১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কুয়েতে ‘গাড়ির কবরস্থান’: পরিত্যক্ত লোহায় কোটি টাকার ব্যবসা প্রবাসীদের

নির্জন মরুতে গড়ে উঠেছে দেশটির সবচেয়ে বড় অটোমোবাইল ভাঙারি বাজার।

কুয়েতে ‘গাড়ির কবরস্থান’: পরিত্যক্ত লোহায় কোটি টাকার ব্যবসা প্রবাসীদের
ছবি: লেখক।

বিডিনিউজ২৪

আ হ জুবেদ, কুয়েত থেকে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Sep 2026, 12:27 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:55 AM

মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশ কুয়েত, এর শহরাঞ্চল থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে এক নির্জন ও রুক্ষ প্রান্তর—সালমি। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী এ এলাকাটি আপাতদৃষ্টিতে প্রাণহীন, শুষ্ক ও উত্তপ্ত মরুভূমি মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অবিশ্বাস্য এক কর্মযজ্ঞ। এখানেই গড়ে উঠেছে পুরো কুয়েতের সবচেয়ে বড় অটোহাব বা অটোমোবাইল ভাঙারি বাজার, যাকে অনেকে ‘গাড়ির কবরস্থান’ বলে আখ্যা দেন। 

তবে এ কবরস্থান কোনো শেষ গন্তব্য নয়, বরং এখান থেকেই জন্ম নেয় কোটি টাকার বিশাল পুনর্জন্মের বাজার। আর গর্বের বিষয় হলো, মরুভূমির ওপর গড়ে ওঠা এ বিশাল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি আর কেউ নন, রক্তঘামে ভেজা আমাদের প্রবাসীরা। আধুনিক কুয়েতের বিলাসবহুল জীবনযাপনের আড়ালে এই সালমি যেন অন্য এক জগৎ, যেখানে পরিত্যক্ত লোহালক্কড়কে ব্যবহার উপযোগী করে পুনরায় প্রস্তুত করছেন বাংলাদেশিরা।

কীভাবে এত বড় বাজার গড়ে উঠল এই জনমানবহীন প্রান্তরে? কুয়েতের মতো উচ্চ আয়ের দেশে প্রতিনিয়তই রাস্তায় নামছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ও আধুনিক সব গাড়ি। কিন্তু কোনো কারণে দুর্ঘটনায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া কিংবা সামান্য কারিগরি জটিলতায় বিকল হয়ে পড়া গাড়িগুলো যখন মেরামতের অযোগ্য বা ব্যয়বহুল ঘোষণা করা হয়, তখন সেগুলোর শেষ ঠিকানা হয় এ সালমি। 

শুধু পুরনো গাড়িই নয়, এখানে এলে চোখ কপালে ওঠার মতো দৃশ্যও চোখে পড়ে। এমনকি ২০২৬ সালের সর্বশেষ মডেলের চকচকে নতুন গাড়ি কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর ট্র্যাফিক আইনে বৈধতা হারানো কোনো বিলাসবহুল যানবাহন হলেও তার স্থান মিলছে মরুভূমির এ ‘গাড়ির কবরস্থানে’। কুয়েতের কঠোর নিয়মকানুনের কারণে সামান্য ত্রুটিযুক্ত গাড়িও অনেক সময় রাস্তায় চলার অনুমতি পায় না। এই পরিত্যক্ত গাড়ির পাহাড়ই এখন প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার নিয়ে বিশাল সব প্রকল্প চলছে, তখন সালমির এ বাংলাদেশিরাই যেন নিজেদের অজান্তে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহৎ এক ‘সার্কুলার ইকোনমি’র হাল ধরেছেন। প্রতিদিন কুয়েতের স্থানীয় বিত্তবান নাগরিক থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার প্রবাসী ভিড় করছেন সালমিতে। তাদের মূল উদ্দেশ্য একটাই—নিজেদের গাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় অরিজিনাল বা আসল যন্ত্রাংশটি সাশ্রয়ী মূল্যে খুঁজে বের করা। শহরের বড় বড় চকচকে পার্টসের দোকান বা শোরুমগুলোতে যন্ত্রাংশের যে চড়া মূল্য, তার তুলনায় এই সেকেন্ড হ্যান্ড যন্ত্রাংশের বাজারে দাম অবিশ্বাস্য রকমের কম। অথচ গুণগত মানে এগুলো সম্পূর্ণ আসল বা জেনুইন পার্টস। 

এই ভাঙারি ও ব্যবহৃত পার্টস কেনাবেচার সুবিশাল ব্যবসার একটি বিরাট, বলতে গেলে একচেটিয়া অংশই এখন দখল করে আছেন প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। একসময় যারা হয়তো কেবল সাধারণ শ্রমিক হিসেবে এদেশে এসেছিলেন, তারাই আজ নিজেদের মেধা, পরিশ্রম ও ব্যবসায়িক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করেছেন এবং উপার্জনের এক অভাবনীয় নতুন দিশা খুঁজে পেয়েছেন।

তবে এ সাফল্যের পথ মোটেও মসৃণ নয়। এখানকার কাজের পরিবেশ বৈরী। দীর্ঘদিন ধরে সালমিতে স্ক্র্যাপ ও গাড়ির পার্টস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ঢাকার ফারুক আহমদ। কাজের বাস্তবতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, মরুভূমির এ অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা অনেক সময় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসও ছাড়িয়ে যায়। চারপাশের উত্তপ্ত বালু আর গনগনে রোদের মধ্যে ভারী লোহার যন্ত্রাংশ নিয়ে কাজ করা যে কতটা কঠিন এবং অমানবিক, তা কেবল যারা এখানে কাজ করেন তারাই বোঝেন। 

তবুও একটু বাড়তি উপার্জন, দেশে ফেলে আসা পরিবারের মুখে হাসি ফোটানো আর নিজেদের জীবনমান আরেকটু ভালো করার আশায় এ প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও পরিশ্রম করে তারা সব কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করে যাচ্ছেন। 

প্রায় একই ধরনের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা জানান সিলেটের সন্তান কামাল হোসেন। তিনি জানান, গত তিন বছর ধরে তিনি সালমির এই স্ক্র্যাপ ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন। এর আগে তিনি শহরে কাজ করতেন। কিন্তু শহরের সেই ধরাবাঁধা চাকরি এবং নির্দিষ্ট বেতনের গণ্ডিতে থেকে যে পরিমাণ অর্থ আয় করা সম্ভব হতো, তা দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন পূরণ করা ছিল অনেকটাই অসম্ভব। 

এই মরুপ্রান্তরের ভাঙারি বাজারে এসে তিনি যে উপার্জন করতে পেরেছেন, তা শহরের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের চাকরিতে কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। কামালের মতো শত শত বাংলাদেশি যুবক আজ ঝুঁকি নিয়ে এই ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন এবং প্রবাস জীবনে নিজেদের ভাগ্য নিজেরাই নতুন করে লিখছেন।

এখানে ব্যবসার পরিধি এত বেশি যে, যেকোনো মানুষের চাহিদাই মেটানো সম্ভব। ফেনী জেলার কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার রাশেদ ইরফান নামের আরেক প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী গর্বের সাথে জানান, বিশ্বের যেকোনো নামিদামি গাড়ির যেকোনো মডেল কিংবা ব্র্যান্ডের দুষ্প্রাপ্য যন্ত্রাংশও এ সালমিতে পাওয়া যায়। শহরের শোরুমগুলোতে যেসব যন্ত্রাংশের দাম অতিরিক্ত হাঁকানো হয় কিংবা যেগুলো অনেক সময় সহজে পাওয়াই যায় না, সেগুলোর জন্য ক্রেতারা বিনা দ্বিধায় সোজা সালমিতে চলে আসেন। 

তবে ব্যবসার পরিবেশ এবং আয়ের দিক থেকে সন্তুষ্ট হলেও জীবনের কিছু কষ্টের কথা আড়াল করতে পারেননি রাশেদ। তিনি বলেন, “সালমি এলাকায় রাতে মানুষের থাকার মতো কোনো ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা বা আবাসিক ব্যবস্থা নেই। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি আর ধকল শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে রাত যাপনের জন্য প্রতিদিন পাড়ি দিতে হয় মাইলের পর মাইল পথ। ফিরতে হয় অনেক দূরের কোনো লোকালয়ে। প্রতিদিনের এই দীর্ঘ যাতায়াত আমাদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।”

ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সালমির অটোহাবের বড় সুবিধা ভোগ করছেন কুয়েতের সাধারণ গাড়ি মালিকরাও। এখানকার বাজার ব্যবস্থার চিত্রটি কতটা জনবান্ধব, তা বোঝা যায় মোহাম্মদ সেলিম হাওলাদার নামের এক ক্রেতার অভিজ্ঞতা থেকে। নিজের গাড়ি মেরামতের জন্য পার্টস কিনতে আসা এই ক্রেতা নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “শহরের একটি নামিদামি দোকান থেকে আমার গাড়ির একটি নির্দিষ্ট পার্টসের দাম চাওয়া হয়েছিল ৬০ কুয়েতি দিনার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় এক বিশাল অংক। কিন্তু সালমির এই স্ক্র্যাপ মার্কেট ঘুরে আমি হুবহু সেই একই আসল যন্ত্রাংশটি নিখুঁত অবস্থায় মাত্র ১০ দিনারে কিনে নিতে পেরেছি। অর্থাৎ দামের ব্যবধান প্রায় ছয় গুণ!” 

মূলত সাশ্রয় ও বিশ্বস্ততার কারণেই প্রতিদিন হাজার হাজার ক্রেতা শহরের আরামদায়ক পরিবেশ ছেড়ে ছুটে আসেন মরুপ্রান্তরের এই ধুলোমাখা সালমি বাজারে। আর ক্রেতাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন প্রবাসীরা।