ নগরীতে ৭৪টি শিল্প প্লট রয়েছে। এর মধ্যে ৬১টি প্লটে শিল্প ইউনিট চালু রয়েছে।
শিল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে- কাঠ ও স্টিলের ফার্নিচার, ডাল মিল, অটোমোবাইল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ, তেল, মুড়ি ও স্যানিটারি সামগ্রী উৎপাদন ইউনিট।
তিনি বলেন, সম্প্রতি ঘনঘন লোডশেডিংয়ে এসব শিল্পের উৎপাদন কমে গেছে। ভোল্টেজের আপ-ডাউনে মেশিনারিজের ক্ষতি হচ্ছে। শ্রমিকদের হাজিরার অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে শিল্প মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
বিসিক শিল্পনগরীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ শুরু করার কথা বলেছেন সুজন দাস।
খান ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক কাজী হাসান বলেন, “এ নগরীতে আমাদের প্লাস্টিক সংশ্লিষ্ট তিনটি শিল্প ইউনিট রয়েছে। মেশিন চালু করলে গরম হতে দুই ঘণ্টা লাগে। কিন্তু এক ঘণ্টা পর পর বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে মেশিনের হিট জিরোতে নেমে আসে।
“বিদ্যুতের অভাবে মেশিন চলে না। শ্রমিক বসে থাকে। আবার কাঁচামাল নষ্ট হয়। এতে ত্রিমুখী ক্ষতি হচ্ছে। লোডশেডিং আমাদের পলিমার ইন্ডাস্ট্রিজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের মেশিনের একটি স্কু নষ্ট হয়েছে; যার দাম আড়াই লাখ টাকা। চায়না থেকে এটি আনাতে হবে। সময় লাগবে ১৫ দিন। ফলে একটি ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।”
সম্প্রতি বিদ্যুতের ভোল্টেজ ওঠা-নামা করায় শরীফ ফার্নিচারের মেশিনারিজে তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ইমাম হাসান সুন্সি। তিনি বলেন, “দিনে ১১ ঘণ্টা কারখানায় কাজ হয়। এর মধ্যে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে।
“এ সময় শ্রমিকরা বসে থাকেন। কাজ করতে পারে না। কিন্তু তাদের বেতন দিতে হয়। এতে উৎপাদন নেমেছে ৪৫ শতাংশে। এ কারণে লোকসান গুণতে হচ্ছে। শো-রুমে ফার্নিচারের সরবরাহ আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।”
দ্রুত এই পরিস্থিতির নিরসন করে কাজের সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শরীফ ফার্নিচারের পরিচালক।
মণি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপের মালিক বিধান বিশ্বাস বলেন, ঘণ্টায়-ঘণ্টায় লোডশেডিং করা হচ্ছে। এতে ধান মাড়াই কল ও কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। চলতি মাসের ১২ দিনে উৎপাদন অর্ধেক হয়েছে। এতে লোকসানও হয়েছে।
লুৎফর রহমান ডাল মিলের মালিক লুৎফর রহমান লুথু বলেন, বিদ্যুৎ সংকটে ডালের উৎপাদন কমে গেছে। শ্রমিকদের বসিয়ে বসিয়ে পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে। বাজারে চাহিদা অনুযায়ী ডাল সরবরাহ করতে পারছেন না তারা।
গোপালগঞ্জ মোটরর্সের মালিক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “আমরা কার সার্ভিসিং করি। এতে সব সময় বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া কিছু কাজ ম্যানুয়ালি করতে পারি। বিদ্যুৎ ছাড়া বিসিকের সব কিছুই অচল। কারণ এখানে গ্যাস নেই।”
ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাটিকো) গোপালগঞ্জ শহর বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মঈন উদ্দিন বলেন, শহরের নয়টি ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এসব ফিডারে ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া ন্যাশনাল গ্রিড থেকে এখানে আট থেকে নয় মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিটি ফিডারেই লোডশেডিং করা হচ্ছে। এর মধ্যে বিসিক ফিডারে দুই মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে।
তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। দ্রুত এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। তারপরও বিসিক ফিডারের দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
