Published : 01 Aug 2024, 09:04 PM
সিলেটে পুলিশের ঘেরাওয়ের মধ্যে পৌনে তিন ঘণ্টা মহাসড়কে অবস্থান করে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি পালন করেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা থেকে পৌনে ৬টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সুরমা আবাসিক এলাকায় এ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা৷ কর্মসূচিতে আসা একজন শিক্ষার্থীকে আটক করেছে পুলিশ।
আটক সাঈদুর ওসমানীনগরের বুরঙ্গা গ্রামের ফজল মিয়ার ছেলে। সে বুরঙ্গা ইকবাল আহমেদ উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (গোয়েন্দা) তাহিয়াত আহমেদ চৌধুরী বলেন, “আটক শিক্ষার্থী বন্ধুদের সঙ্গে মিছিলে আসছিল। তাকে আটক করা হয়েছে। তার অভিভাবক এলে জালালবাদ থানার ওসি ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন।”
প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কয়েকজন জানান, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে পুলিশের শক্ত অবস্থানের কারণে বেলা ৩টায় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সুরমা আবাসিক এলাকায় ও অন্য একটি অংশ কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের দিকে ছিলেন।

এর মধ্যে বিকাল ৩টা থেকে বাসস্ট্যান্ডের দিকে থাকা শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন৷ পূর্বঘোষিত ‘সারাদেশে ছাত্র-জনতার ওপর গণহত্যা, গণগ্রেপ্তার, হামলা-মামলা, গুম-খুন, শিক্ষকদের উপর হামলার প্রতিবাদে ও জাতিসংঘ কর্তৃক তদন্তপূর্বক বিচারের দাবিতে এবং ছাত্র-জনতার ৯ দফা আদায়ের লক্ষ্যে’ ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ কর্মসূচি পালন করতে তারা জড়ো হতে থাকেন। সোয়া ৩টার দিকে কিছু শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন সড়কে জড়ো হতে চাইলে তাদেরকে পুলিশ সরিয়ে দেয়।
পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ জানিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। তারা কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যেতে থাকলে পুলিশ পেছন থেকে ধাওয়া দিয়ে লাঠিপেটা করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে। এ সময় একজনকে আটক করে পুলিশ।
অপরদিকে একই সময়ে সুরমা আাবসিক এলাকায় ছাত্র-জনতা বিকাল ৩টা থেকে টানা পৌনে তিন ঘণ্টা সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে অবস্থান করে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কমসূচি পালন করেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদী গান, স্লোগান, সড়ক লেখনের কর্মসূচি পালন করেন।
এ সময় শিক্ষার্থীদের উভয় পাশেই সতর্ক অবস্থানে ছিলেন পুলিশ। সুরমার আবাসিক এলাকার অদূরে তপোবন আবাসিক এলাকা ও নিহারী পাড়ার এলাকায় পুলিশের অবস্থান ছিল।
শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ফয়সাল হোসেন বলেন, “আমাদের কর্মসূচি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে করার কথা ছিল। কিন্তু পুলিশ জায়গাটাকে যুদ্ধস্থল বানিয়ে রেখেছিল। পরে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সুরমায় এলাকায় কর্মসূচি পালন করেছি।”
সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ বলেন, “সিলেটে আজ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ঘটেনি। কিছু সংখ্যাক শিক্ষার্থী সুরমা আবাসিক এলাকার সামনে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে জড়ো হয়েছিল। তাদেরকে নির্দেশনা দেওয়ার পর কিছু সময় পর চলে গেছে। সড়কে যানচলাচল এখন স্বাভাববিক রয়েছে।”
এদিকে, বিকাল পৌনে ৪টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ জনের মত শিক্ষক প্রধান ফটকে ১০ মিনিটের মত অবস্থান নেন। এ সময় গণামধ্যমের উদ্দেশে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক সাজেদুল করিম।
তিনি বলেন, “আমরা ফটকে এসেছি শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি রয়েছে এটা জেনে। এখানে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে না ঘটে এই দিকটি বিবেচনায় আমরা এসেছি। আজকে আমাদের কোনো কর্মসূচি নেই।”

তিনি বলেন, “শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী পরিপূরক৷ শিক্ষার্থীদেরকে গণগ্রেপ্তার ও হয়রানি করলে বিশ্ববিদ্যালয় খেলার পরিবেশ তৈরি হবে না। যথাযথ কর্তৃপক্ষকে আমরা বলছি, যথাযথ ব্যবস্থা নিন।”
রাতে তুলে নেয় পুলিশ, ছাড়িয়ে আনলেন শিক্ষকেরা
সিলেটে মেস থেকে রাতে পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে চাকরি প্রার্থীসহ তিন শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ছাড়িয়ে এনেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষক।
বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে থানা থেকে মুচলেকা দিয়ে তাদেরকে ছাড়িয়ে আনা হয়৷ এর আগে বুধবার গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন নিহারীপাড়া এলাকার মেস থেকো তাদেরকে তুলে আনে পুলিশ৷
আটক তিন শিক্ষার্থী হলেন- শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মনির হোসেন এবং পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের মো. সোহাগ, সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আনাস মিয়া। তারা সবাই নিহারীপাড়ায় ব্লক সি-৭১ নম্বর বাসায় মেসে ভাড়া করে থাকেন৷
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষকরা কোতোয়ালি মডেল থানায় আসেন। সেখানে ওসির সঙ্গে দীর্ঘ দুই ঘণ্টা আলোচনা করে তাদেরকে ছাড়িয়ে আনেন।
এই শিক্ষকরা হলেন- গণিত বিভাগের অধ্যাপক আশরাফ উদ্দিন, অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম, খাদ্য প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক মোজাম্মেল হক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শাহ আতিকুল হক ও পরিসংখ্যান বিভাগের খালিদুর রহমান।
জানতে চাইলে অধ্যাপক আশরাফ উদ্দিন বলেন, “রাত ১১টায় আমরা খবর পাই যে, সন্দেহজনক শিক্ষার্থীদের আটক করা হয়েছে৷ তারা আইনগত প্রক্রিয়ায় দিকে যাচ্ছিলেন৷ পরে থানার ওসির সঙ্গে কথা বলে আমাদের জিম্মায় শিক্ষার্থীদেরকে ছাড়তে রাজি হন৷ শিক্ষার্থীরা এখন নিরাপদে আছেন৷”
এ বিষয়ে মহানগরীর কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন বলেন, “রাতে আমাদের কাছে খবর আসে যে, ওই মেসে মামলার আসামি কেউ কেউ অবস্থান করছেন। রাতে আমরা মেসে যাই। শিক্ষার্থীদের কয়েকজন দরজা খুলে দিলেও একটি রুমের দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে ভেতরে শিক্ষার্থীরা অবস্থান করছিলেন। আমাদের সন্দেহ হলে বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের রুম খুলে দিতে বলি। কিন্ত দেড় ঘণ্টা পর খুললে সন্দেহজনকভাবে তিনজনকে থানায় নিয়ে আসি। পরে শিক্ষকরা এলে শিক্ষার্থীদেরকে তাদের জিম্মায় দেওয়া হয়।”
জানতে চাইলে মেসে থাকা এইচএসসি পরীক্ষার্থী মামুনুর রশীদ বলেন, “রাত সাড়ে ৩টায় পুলিশের ওয়াকিটকির শব্দে ঘুম ভাঙে। পুলিশ কক্ষে সবকিছু তল্লাশি করে। বাড়িঘর কোথায়, কেউ কোনো দল করে কিনা সবাইকে তা জিজ্ঞেস করে। আমরা জানি, মেসের সবাই পড়াশোনা করে। তারপর সবার মোবাইলের সবকিছু চেক করে। পরে তিনজনকে তুলে নিয়ে গেছে। আমাকে নিতে চাইছিল, পরে আমি পরীক্ষার্থী বলায় ছেড়ে দিসে।”