Published : 05 Nov 2025, 01:40 AM
পর্যটকদের অসচেতনতা এবং কর্তৃপক্ষের অবহেলায় সিলেটের জলাবন রাতারগুলের পরিবেশ দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবেশবাদীরা।
সেই সঙ্গে রাতের আঁধারে সংরক্ষিত এই জলাধারে অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরার কারণে ধ্বংসের মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।
গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নে এশিয়া মহাদেশের একমাত্র মিঠাপানির ‘জলাবন’ রাতারগুলের সৌন্দর্য আর সমৃদ্ধ জীব-বৈচিত্র্যের টানে প্রতিদিন শত শত পর্যটক সেখানে ভ্রমণে যান। সিলেট থেকে যাওয়া-আসার সেই রাস্তাটিও অনেক জায়গায় ভাঙা। এ কারণে পর্যটকদের ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়।
রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ২০১৫ সালে ‘বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য’ ঘোষিত হয়। এরপর থেকে বনবিভাগ এবং স্থানীয় সহব্যবস্থাপনা কমিটি মিলিতভাবে এই জলাবনের সুরক্ষা ও টেকসই ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে।
সিলেট রাতারগুল বনবিভাগের বিট কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ বলেন, “পর্যটকদের চাপ যেদিন বেশি থাকে সেদিন অনেকে ময়লা-আবর্জনা ফেলে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো পরিষ্কার করা হয়। এজন্য সবার সচেতন থাকা দরকার।”

প্লাস্টিক দূষণ
গোয়াইনঘাটের মাঝের ঘাট, চৌরঙ্গী ঘাট ও মটর ঘাট থেকে রাতারগুলে প্রবেশ করা যায়। এই পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, পর্যটকরা ঘাট থেকে নৌকা নিয়ে জলাবনের ভেতরে প্রবেশ করে ওয়াচ টাওয়ারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। মাঝিরা নৌকার বৈঠা টানছেন। কোনো কোনো মাঝি আবার পর্যটকদের গানও শোনাচ্ছেন। জলে সারি সারি গাছের কাণ্ড ডুবে আছে আর উপরে গাছের ডাল-পাতার ছায়ায় অনন্য দৃশ্য।
তবে পর্যটকবাহী নৌকাগুলোতে ‘ময়লা ফেলার ঝুড়ি’ নেই। পর্যটকরা বনের ভেতরের শুকনো জায়গায় নেমে হাঁটাহাঁটিও করেন। বনের ভেতরে থাকা শুকনো জায়গাতে প্লাস্টিকের বোতল ও চিপসের প্যাকেট ভেসে থাকতে দেখা গেল। কোথাও কোথাও করচ-হিজল ও মুর্তা গাছের ডাল-পাতায় আটকে আছে প্লাস্টিকের বোতল।
একজন মাঝি বলছিলেন, “আমরা পর্যটকদের প্লাস্টিকের জিনিস পানিতে ফেলতে নিষেধ করি। কিন্তু অনেকে আমাদের কথা না শোনে না। অনেক সময় আমাদের চোখের আড়ালে এই প্লাস্টিকের পানির বোতল আর খাবারের প্যাকেট ফেলে দেয়। তবে আমাদের চোখের সামনে পড়লে সেগুলো আমরা সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিই। তাছাড়া প্লাস্টিক সংগ্রহের জন্য লোক আছে, সে বনে থাকা প্লাস্টিকগুলো উঠিয়ে নেয়।”
সিলেটের তরুণ সংবাদকর্মী তাওহীদ রহমান শাহ বলেন, “রাতারগুল মূল স্পটে প্লাস্টিকের বর্জ্য ফেলতে দেখা যায়। বনের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক ভেসে বেড়ায়। প্লাস্টিক সংগ্রহের জন্য একজন কর্মী রয়েছে জানি। কিন্তু তাকে কাজ করতে দেখা যায়নি। পাশাপাশি ময়লা-আবর্জনা রাখার মত কোনো ব্যবস্থা নেই বনের ভেতরে বা নৌকা ঘাটে।”
গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি এবং রাতারগুল সহব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মাহবুব আলম বলেন, “নৌকায় থাকা ময়লা-আবর্জনা ফেলার জন্য বেতের ঝুড়িগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। প্লাস্টিকের ঝুড়ি ব্যবহার করতে চাচ্ছি না। তাই কাঠের দিয়ে ঝুড়ি বানানোর চিন্তা করছি আমরা।

ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করার জন্য প্রতিদিন দুইজন লোক কাজ করেন জানিয়ে মাহবুব আলম বলেন, “মাঝে-মধ্যে আমরাও যাই পরিষ্কার করতে। আমরা পর্যটকদের অনুরোধ করি, হাতে কিছু না নিয়ে যাওয়ার জন্য, কিন্তু তারা নিয়ে যান। তবে পর্যটনকেন্দ্রে আসা সবার সচেতন থাকা দরকার।”
বর্তমানে মাঝের ঘাট ও চৌরঙ্গী ঘাটে একটি নৌকা নিয়ে ঘুরতে খরচ পড়ে ৭৫০ টাকা। আর মটর ঘাটে খরচ পড়ে ৮৫০ টাকা। টিকেট জনপ্রতি ৫৭ টাকা ৫০ পয়সা; তবে ছাত্রদের জন্য প্রতি টিকেট ৩০ টাকা করে রাখা হয়।
চোরা শিকারীদের দৌরাত্ম
পর্যটনকেন্দ্র সংশ্লিষ্টরা বললেন, একটি চক্র প্রতি বছর রাতারগুলে জাল পেতে মাছ শিকার করে। তারা গভীর রাতে এসে জাল পাতে, আর ভোরে মাছ নিয়ে চলে যায়। প্রথমে একটি-দুটি জাল পাতে; রাত বাড়তে থাকলে জালের পরিমাণও বাড়তে থাকে।
বেশি মাছের লোভে শিকারীরা ‘চায়না দুয়ারি’ জাল পাতে। এই জাল ছোট মাছ ও জলের নিচের উদ্ভিদকেও আটকে ফেলে। ফলে এ জাল জলের জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে এসব জাল জব্দ করা হয়, জেলেদের জরিমানাও করা হয়। কিন্তু কোনোভাবেই চক্রটিকে থামানো যাচ্ছে না।
রাতারগুল সহব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মাহবুব আলমও বিষয়টি স্বীকারও করলেন।

তিনি বলেন, “রাতারগুলের গভীরে কিছু অসাধু ব্যক্তি রাতে নিষিদ্ধ জাল পেতে মাছ শিকার করে। জানতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে বনবিভাগ, কমিটির সদস্য ও স্থানীয় মাঝিদের নিয়ে যৌথভাবে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হয়। একদিনের অভিযানেই ৩১টি জাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।”
বনবিভাগের বিট কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ বলেন, “রাতারগুল শুধু একটি বন নয়, এটি একটি জীবন্ত পরিবেশতন্ত্র। এখানে মাছ, পাখি, উভচর প্রাণী, সরীসৃপসহ শতাধিক প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের ফলে ছোট মাছ এবং ডিম পাড়ার সময়কার প্রজাতিগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; যা পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করে।”
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা-ধরার সংগঠক, উন্নয়ন গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, “রাতারগুলের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া খাল থেকে বালি উত্তোলন ও বনের অভ্যন্তর এবং বাইরে চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহার নতুন নয়। এতে দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি হারিয়ে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন। এসব অনাচার কেবল পরিবেশবিধ্বংসী নয়; পর্যটন বিকাশেও প্রতিবন্ধক।”
রাস্তার ভোগান্তি
সিলেটের এয়ারপোর্ট সংলগ্ন ধোপাগুল শহীদ মিনার পয়েন্ট থেকে অটোরিকশা গোয়াইনঘাট উপজেলার রাতারগুলে যায়। নগরী থেকে বেরিয়ে একটু এগিয়েই চোখে পড়বে, বড় বড় খানাখন্দ। রাস্তার কোথাও কোথাও হাঁটু সমান গর্তও হয়েছে। ২৬ কিলোমিটার রাস্তার অন্তত পাঁচ কিলোমিটারই ভাঙা।
সড়কটির বেশি ভাঙাচোরা অংশ টিলাপাড়া, পাঠানগাঁও, সিদেরগুল, সাহেববাজার, রাতারগুল মটরঘাট, রাতারগুল চৌমুহনীবাজার এলাকায়। মূলত ধোপাগুল থেকে রামনগর চৌমুহনী পর্যন্ত জায়গাটি বেশি ভাঙাচোরা।

সিলেট সদর উপজেলার খাদিমনগর ইউনিয়নের পাঠানগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আশিক আলী (৬৬) বলেন, “দুই বছরের বেশি সময় ধরে সড়কটি ভাঙা। একটু বৃষ্টি হলে পানি জমে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গর্তে পানি জমে থাকার কারণে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা অনেক সময় উল্টো গিয়ে অনেকে আহত হন। পর্যটকরাও অনেক সময় আহত হয়েছেন।”
এই সড়কে প্রতিদিন অটোরিকশা চালান নাজিম আহমদ। তার ভাষ্য, “যেখানে গর্ত বেশি গভীর, সেখানে যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে একা গাড়ি নিয়ে ভাঙা পার হই। অনেক সময় যাত্রীদের বলি, পেছনে ধাক্কা দিয়ে গাড়ি উঠিতে দিতে।”
একই ধরনের ভোগান্তির কথা বলছিলেন সড়কের পাশে থাকা মুদি দোকানি রায়হান আহমদ। তিনি হতাশ কণ্ঠে বলছিলেন, “অনেকদিন ধরে সড়কটির কাজ হয়নি, আর কবে হবে সেটাও বুঝতেছি না।”
পর্যটক আহমেদ সালমান চৌধুরী জনপ্রিয় এই পর্যটন কেন্দ্রের রাস্তাটি দ্রুত সংস্কারের দাবি জানান।
রাতারগুল গ্রামের পরিবেশকর্মী সোনা মিয়া বলেন, রাস্তা খারাপের কারণে পর্যটকদের আসতে অনেক সময় লাগে। ফলে অনেকে নিরুৎসাহিত হন।
সংবাদকর্মী তাওহীদ রহমান শাহ বলেন, “সালুটিকর থেকে সাহেবের বাজার হয়ে রাস্তার প্রথমেই ঢুকতেই দেখা যায় ভাঙ্গাচোরা। দুটি গাড়ি পাস হওয়ার মত ব্যবস্থা নেই এখানে। এই রাস্তাটি আরও প্রশস্ত করতে হবে শিগগিরই। তা না হলে পর্যটকের যে ভোগান্তি সেটা কমবে না।”

সড়ক সংস্কারের বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী কে এম ফারুক হোসেন বলেন, “রাস্তাটি সংস্কারে টেন্ডার হয়েছে। দ্রুতই ঠিকাদার কাজ শুরু করবে।”
এলজিইডি সিলেট সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. হাসানুজ্জামান বলেন, “ঠিকাদার এরই মধ্যে টুকটাক কাজ শুরু করেছেন। দ্রুতই পুরোদমে কাজ শুরু হবে। দুই কোটি টাকার উপর ব্যয় ধরা হয়েছে।”
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, রাস্তাটির টেন্ডার হয়ে গেছে। আর বনের মধ্যে প্লাস্টিক পরিষ্কার করা হয়েছে।
রাতারগুলের ইতিহাস
এক সময় দেশের একমাত্র ‘জলাবন’ হিসেবে মনে করা হত রাতারগুলকে। তবে পরে জুগিরকান্দি মায়াবন, বুজির বন ও লক্ষ্মীবাওড় নামে আরও ‘জলাবনের’ খোঁজ মেলে।
পৃথিবীতে মিঠাপানির যে ২২টি ‘জলাবন’ আছে ‘রাতারগুল’ তার মধ্যে অন্যতম। এর আয়তন ৩৩২৫.৬১ একর। একে ‘রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট’ হিসাবেও বর্ণনা করা হয়।
এর ৫০৪ একর এলাকাকে বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এ ছাড়া ২০১৫ সালের ৩১ মে বাংলাদেশের বন অধিদপ্তর ২০৪.২৫ হেক্টর বনভূমিকে বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসবে ঘোষণা করে।

চিরসবুজ এই বন গোয়াইন নদীর তীরে অবস্থিত (গোয়াইন নদী, সারি গোয়াইন নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং চেঙ্গির খালের সঙ্গে একে সংযুক্ত করেছে)। এখানে সবচেয়ে বেশি জন্মায় করচ গাছ। এখানকার গাছপালা বছরে চার থেকে সাত মাস পানির নিচে থাকে।
বর্ষায় চার মাস এই বন ২০-৩০ ফুট পানির নিচে থাকে। বাকি সময় পানির উচ্চতা থাকে ১০ ফুটের মত। পানি কমে গেলে ছোট ছোট খাল হয়ে যায় পায়ে-চলা পথ। আর তখন পানির আশ্রয় হয় বনবিভাগের খোঁড়া বিলগুলোতে। সেখানেই আশ্রয় নেয় জলজ প্রাণীকূল।