জন্মের ১৮ দিনে এসিডদগ্ধ সোনালী এবার এসএসসি পরীক্ষায়

সোনালীর স্বপ্ন আগামীতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজে অবদান রাখা।

সাতক্ষীরা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 17 Sept 2022, 07:28 AM
Updated : 17 Sept 2022, 07:28 AM

রাতে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় মা-বাবাসহ এসিড হামলার শিকার হয়েছিলেন মাত্র ১৮ দিন বয়সী শিশু সোনালী। তার বয়স এখন ১৯ বছর। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তিনি এবার এসএসসি পরীক্ষায় দিচ্ছেন। 

সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার নকাটি গ্রামের নুর ইসলাম ও খোদেজা দম্পতির সন্তান সোনালী খাতুন।

২০০২ সালের ১৯ নভেম্বর রাতের অন্ধকারে দুর্বৃত্তদের ছোড়া এসিডে মা-বাবার সঙ্গে শিশু সোনালীর মুখ ও শরীর ঝলসে যায়। জমিজমা সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে তাদের পরিবারটি এসিড সন্ত্রাসের শিকার হয়।

সে দিনের সেই ছোট্ট সোনালী পাটকেলঘাটা থানার কুমিরা পাইলট গার্লস হাইস্কুল থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন।

সোনালীর এ পর্যন্ত টিকে থাকা ও পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া খুব সহজ ছিল না। তাকে স্কুলে ভর্তি করার পর অন্য শিক্ষার্থীরা তাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করেনি। প্রথম দিকে স্কুলে যেতে নানা সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে।

এক্ষেত্রে একশনএইড বাংলাদেশ, বেসরকারি সংগঠন স্বদেশ, স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক ব্যক্তি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সমাজের সাধারণ মানুষেকে কাউন্সেলিং, সামাজিক সম্পৃক্ততা করে সোনালীর স্কুলে পড়ালেখা অব্যাহত রাখার প্রয়াস চালানো হয়।

ফলে তার শিক্ষা জীবনের মাধ্যমিক স্তর সফলতার সঙ্গে শেষ হতে যাচ্ছে। তবে উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার জন্য তার দরকার আর্থিক ও সামাজিক সহযোগিতা।

বেসরকারি সংগঠন স্বদেশের পরিচালক মাধব দত্ত জানান, সোনালির বাবা নুর ইসলামের বাবা এবং চাচা দুই ভাই। নুর ইসলামের চাচার বাঁশঝাড় প্রতিবেশীর জমিতে পড়া এবং সেই ঝাড়ের বাঁশ কাটাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি; পরে থানায় মামলা হয়।

মামলার জেরে ২০০২ সালের ১৯ নভেম্বর গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা সোনালী ও তার মা-বাবাকে এসিড নিক্ষেপ করে ঝলসে দেয়।

এসিডে দগ্ধ মা-বাবার সঙ্গে সোনালীকে প্রথমে স্থানীয় মির্জাপুর হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে তাদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের দীর্ঘ মেয়াদী চিকিৎসা হয়। সোনালীকে ঢাকায় নিয়ে এক বছর উন্নত চিকিৎসাও দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় থানায় মামলা হলে আসামিরা দীর্ঘদিন জেল খাটে। মামলাটি নিষ্পত্তি হয়ে যায়।

মাধব দত্ত আরও জানান, একশনএইড বাংলাদেশের প্রিভেনশন অব এসিড ভায়োলেন্স প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় এনজিও স্বদেশ-এর সহযোগিতায় সোনালীর পরিবারকে গঠনমূলক কর্মশালায় অন্তর্ভুক্ত করে সহযোগিতা করা হয়। একশনএইড বাংলাদেশের সহযোগিতায় ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সোনালী পড়ালেখায় সহযোগিতা হিসেবে উপবৃত্তি পেয়েছেন; ১০ শতক জমি বন্ধক রেখে দেওয়া হয়েছে। জেলা এসিড কন্ট্রোল কমিটি থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন। তার পড়ালেখায় আর্থিক সহযোগিতা অব্যাহত আছে।

এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে সোনালীর সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। এ সময় তিনি জানান, এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরে তিনি খুব খুশি।

তার স্বপ্ন আগামীতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে অন্যদের সহযোগিতা করা। এ লক্ষ্যে সমাজের সব পর্যায়ের মানুষের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন সোনালী।

সোনালীর মা খোদেজা খাতুন বলেন, “১৮ দিন বয়সের আমাদের ছোট্ট সোনালী আক্রান্ত হওয়ার পর অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ, স্বদেশ ও সেতুবন্ধন গড়ি নেটওয়ার্কের (এসবিজিএন) সহযোগিতায় তার পড়ালেখা চালাতে পেরেছে।”

তিনি বলেন, “এজন্য আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে তার শিক্ষক ও সব সংগঠনকে, বিশেষ করে স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব চন্দ্র দত্ত, অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ নুরুন নাহার এবং তার শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।”

কুমিরা পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিক্ষক গৌতম কুমার দাশ বলেন, “সোনালী সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে আজ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে যাওয়ার পর্যায় এসেছে। এজন্য ওর অদম্য সাহস ও সবার সহযোগিতা এতদূর আসতে সাহায্য করেছে। আমাদের স্কুলের সোনালী এ পর্যন্ত সুনামের সঙ্গে লেখাপড়া করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। আমরা স্কুলের পক্ষ থেকে ওকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করেছি। আগামীতে সোনালীর জন্য আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক