Published : 23 Sep 2025, 10:29 AM
ভোরবেলায় চুলা ধরানো, হাঁড়ি-পাতিল ধোয়া, রান্না আর সংসারের নিত্যকাজ সামলে যখন গ্রামীণ নারীদের একটু অবসর নেওয়ার পালা; তখনই তাদের হাত ভিজে ওঠে কাদামাটিতে।
ধীরে ধীরে সেই মাটির ছোঁয়ায় জন্ম নেয় দেবীমূর্তির কাঠামো।
তারা খড়ের গায়ে মাটি মেখে আকার দেন, রোদে শুকিয়ে তোলেন, তারপর রং মাখানো তুলির আঁচড় দেন তাতে। এভাবেই সংসারের ‘দেবীস্বরূপ’ নারীদের কোমল হাতেই তৈরি হচ্ছে দুর্গা প্রতিমা।
কুড়িগ্রামের বিভিন্ন কুমোরপাড়া ও পালপাড়ার প্রতিমা তৈরির কারখানাগুলোতে নারীদের ব্যস্ততা এবারই ‘প্রথম’ চোখে পড়ছে। বছরের পর বছর ধরে পুরুষরাই এই দেবীর প্রতিমা তৈরির প্রধান কারিগর ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ বছর জেলায় প্রতিমার চাহিদা প্রায় ‘দ্বিগুণ’ হয়েছে। ফলে নারী সদস্যরা সংসারের কাজের পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির কাজও করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, নারীরা তাদের স্বামী, বাবা ও ভাইদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন। প্রতিমার কাঠামো গড়া থেকে শুরু করে রং, অলঙ্কার, শাড়ির সব কাজই করছেন তারা। সংসার সামলাতে যারা প্রতিদিন লড়াই করেন, সেই নারীই হয়ে উঠেছেন শিল্পী।
রাজারহাট উপজেলার বৈদ্যের বাজার গ্রামের বেবী মালাকর বলেন, “এবার জেলায় গতবারের চেয়ে দ্বিগুণ পূজা হচ্ছে। মণ্ডপগুলো রেডিমেড প্রতিমার অর্ডারও দিয়েছে। আগে সংসারের কাজ সামলে প্রতিমার কাজে হাত দেওয়া হয়নি।
“কিন্তু এ বছর এত চাপ, বাধ্য হয়ে সংসারের কাজ ফেলে স্বামীকে সাহায্য করছি।”
কুড়িগ্রাম পূজা উদ্যাপন পরিষদ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলার নয়টি উপজেলায় মোট ৫১৭টি পূজা মণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে।
এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৫৫টি, রাজারহাটে ১৩১টি, উলিপুরে ১২৫টি, চিলমারীতে ২৪টি, নাগেশ্বরীতে ৬৯টি, ভূরুঙ্গামারীতে ২০টি, রৌমারীতে ৭টি, রাজিবপুরে ১টি, ফুলবাড়ীতে ৬৫টি এবং কুড়িগ্রাম পৌরসভায় ২০টি। যা গত বছরের তুলনায় ৩২টি বেশি।
শুধু গৃহবধূ নয়, এসব এলাকার কিশোরী মেয়েরাও প্রতিমা গড়ার কাজ শিখে নিচ্ছেন। মহালয়ার পর চারপাশে পূজোর আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। স্কুল পড়ুয়ারা কিশোর-কিশোরীরা পড়াশুনোর চিন্তা ফেলে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্য শোনার অপেক্ষা করছে।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সপ্তমী মালাকর বলেন, “এক সপ্তাহ ধরে স্কুলে যাই না। বাবা একা এত কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছে। গতবার আমরা সাতটা প্রতিমা বানালেও এবার অর্ডার এসেছে পনেরোটা।
“তাই আমিও মাটি গড়তে, কাঠামো বাঁধতে শিখছি। বাবাকে সাহায্য করছি। এখন মণ্ডপে ঢাকের বাদ্য শোনার অপেক্ষা করছি।”
সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ি বাজারের পূজা রানী আগে প্রতিমার অলংকার বা সাজসজ্জার কাজের সঙ্গে খুব একটা যুক্ত ছিলেন না। প্রথমবারের মতো মায়ের প্রতিমা তৈরি করছেন বলে তিনি জানান।
পূজা বলেন, “আগে শুধু প্রদীপ, ধূপকাঠি বা কলস বানাতাম। কিন্তু এবার প্রতিমার অলংকার, মুকুট, গায়ের রং দেওয়ার কাজ করছি। ভিন্ন ধরনের আনন্দ লাগছে নিজের হাতে দেবীমূর্তি সাজাতে।”
বংশ পরম্পরায় প্রতিমার তৈরির কাজ করে আসা কালিকান্ত পাল বলেন, “সারা বছর আমরা মাটির হাঁড়ি-পাতিল তৈরি করে সংসার চালাই। দুর্গাপূজার সময়ই আসে বড় অর্ডার, তখনই একটু স্বস্তি মেলে।
“গতবার আটটা প্রতিমা বানিয়েছি, এবার অর্ডার এসেছে চৌদ্দটার। একা হাতে সম্ভব নয়, তাই ঘরের মেয়ে-বউরা কাজে লেগে পড়েছে। তাদের সাহায্য না পেলে এত কাজ শেষ করা যেত না।”