Published : 13 May 2026, 09:54 AM
দেশীয় প্রজাতির মাছ রক্ষায় প্রজননকালে শিকার বন্ধ রাখতে ৫২ উপজেলায় গরিব মৎস্যজীবীদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে চার বছরে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
২০২১ সালের জুলাইয়ে গোপালগঞ্জ থেকে ১৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘দেশীয় মাছ এবং শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন’ নামের এই প্রকল্পটি যাত্রা শুরু করে।
প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ১০ জেলায় খাঁচায়, ধানক্ষেতে মাছ চাষ এবং বিভিন্ন স্থানে লাগসই প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি মাছের প্রজনন মৌসুমে গরিব জেলেদের মাছ শিকার থেকে বিরত রাখতে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন ১৬ শতাংশ বৃদ্ধির নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা এর মধ্যেই ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. খালিদুজ্জামান।
তিনি বলেন, “১০ জেলায় ২০২১ সালে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন ছিল ৪ লাখ টন। ১৬ শতাংশ বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি কাজ শুরু করে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৪ লাখ ৬৪ হাজার টন।
“২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রকল্প এলাকায় অন্তত ৫০ হাজার টন মাছের উৎপাদন বেড়েছে। চলতি বছরের ৩০ জুন এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। আমাদের কাছে যে তথ্য আছে, তাতে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।”
ওই কর্মকর্তা বলেন, “গত ৫ বছরে প্রকল্প এলাকায় ১৬ হাজার ৬৫০ পরিবারের মধ্যে বকনা বাছুর, ছাগল ও ভ্যান বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৪০৫ পরিবারে দুটি করে ছাগল, ৭ হাজার ৯৪৫ পরিবারে একটি করে বকনা বাছুর এবং ৩০০ পরিবারে একটি করে ভ্যান দেওয়া হয়েছে।
“এতে গবির জেলে পরিবারগুলো বিকল্প আয়ের অবলম্বন পেয়েছে। এখন দেশীয় মাছের প্রজনন মৌসুম চলছে। এ সময়ও সেসব জেলেদের মাছ শিকার থেকে বিরত রাখা হয়েছে। এ উদ্যোগ জলাশয়ে দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।”
তিনি বলেন, “প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তম মৎস্যচাষ অনুশীলনের মাধ্যমে নিরাপদ মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে সৃষ্টি করা হয়েছে ৩০ হাজার দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মৎস্যজীবী। অবৈধ জাল উদ্ধার করে ধ্বংস; দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বৃদ্ধির জন্য ২০০ অভয়াশ্রম স্থাপন করা হয়েছে।”
তিনি গোপালগঞ্জ জেলার পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ২০২৪ সালে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন ছিল ১১ হাজার ৯৪ টন ৭৬০ কেজি। ২০২৫ সালে সেটা ১২ হাজার ৯৯০ টন ৮৫০ কেজি হয়েছে।
প্রকল্পের সুফলভোগী গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার পিঞ্জুরী ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের মৎস্যজীবী রব হাওলাদার স্ত্রী জরিনা বেগম বলেন, তার স্বামী খাল-বিল থেকে মাছ ধরে সংসার চালায়। মাছের ডিম ছাড়ার সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে মৎস্য অফিস থেকে তার স্বামীকে উদ্বুদ্ধ করা হয়।

“এ সময় আমাদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে ওই অফিস থেকে ২ বছর আগে ২টি ছাগল দেওয়া হয়। আমি এ ছাগল লালন-পালন করছি। দুটা ছাগল থেকে ১৩টা ছাগল হয়েছে।”
এ নারী আরও বলেন, “ইতোমধ্যে ২টি ছাগল ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। সামনের কোরবানীতে আরো ২টি ছাগল ২২ হাজার টাকায় বিক্রি করব। এখন মাছের পেটে ডিম, তাই আমার স্বামী মাছধরা বন্ধ রেখেছে।
“হাট-বাজারে কাজ করছে। ছাগল বিক্রি করে সংসারের বাড়তি আয় হচ্ছে। বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা করায় আমরা ছেলে-মেয়ে নিয়ে এখন বেশ ভালো আছি।”
মৎস্যজীবী রব হওলাদার বলেন, “মাছ ধরা বন্ধ রাখায় আমাদের এলাকার খাল-বিলে দেশীয় মাছ বেড়েছে। এখন জলাশয়ে শিকার মৌসুমে নামলেই মাছ পাওয়া যায়। তাই মাছের ডিম দেওয়ার মৌসুমে মাছ ধরি না।”
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার উরফী ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামের মৎস্যজীবী ফায়েক খানের স্ত্রী রহিমা বেগম বলেন, “১ বছর আগে আমার স্বামীকে ৭০ কেজি ওজনের একটি বকনা বাছুর দিয়েছে মৎস্য অফিস। এটি আমি পালছি। একটি বাচ্চা দিয়েছে। প্রতিদিন ২ লিটার দুধ বিক্রি করছি। এতে সংসারের আয় বেড়েছে।
“ফলে স্বামী মাছ ধরা বন্ধ রেখে কৃষি জমিতে দিনমজুরের কাজ করছে। এতে আমাদের এলাকার নদী-খাল ও বিলে দেশি মাছ আগের থেকে বেশি বেড়েছে।”

কোটালীপাড়া উপজেলার পশ্চিম ধারাবাশাইল গ্রামের মৎস্যজীবী সুমন্ত অধিকারীর ছেলে সঞ্জয় অধিকারী বলেন, “আমার বাবা মাছ ধরে সংসার চালান। আমি বাবার সাথে মাছ ধরি। মাছের পেটে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ডিম থাকে। তাই এ সময়ে মাছ ধরা থেকে আমাদের বিরত রাখতে তিন বছর আগে মৎস্য অফিস থেকে একটি ভ্যান দেওয়া হয়।
“বাবার বয়স হয়েছে। তাই তিনি ভ্যান চালাতে পারেন না। আমি ভ্যান চালাই। এখান থেকে যা পাই, তা দিয়ে ৬ জনের সংসার চলে।
“তবে তখন থেকে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছি। এতে আমাদের এলাকায় কৈ, শিং, মাগুর, পুঁটি, ট্যাংরা, মেনি, খলিশা, ফলিসহ বিভিন্ন মাছ বেড়েছে।”
দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ প্রকল্পের কোটালীপাড়া উপজেলা কমিটির সদস্য তোতা মিয়া হওলাদার বলেন, “উৎপাদন বৃদ্ধি ও মৎস্য সম্পদ রক্ষায় আমরা গরিব জেলে নির্বাচন করি। তারপর তাদের পরিবারে বকনা বাছুর, ছাগল ও ভ্যান দিয়েছে।
“এসব পেয়ে পরিবারগুলো বিকল্প আয়ের সুযোগ পেয়েছে। তারা চলতি প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছে। এ কারণে গত ৫ বছরে কোটালীপাড়ায় দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন বেড়েছে।”
তিনি বলেন, “চলতি বছরের জুনে এ প্রকল্প শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সংসদ সদস্য এসএম জিলানীর কাছে এ ধরনের নতুন প্রকল্প গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

“এতে দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। মৎস্যজীবীরা উপকৃত হবেন। পাশাপাশি দেশীয় মাছ থেকে বিশাল জনগোষ্ঠী প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করতে পারবে।”
গোপালগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “এ প্রকল্পের আওতায় মাছের প্রজনন মৌসুমে জেলেদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ কারণে গরিব জেলেরা প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকছেন।
“এ ছাড়া অভিযান চালিয়ে অবৈধ জাল ও মাছ শিকারের সরঞ্জাম উদ্ধার করে ধ্বংস অব্যাহত রয়েছে। এতে প্রতি বছর জেলায় ২ হাজার টন দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
সরকার এ ধরনের নতুন প্রকল্প গ্রহণ করে, সারাদেশে ছড়িয়ে দিলে মাছের উৎপাদন বাড়বে ও দেশীয় মৎস্য সম্পদ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে, বলেন তিনি।