Published : 09 Sep 2026, 05:50 PM
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং এর সঙ্গে সমন্বয় না করে অপরিকল্পিতভাবে ফুটপাত ও সাইকেল লেন নির্মাণ বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থীরা।
বুধবার বেলা ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এ কর্মসূচি পালন করেন ‘জাহাঙ্গীরনগর বাঁচাও আন্দোলন’-এর সদস্যরা।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজ চলমান আছে। কিন্তু মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন কমিটির সঙ্গে কোনো ধরনের সমন্বয় ছাড়াই প্রায় ২৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে ৮ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার সড়ক পুনর্নির্মাণ, ফুটপাত ও পৃথক সাইকেল লেন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বুধবার প্রকল্পটির উদ্বোধন হওয়ার কথা থাকলেও মানববন্ধন শুরুর আগেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক বিজ্ঞপ্তিতে সেটি স্থগিতের ঘোষণা দেয়া হয়।
এমন পরিপ্রেক্ষিতে মানববন্ধনে দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী সজীব আহমেদ জেনিচ বলেন, সাত বছর ধরে আন্দোলনের ফলে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের জন্য কাজ শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু এখনো আর্থিক সংকুলান ও টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। এগুলো শেষ করে দ্রুত মাস্টারপ্ল্যানের কাজ দৃশ্যমান করতে হবে।
জেনিচের অভিযোগ, প্রস্তাবিত ফুটপাত ও সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাটি সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার প্রশাসনের। বর্তমান প্রশাসনও কোনো সামগ্রিক পরিকল্পনা ছাড়াই সেটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
তার দাবি, কেন্দ্রীয় স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছাড়া এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে তা ভবিষ্যতে আরও সমস্যার সৃষ্টি করবে।
তিনি বলেন, উন্নয়নের নামে এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩ হাজার গাছ কাটা হয়েছে এবং অসংখ্য লেক ও জলাধার ভরাট করা হয়েছে। এর ফলে ক্যাম্পাসে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও লেক শুকিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার স্বার্থে তাই দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান জরুরি।
মানববন্ধনে সমাপনী বক্তব্যে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অদ্রি অংকুর বলেন, ক্যাম্পাসের জলাধার, গাছপালা ও সড়কব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়ায় খণ্ডিত ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন এসব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মূল সড়ক ঘেঁষে অপরিকল্পিতভাবে নতুন কলা ভবন নির্মাণের কারণে ক্লাস চলাকালে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য সড়ক বন্ধ রাখতে হয়। এটি প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার একটি উদাহরণ। টিএসসি সংলগ্ন পুকুর ভরাটের কারণে বর্ষাকালে ক্যাম্পাসে কৃত্রিম জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
তিনি পৃথক ও সামগ্রিক পরিবেশগত মূল্যায়ন (এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট) ছাড়া কোনো সড়ক প্রশস্তকরণ বা ফুটপাত নির্মাণ না করার দাবি জানান।
একই সঙ্গে আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় সম্প্রসারণ, আবাসন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ বিবেচনায় নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের দাবি জানান অদ্রি অংকুর।
এ বিষয়ে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন কমিটির কো-অর্ডিনেটর ও সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আখতার মাহমুদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রেনেজ, স্যুয়ারেজ, সড়কের প্রস্থ ও পরিবহনব্যবস্থা আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের চাহিদা বিবেচনায় পরিকল্পনা করা হবে।
পাশাপাশি যানবাহন ও পথচারী চলাচলের জন্য সড়কগুলোর বিস্তারিত মূল্যায়নও থাকবে।
তিনি বলেন, “কিন্তু এই কাজ (ফুটপাত-সাইকেল লেন নির্মাণ) শুরুর আগে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন কমিটির সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। যেহেতু কাজটির ডিজাইন ও সার্বিক বিষয় নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি, সেহেতু এ বিষয়ে এই মুহূর্তে কোনো অ্যাসেসমেন্ট দেওয়া সম্ভব নয়।”
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন বলেন, “একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব উন্নয়নকাজ কী বন্ধ থাকবে?”
তিনি বলেন, ‘টেকনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট কমিটির আলোচনাতেও উঠে এসেছে যে, অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চলমান কাজগুলো চলবে এবং একই সঙ্গে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজও চলবে।’
তিনি আরও বলেন, “ড্রেনেজ সিস্টেম ও ইটিপি সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যানের ডিপিপিতে আসবে। কেন্দ্রীয় ড্রেনেজ সিস্টেম ও ইটিপি সিস্টেমের কাজ শুরু করার পরও সেগুলো মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে সমন্বয় করা যাবে। এতে কোনো অসুবিধা হবে না।”
এর আগে গত ২৭ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩তম বার্ষিক সিনেট সভায় উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, “নতুন মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের মাধ্যমে একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, গবেষণা অবকাঠামো, প্রশাসনিক ভবন, সড়ক যোগাযোগ, সবুজায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণ, সব বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে।”
তবে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের আগে প্রস্তাবিত সড়ক প্রশস্তকরণ ও সাইকেল লেন নির্মাণের কাজ শুরু হবে কি না, এ বিষয়ে উপাচার্যের মন্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।