Published : 17 Aug 2024, 12:39 PM
তাপপ্রবাহসহ বিভিন্ন কারণে চুয়াডাঙ্গায় আমের উৎপাদন ‘কমেছে’। বাগান পরিচর্যার জন্য ওষুধ, সেচ এবং শ্রমিকের পেছনে কৃষকরা যা খরচ করেছেন তা উঠে আসছে না। আম বাগানের ওপর নির্ভরশীল কৃষকরা এ বছর ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা জানান, জেলায় দুই হাজার ৩০৪ হেক্টর জমিতে আম বাগান আছে। গত বছর ৩০ হাজার ৮১০ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। এবারও আম উৎপাদনের একই লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
“বৃষ্টি না হওয়ায় এ বছর আমের আকার বড় হয়নি। তাপপ্রবাহেও ক্ষতি হয়েছে। আমের ফলন কমেছে” বলেন তিনি।
সদর উপজেলার দিননাথপুর গ্রামের হারিস চৌধুরী ও তার ভাইয়ের ২৩ বিঘা জমিতে আম বাগান রয়েছে। এবার আম ‘কম’ আসায় বাগান পরিচর্যার খরচ উঠবে না বলে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে এ কৃষকের কপালে।
হারিস বলেন, “কোনো বছর আমের ফলন ভালো হলে, পরের বছর কম হবে এটাই নিয়ম। সেই নিয়মে গত বছর আমাদের বাগানে ভরপুর আম ছিল। এ বছর কম হবে আগেই জানতাম। কিন্তু এতো কম হবে তা ভাবিনি।
“এ বছর হিমসাগর গাছে একেবারেই আম আসেনি। আম্রপালি গাছে কিছু আম এসেছে।”
তিনি বলছিলেন, “প্রতি বছরই বাগান পরিচর্যা করতে হয়। এ জন্য বিঘাপ্রতি খুব কম হলেও ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। এ বছর বাগানের পেছনে আমরা যা খরচ করেছি, তা উঠে আসবে না।”
কৃষক হারিস বলেন, “আমাদের কিছু কাটিমন আমের গাছ আছে। এ বছর সেগুলোতে ফলন হবে। এখন মুকুল এসেছে। বছরে অন্তত তিনবার কাটিমন গাছ থেকে আম পাওয়া যায়। কাটিমন আমগাছগুলো থেকে আমাদের লোকসান হবে না।”
সদর উপজেলার হানুরবাড়াদী গ্রামের কৃষক দোয়াল্লিনের দেড় বিঘা জমিতে ২৬টি বিভিন্ন ধরনের আমগাছ আছে।
তিনি বলেন, “মৌসুমের শুরুতে যা মুকুল এসেছিল, তার অর্ধেকই ঝড়ে পড়ে গেছে তীব্র তাপে। তাপের কারণে সেচ খরচও বেশি হয়েছে। গাছে যে আম টিকে আছে; তাতে লোকসান হবে না। আমের বাজারদর ভালো।
“এ বছর জেলায় আমের ফলন কম হওয়ায় দাম কিছুটা বেশি। গাছে যে পরিমাণ আম থাকার কথা ছিল, তার অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে। গাছে এখন যা আম আছে, তাতে লোকসান হবে না। কিন্তু তীব্র তাপ না থাকলে ভাল লাভ হত।”
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বুজরুক গড়গড়ি গ্রামের আম বাগান মালিক কুদ্দুস মহলদার বলেন, “মৌসুমের শুরুতে তীব্র তাপে মুকুল ঝরেছে। গুটি আমও ঝরে পড়েছে তীব্র তাপে। তাপের কারণে এ বছর খুবই ক্ষতি হয়েছে।”
“বেশিরভাগ বাগানেই আম নেই বললেই চলে। এ বছর কোনো বাগান মালিকই লাভবান হতে পারবেন না। কিছু কিছু বাগান থেকে কোনো রকমে খরচ উঠে আসবে।”
তিনি বলেন, “এবারের আবহাওয়া ছিল; একেবারেই আলাদা। এপ্রিলের শুরু থেকেই তীব্র তাপে গরম হয়ে উঠে চুয়াডাঙ্গা। গাছে তখন গুটি আম। ওই সময় আম বাগানের জন্য বৃষ্টি ছিল জরুরি; বৃষ্টি হয়নি। বরং তাপের কারণে আম ঝরে পড়েছে। প্রতি বছর আমরা দেখে আসছি, বৈশাখের শুরুর দিকে বৃষ্টি থাকেই।”
“এ বছর তা-ও হয়নি। বাগান মালিকদের সেচ খরচ অনেক বেশি হয়েছে। হিসেব করলে দেখা যায়, অন্য বছরের চেয়ে খরচ বেড়েছে কিন্তু গাছে আম ধরে রাখা যায়নি। যা আম আছে তার আকারও বড় হয়নি। দুদিক থেকে লোকসান। ফলন কম এবং খরচ বেশি।”
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জামিনুর রহমান বলেন, তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেললে তাকে তাপপ্রবাহ বলা হয়ে থাকে। এপ্রিলের ১ তারিখ থেকেই শুরু হয়েছে তাপপ্রবাহ। ১ এপ্রিল জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
“এপ্রিল মাসের প্রথম ছয় দিন চুয়াডাঙ্গার তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রির নিচে নামেনি। মাঝে কয়েকদিন তাপমাত্রা ওঠানামা করেছে। তারপর ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে টানা তাপপ্রবাহ।
তিনি বলেন, এই সময়ে মৃদু, মাঝারি, তীব্র কিংবা অতি তীব্র তাপপ্রবাহ থেকেছে চুয়াডাঙ্গায়। এই অবস্থা ছিল মে মাসের শুরুর কয়েকদিন পর্যন্ত। পুরো এপ্রিল মাসের মধ্যে মাত্র একদিন চুয়াডাঙ্গায় অতি সামান্য বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ২৪ এপ্রিল ১ দশমিক ৬ মিলিমিটার।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মসলেউদ্দিন বলছিলেন, সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে আম গাছে মুকুল আসে। এ বছর মুকুল এসেছে দেরিতে; মার্চ মাসের দিকে। সে সময়ও রোদের তাপ ছিল। মার্চ ও এপ্রিল মাসে বৃষ্টি ছিল না।
“রোদের তাপ বেশি থাকায় আমরা কৃষকদের সেচ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। তখন মুকুল ঝরে গেছে অনেক। এপ্রিলে রীতিমত তাপপ্রবাহ শুরু হয়ে যায়। আমের গুটিও ঝরে পড়ে।”
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা বলেন, বৃষ্টি না হওয়ায় সেচ খরচ বেড়েছে কৃষকের। আমরা কৃষকদের নিয়মিত সেচ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। তারপরও এ বছর ৩০ হাজার ৮১০ টন আম পাওয়া যাবে বলে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
১৬ মে থেকে জেলায় আম সংগ্রহ শুরু হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মে এবং পুরো জুন মাসজুড়ে চলবে আম সংগ্রহ। তারপরও কিছু আম গাছে থাকবে। সেগুলো জুলাই মাসে সংগ্রহ করা হবে।