Published : 27 Jan 2026, 05:50 PM
চার দলীয় জোট সরকার যদি দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে থাকে, তাহলে জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতা তখন কেন পদত্যাগ করেনি—সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
তার ভাষ্যে, “আপনারা নিশ্চয়ই পত্রপত্রিকায় দেখেছেন, এই মুহূর্তে একটি রাজনৈতিক দল যেই স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে, সেই স্বৈরাচারের মুখের ভাষা ব্যবহার করছে বিএনপিরই বিরুদ্ধে। ঠিক সেই স্বৈরাচার যেভাবে বলতো, তাদেরই ভাষা ব্যবহার করছে; বিএনপি তাদের বক্তব্য যে দুর্নীতিতে বলে চ্যাম্পিয়ন ছিল।
“তো আমার প্রশ্ন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাদেরও তো দুইজন সদস্য বিএনপির সরকারে ছিল, ছিল না? ছিল। তো বিএনপি যদি অতই খারাপ হয়, তাহলে ওই দুই ব্যক্তি কেন পদত্যাগ করে চলে আসেনি?”
মঙ্গলবার বিকালে ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ মাঠে নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন তারেক রহমান।
জামায়াত নেতাদের ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “কেন পদত্যাগ করে চলে আসেনি? এই জন্য পদত্যাগ করে তারা আসেনি, তারা সরকারে ছিল এবং তারা ভালো করেই জানত যে খালেদা জিয়া কঠোর হস্তে দুর্নীতি দমন করছে।
“এবং যেই দলটি এখন এই কথা বলছে, তাদের যে দুই সদস্য বিএনপি সরকারের অংশ ছিল; তারা ভালো করেই জানতেন যে, খালেদা জিয়া দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় না।”
২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারে মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন জামায়াতে ইসলামের তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী এবং সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ। নিজামীকে প্রথম কৃষিমন্ত্রী করা হয়েছিল, পরে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। মুজাহিদ ছিলেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে নিজামী ও মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, “সব ধরনের আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলে, খালেদা জিয়ার সময় দেশ দুর্নীতিতে নিম্নগতিতে ছিল। এবং খালেদা জিয়া যখন ২০০১ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তখন ধীরে ধীরে বাংলাদেশ দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে বের হতে শুরু করল।
“এবং যেই দল এই কথা বিএনপিকে এভাবে দোষারোপ করে, তাদের দুই সদস্যের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত সরকারে থাকাই প্রমাণ করে যে, নিজেরাই নিজেদের মানুষ সম্পর্কে কত বড় মিথ্যে কথা তারা বলছে!”
সারাদেশে নির্বাচনি প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে তারেক রহমান সড়কপথে ময়মনসিংহ পৌঁছান বেলা সাড়ে ৩টায়। মঞ্চে তরেক রহমানের সঙ্গে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানও ছিলেন। এ জনসভায় ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোণা ও শেরপুরের দলীয় নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

‘একাত্তরের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকুন’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপিকে জয়ী করতে একাত্তরের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, “১৯৭১ সালে যুদ্ধ হয়েছিল। তরুণ-যুবক যারা, তারা আপনারা বইয়ের পাতায় পড়েছেন; মুরুব্বি যারা আছে, আমাদের বয়েসী যারা আছে, তারা দেখেছেন—জানেন সেই যুদ্ধে দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, সেই যুদ্ধে বহু মানুষ শহীদ হয়েছিল। পরবর্তীতে ২৪ সালের ৫ অগাস্ট সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে এই দেশের ছাত্র-জনতাসহ সকল শ্রেণির পেশার মানুষ।
“সেই একাত্তর সালের যুদ্ধই হোক, চব্বিশের আন্দোলনই হোক, কে পাহাকি মানুষ, কে সমতলের মানুষ, কে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মানুষ—এটি কিন্তু কেউ দেখেনি। রাজপথে সবাই পাশাপাশি আন্দোলন করেছে, একাত্তর সালে যুদ্ধে সবাই একসাথে যুদ্ধ করেছে।
“কে মুসলমান, কে খ্রিষ্টান, কে অন্য ধর্মের মানুষ—কেউ দেখে নাই। এবারও ১২ তারিখে নির্বাচনে আমাদের সকলকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষ একসাথে থাকতে হবে।”

একতার সুফল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, “আমরা যদি এক সাথে থাকি, আমরা যেভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, আমরা যদি এক সাথে থাকি, আমরা যেভাবে স্বৈরাচার বিদায় করেছি, আমরা যদি ইনশাল্লাহ সামনের দিনে একসাথে থাকি; তাহলে অবশ্যই এই বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশের দিকে নিয়ে যেতে পারব।
“সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তাহলে স্লোগান হবে একটাই। সেটা হল—‘করব কাজ, গড়ব দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ’। সবার মনে রাখতে হবে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।”
তিনি বলেন, “আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমাদের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেই জনগণের শাসন কায়েম করা সম্ভব হবে, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেই জনগণের প্রতি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
“আসুন, আমাদের আজকে শপথ হোক, আমরা এই বাংলাদেশকে জনগণের বাংলাদেশে পরিণত করব। আমরা বাংলাদেশকে জনগণের বাংলাদেশে রূপান্তরিত করব। শেষ কথার এক কথা—‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।”

‘ভোট কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে’
ভোর বেলা ভোট কেন্দ্রের সামনে লাইন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, “ভোট শুরু হবে, সাথে সাথে ভোট দেওয়া ইনশাল্লাহ শুরু করবেন। কিন্তু ভোট দিয়ে সাথে সাথে চলে আসলে চলবে না।
“কী করা লাগবে? ভোট কেন্দ্রের সামনে থাকতে হবে। কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিয়ে আসবে। কেন একথাটা বললাম? বহু বছর হয়ে গেছে আমরা ভোট দেবার সুযোগ পাইনি। যেহেতু আমরা ভোট দেবার সুযোগ পাইনি; এর আগে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ভোট লুটপাট করে নিয়ে গিয়েছে। এবার আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে; যাতে করে কেউ আমাদের ভোট লুটপাট করে নিয়ে যেতে না পারে।”

সমাবেশে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, “পারবেন তো পাহারা দিয়ে সর্তক থাকতে।”
সমস্বরে সবাই ‘হ্যাঁ’ বললে তারেক রহমান বলেন, “ইনশাল্লাহ”।
‘সবাইকে কোদাল নিয়ে আসতে হবে’
বিএনপি চেয়ার্যমান তারেক রহমান বলেন, “এই ময়মনসিংহ জেলা একটি অন্যতম কৃষি প্রধান এলাকা। অন্যতম কৃষি প্রধান এলাকা।
“আমাদের এখানে একসময় অনেক খাল-বিল ছিল; ছিল না আগে? এই খাল-বিলগুলো সব ভরাট হয়ে গিয়েছে। এই খালগুলোকে আমরা পুনর্খনন করতে চাই।”
তিনি বলেন, “এখন এই খাল পুনর্খনন করার জন্য কে কে কোদাল হাতে নেবেন? সারা জেলায় খাল পুনর্খনন করতে কে কে কোদাল হাতে নেবেন?”
সবাই সমস্বরে সম্মতি জানালে তারেক রহমান বলেন, “আমি কিন্তু থাকব সেদিন আপনাদের সাথে। ঠিক তো? ইনশাআল্লাহ। তাহলে আমরা খাল খনন করব।”

বক্তব্যের শেষে তিনি ফের বলেন, “আপনাদের সাথে ১২ তারিখের পরে আবার দেখা হবে। কোথায় দেখা হবে?
“খাল খনন কর্মসূচিতে দেখা হবে, খাল খনন কর্মসূচি। সবাইকে কোদাল নিয়ে আসতে হবে পারবেন?”
সবাই সম্মতি দিলে তারেক বলে ওঠেন, “ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ হাফেজ।”
‘কর্মসংস্থান হলে মাদক সমস্যা থাকবে না’
বিএনপি নেতা তারেক রহমান বলেন, “আমরা চাই— নেত্রকোণাসহ, শেরপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় মাদক সমস্যা রয়েছে। আমরা এই মাদক সমস্যার সমাধান করতে চাই। কিন্তু মাদক সমস্যার সমাধান করতে হলে কীভাবে করবেন আপনি?
“মাদক সমস্যার সমাধান করতে হলে আমাদেরকে সেই তরুণদের, সেই যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষের যখন কাজ থাকবে, কর্ম থাকবে, চাকরিবাকরি থাকবে, ব্যবসা-বাণিজ্য কমবেশি থাকবে; তখন মানুষ এগুলোর মধ্যে যাবে না। আমরা সেই পরিবেশ তৈরি করতে চাই।”

তিনি বলেন, “দেশে ভোকেশনাল ইনস্টিটিউশন বেশি করে আমরা তৈরি করব। যাতে করে আমরা আমাদের তরুণ সদস্যদেরকে, যুব সমাজের সদস্যদেরকে আমরা বিভিন্ন রকম ট্রেনিং দেব— যেই ট্রেনিংয়ের বিনিময়ে তারা বিদেশে যেমন যেতে পারবে, একইভাবে তারা দেশে তাদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারবে।
“যারা আইটিতে কাজ করে, তাদের জন্য বিভিন্ন রকম আইটি ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি—যাতে যারা আইটিতে কাজ করে, তারা ঘরে বসে তাদের আয়-রুজি-কামাই রোজগার বাড়াতে পারে।”
হতাহতদের পরিবারের সঙ্গে কুশল বিনিময়
মঞ্চে ওঠার আগে আন্দোলনে শহীদদের পরিবার এবং আহতদের কাছে গিয়ে বিএনপি নেতা তারেক রহমান কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজ-খবর নেন। তারা মঞ্চের নিচে ছিলেন।

চাইলেন ভোট
নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, সবার জন্য স্বাস্থ্য কার্ড, বেকার সমস্যা সমাধানসহ সরকার গঠন করলে কী কী করতে চান তার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধানের শীষের প্রার্থীদের জন্য ভোট চান তিনি।

ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোণা ও শেরপুরের ২৪ জন বিএনপি প্রার্থীকে ধানের শীষ হাতে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, “আমি আপনাদের দায়িত্ব দিলাম, তাদেরকে বিজয়ী করে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন।”
তারা হলেন—ময়মনসিংহ-১ আসনের সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, ময়মনসিংহ-২ আসনের মোতাহার হোসেন তালুকদার, ময়মনসিংহ-৩ আসনের এম ইকবাল হোসেইন, ময়মনসিংহ-৪ আসনের আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ, ময়মনসিংহ-৫ আসনের মোহাম্মদ জাকির হোসেন, ময়মনসিংহ-৬ আসনের আখতারুল আলম, ময়মনসিংহ-৭ আসনের মাহাবুবুর রহমান, ময়মনসিংহ-৮ আসনের লুৎফুল্লাহেল মাজেদ, ময়মনসিংহ-৯ আসনের ইয়াসের খান চৌধুরী, ময়মনসিংহ-১০ আসনের মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান, ময়মনসিংহ-১১ আসনের ফখর উদ্দিন আহমেদ।
জামালপুরের প্রার্থীরা হলেন—জামালপুর-১ আসনের এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, জামালপুর-২ আসনের এ ই সুলতান মাহমুদ বাবু, জামালপুর-৩ আসনের মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, জামালপুর-৪ আসনের ফরিদুল কবীর তালুকদার এবং জামালপুর-৫ আসনের শাহ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন।

নেত্রকোণার প্রার্থীরা হলেন—নেত্রকোণা-১ আসনের কায়সার কামাল, নেত্রকোণা-২ আসনের আনোয়ারুল হক, নেত্রকোণা-৩ আসনের রফিকুল ইসলাম হিলালী, নেত্রকোণা-৪ আসনের লুৎফুজ্জামান বাবর এবং নেত্রকোণা-৫ আসনের আবু তাহের তালুকদার।
শেরপুরের প্রার্থীরা হলেন—শেরপুর-১ আসনের সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, শেরপুর-২ আসনের মোহাম্মদ ফাহিম চৌধুরী এবং শেরপুর-৩ আসনে মাহমুদুল হক রুবেল।
ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেন বাবলুর সভাপতিত্বে সমাবেশ পরিচালনা করছেন বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদ আবু ওয়াহাব আকন্দ, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার, উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার।
ময়মনসিংহের অনুষ্ঠান শেষে পরবর্তী নির্বাচনি সমাবেশের জন্য গাজীপুরের রাজবাড়ি কলেজ মাঠের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন তারেক রহমান।
সিলেটে হযরত শাহ জালাল (র.) ও হযরত শাহ পরাণ (র.) মাজার জিয়ারতের পর গত ২২ জানুয়ারি সিলেটের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সমাবেশের মধ্য দিয়ে নির্বাচনি প্রচারাভিযান শুরু করেন তারেক রহমান। সেদিন সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও নারায়নগঞ্জে ৭টি সমাবেশ করেন তিনি।
এরপর গত রোববার চট্টগ্রাম থেকে দ্বিতীয় পর্বের প্রচারাভিযান চালান বিএনপি চেয়ারম্যান। সেদিন চট্টগ্রামসহ ফেনী, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে পাঁচটি সমাবেশে বক্তব্য রাখেন তারেক রহমান।