Published : 20 Aug 2025, 09:33 PM
কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষকদের আন্দোলন চলাকালে আটক ২৭ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
বুধবার সকালে আটকের সাত ঘণ্টা পর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সর্বদলীয় বৈঠকের মাধ্যমে উখিয়া থানা থেকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জসীম উদ্দিন।
তিনি বলেন, “২৫ অগাস্ট প্রধান উপদেষ্টা কক্সবাজার সফরে আসবেন। তার আগে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে সড়কে বিশৃঙ্খলা করবে না এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করবে না শর্তে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
আটকের কারণ জানতে চাইলে জসীম উদ্দিন বলেন, তারা সড়কে বিশৃঙ্খলা করছিলেন। জনগণের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদেরকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল।
আটকদের মুক্তির আগে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব এস এম সুজা উদ্দিন। এতে বিএনপি, এনসিপি, জামায়াতে ইসলামী, গণ অধিকার পরিষদের নেতাসহ ২০ সদস্যের একটি সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।
বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে সুজা উদ্দিন বলেন, “আমরা একটা ঐক্যমত পেপার করেছি। সেখানে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি যাতে আদায় হয় এবং তাদের ওপর যে অন্যায় হয়েছে সে বিষয়গুলোও আছে। দাবি আদায়ে সর্বোচ্চ জায়গা পর্যন্ত কথা বলা হবে।”
বিকাল ৫টার দিকে মুক্তি পাওয়ারাসহ সর্বদলীয় প্রতিনিধিদল ও আন্দোলনকারীরা উখিয়া শহীদ মিনারে জড়ো হন।
সেখানে উখিয়া উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সরোয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, “২৫ অগাস্ট কক্সবাজারে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সফর থাকায় আন্দোলন স্থগিত করার পাশাপাশি দাবি আদায়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
আন্দোলনে সংহতি জানাতে গিয়ে পুলিশের হাতে আটক হন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সমন্বয়ক ও বাগছাসের সংগঠক জিনিয়া শারমিন রিয়া।
বিকালে থানা থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তির পাশাপাশি সৃষ্ট ঘটনার বিচারে বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানান তিনি।
শিক্ষক আন্দোলনের সমন্বয়ক শামিম হোসেন বলেন, অন্যায়ভাবে গালিগালাজ করে তাদের আটক করে পুলিশ। এমনকি হাতকড়া পরিয়ে তাদের নির্যাতন করা হয়েছে। এ ঘটনার বিচার দাবি করেন তিনি।
এর আগে সকাল ৮টার দিকে আন্দোলন চলাকালে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে নারীসহ তিন শিক্ষক গুরুতর আহত হন। আটক করা হয় আন্দোলনের মুখপাত্র সাইদুল ইসলাম শামীমসহ অন্তত সাতজনকে।
এর কিছুক্ষণ পর বেলা ১১টার দিকে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আহতদের দেখতে যাওয়া আন্দোলনকারীদের আবার ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।
এক পর্যায়ে সেখান থেকে বাগছাসের নেতা জিনিয়া শারমিন রিয়াসহ আরও ২০ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
এদিকে আটকের খবর ছড়ালে উখিয়া থানা ফটকে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন আন্দোলনকারী। এ সময় থানার দিকে মাইক লাগিয়ে ওসির পদত্যাগ দাবি করে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকেন তারা। এক পর্যায়ে সেখানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পরে দুপুর দেড়টার দিকে থানায় প্রবেশ করেন সর্বদলীয় প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। বেলা ৩টায় আন্দোলনকারীরা ফটকের তালা ভেঙ্গে থানার ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে আরেক দফা লাঠিপেটা করে পুলিশ। এতে এনসিপির জেলা সংগঠক খালিদ বিন সাইদ ও সংবাদকর্মীসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের শিক্ষকদের চাকরি থেকে অব্যাহতি
উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থানীয় বাংলাদেশি শিক্ষকরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। জুলাইয়ে অর্থ সংকট দেখিয়ে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলনে নামেন চাকরিচ্যুতরা।
সোমবার সকাল ৮টা থেকে বিকালে ৪টা পর্যন্ত কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষকরা। এ সময় উভয়পাশে শত শত গাড়ি আটকা পড়ে। ভোগান্তিতে পড়েন চালক ও যাত্রীরা।
চাকরিচ্যুত শিক্ষকরা জানান, প্রশাসন সমাধানের আশ্বাস দিলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ফান্ড বন্ধ করায় ক্যাম্পের প্রায় সব প্রকল্প ঘিরে অর্থ সংকট দেখা দিয়েছে। ইউনিসেফেরও অর্থ সংকট রয়েছে।
তিনি বলেন, “চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করার কথা জানিয়েছে তারা (ইউনিসেফ)। যদি টাকা না পায় কী করার আছে। তবে স্থানীয়রাও তো ক্ষতিগ্রস্ত, এসব চাকরির মাধ্যমে তারা কিছুটা স্বস্তি পায়।”
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, “শিক্ষকদের প্রকল্পটি ইউনিসেফের অর্থায়নে হয়ে থাকে। অর্থ সংকটের কারণে ওই প্রকল্পের এক হাজার ১৭৯ জন স্থানীয় শিক্ষকের চাকরির চুক্তি শেষ হয়েছে।
“তবে শিক্ষকদের আন্দোলনের মুখে একটি বৈঠক হয়, সেখানে এক মাসের মধ্যে ইউনিসেফ তহবিল সংগ্রহ করতে পারলে শিক্ষকদের চাকরিতে পুনর্বহালের চেষ্টা চালানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক মাস পার হলেও তহবিল সংগ্রহ হয়নি।”
তিনি বলেন, এর মধ্যে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের মাধ্যমে আশ্রয় শিবিরে ১৫০টি শিক্ষাকেন্দ্র চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
চাকরি হারানো শিক্ষকদের মধ্য থেকে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানান জেলা প্রশাসক সালাহউদ্দিন।
এ প্রসঙ্গে ইউনিসেফের বক্তব্য জানার চেষ্টা চলছে।
উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের বিক্ষোভে 'পুলিশের
কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে চাকরিচ্যুত শিক্ষকদের অবরোধ, যানজটে ভোগান্তি